
আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে এক মরোক্কান ফ্লোরিডা থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত হাজার মাইল পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়েছিলেন। তিনিই ছিলেন প্রথম কোনো বহিরাগত বা ভিনদেশি মানুষ, যিনি আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চল প্রথমবার দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। এই অবিশ্বাস্য অভিযাত্রার মূল নায়ক ছিলেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস, যিনি আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক রূপকার।
১৫২৮ সালের ঘটনা। বর্তমান টেক্সাসের উপকূলে যখন এক মরোক্কান যুবক এসে পৌঁছান, তখন তিনি জীবিত নাকি মৃত, তা বোঝা যাচ্ছিল না। এক মাস ধরে তিনি এবং একদল স্প্যানিশ নাবিক মেক্সিকো উপসাগরের উত্তাল তরঙ্গে একটি নড়বড়ে লাইফবোটে ভেসে ছিলেন। গাছ, ঘোড়ার চামড়া আর তাঁদের পরনের ছেঁড়া পোশাক দিয়ে তৈরি লাইফবোটটি যখন গ্যালভেস্টনের কাছে একটি দ্বীপে এসে আছড়ে পড়ে, তখন তাঁরা হয়ে ওঠেন প্রাচীন বিশ্ব থেকে আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে পা রাখা প্রথম দল। তবে তখন তাঁদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন সম্পূর্ণ নগ্ন, ক্ষুধার্ত এবং প্রচণ্ড ক্লান্ত।
পরবর্তী দিনগুলোতে সেই বেঁচে যাওয়া নাবিকেরা একে একে মারা যেতে শুরু করেন। কেউ অনাহারে, কেউ আবহাওয়ার কারণে, আবার কেউ স্থানীয় আদিবাসীদের আক্রমণে প্রাণ হারান। এক বছর আগে স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের জন্য ফ্লোরিডা জয় করতে স্পেন থেকে রওনা হওয়া প্রায় ৬০০ জনের বিশাল অভিযাত্রী দলের মধ্যে মাত্র ৪ জন অলৌকিকভাবে বেঁচে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন ছিলেন স্প্যানিশ ক্যাপ্টেন, আর চতুর্থজন ছিলেন সেই মরোক্কান ক্রীতদাস।
পরবর্তী আট বছরে এই ব্যক্তিই হয়ে ওঠেন সেই দলের মূল চালিকাশক্তি ও নেতা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ইতিহাসের পাতায় তাঁর আসল নাম আজও অজানা।
ইতিহাসের পাতায় তিনি এস্তেবান ডি ডোরান্টেস, এস্তেবান দ্য মুর অথবা এস্তেভ্যানিকো নামে বেশি পরিচিত। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পা রাখা প্রথম নথিভুক্ত আফ্রিকান, আরবিভাষী এবং মুসলিমদের মধ্যে তিনি অন্যতম। ইউরোপীয়দের প্রথম স্থায়ী বসতি স্থাপনেরও প্রায় ৪০ বছর আগে তিনি আমেরিকায় এসেছিলেন। ১৫২৮ থেকে ১৫৩৬ সালের মধ্যে তিনি ফ্লোরিডা থেকে মেক্সিকোর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ২৫০ মাইল (৩ হাজার ৬২০ কিলোমিটার) পথ হেঁটে পাড়ি দেন। এটিকে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের প্রথম স্থলপথ অতিক্রমের রেকর্ড হিসেবে গণ্য করা হয়, যা বিখ্যাত ‘লুইস অ্যান্ড ক্লার্ক’ অভিযানেরও প্রায় ৩০০ বছর আগের ঘটনা।
এই দীর্ঘ পথচলার সময় এস্তেভ্যানিকো স্থানীয় রেড ইন্ডিয়ানদের হাতে বন্দী হন, তাঁদের ভাষা শেখেন এবং একজন সফল হিলার বা কবিরাজ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। পরে তিনি বাকি তিন স্প্যানিশ সহযোগীকে নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগর থেকে মেক্সিকো সিটি পর্যন্ত আরও ১ হাজার ৩০০ মাইল পথ পাড়ি দেন। এখানেই শেষ নয়, তিনি পরে একাই উত্তর দিকে আরও ১ হাজার ৫০০ মাইল পথ অতিক্রম করে বর্তমান নিউ মেক্সিকো এবং অ্যারিজোনা রাজ্যে প্রবেশকারী প্রথম অ-আদিবাসী মানুষ হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. হুসেইন ইলাহিয়ানে বলেন, ‘আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাথমিক ইতিহাসে এস্তেভ্যানিকো এক অসাধারণ অথচ অবহেলিত চরিত্র। তিনি এমন সব রুট ও ভৌগোলিক পথ উন্মোচন করেছিলেন, যা পরে স্প্যানিশদের এই অঞ্চলে বিস্তৃতি ঘটাতে ভূমিকা রেখেছিল।’
তবে এত বড় অবদানের পরও আমেরিকার সাধারণ মানুষের কাছে তিনি দীর্ঘকাল ধরে এক অপরিচিত নাম হিসেবে রয়ে গেছেন।

যেহেতু এস্তেভ্যানিকো নিজে কোনো লিখিত দলিল রেখে যাননি, তাই তাঁর সঙ্গে বেঁচে যাওয়া স্প্যানিশদের ডায়েরি ও বিবরণী থেকে ইতিহাসবিদেরা তাঁর জীবনকাহিনি লিখেছেন। ১৫০০ শতকের শুরুতে মরক্কোর আজেমুর শহরে তাঁর জন্ম। স্প্যানিশ অভিযাত্রী আন্দ্রেস ডোরান্টেস ডি ক্যারানজা তাঁকে ক্রীতদাস হিসেবে কিনে নেন এবং স্পেনের বিখ্যাত নারভায়েজ অভিযানে সঙ্গে নিয়ে আসেন। তৎকালীন নিয়মানুযায়ী মুসলিমদের এই অভিযানে যাওয়ার অনুমতি না থাকায় তাঁর মালিক তাঁকে জোরপূর্বক খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করে নাম দেন ‘এস্তেভ্যানিকো’।
১৫২৭ সালের জুনে ৫টি জাহাজ ও ৬০০ কর্মী নিয়ে শুরু হওয়া অভিযানটি শুরু থেকেই ছিল বিপর্যয়ে ভরা। পথিমধ্যে ঝড়বৃষ্টি ও নানা দুর্ঘটনায় বহু মানুষ মারা যান। অবশেষে ১৫২৮ সালের এপ্রিলে তাঁরা ফ্লোরিডার সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছান। সেখান থেকে অভিযানের দলনেতা প্যানফিলো ডি নারভায়েজ এস্তেভ্যানিকোসহ কয়েক শ মানুষকে ফ্লোরিডার ভেতরের জঙ্গল ও জলাভূমি অন্বেষণের নির্দেশ দেন। মশার কামড় আর অ্যাপালাচি আদিবাসীদের আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে তাঁরা নিজেদের ঘোড়াগুলো কেটে খেয়ে ফেলেন। পরে কাঠের ভেলা বানিয়ে সমুদ্র উপকূলে ভেসে ভেসে টেক্সাসের গ্যালভেস্টনে এসে পৌঁছান।
সেখানে বন্দী হওয়ার পর এস্তেভ্যানিকোর বহুভাষী দক্ষতা এবং খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে। তিনি তামাজাইট (আমাযিগ বা বারবার জনগোষ্ঠীর একটি ভাষা), আরবি, পর্তুগিজ এবং স্প্যানিশ ভাষা জানতেন। বন্দিদশায় তিনি আদিবাসীদের আকার-ইঙ্গিতের ভাষাও রপ্ত করেন। পাঁচ বছর পর তিনি বাকি ৩ স্প্যানিশ বন্দীকে নিয়ে এক আদিবাসী গোষ্ঠীর সহায়তায় পালিয়ে যান।
পথে এক অসুস্থ আদিবাসী নারীকে নিজেদের ধর্মীয় আচার ও দেশীয় ভেষজ পদ্ধতির মিশ্রণে সুস্থ করে তোলার পর এস্তেভ্যানিকোর ‘অলৌকিক ক্ষমতা’র গল্প চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন উপজাতির মানুষ তাঁকে দেবতাতুল্য মনে করতে শুরু করে। এস্তেভ্যানিকো তখন বিভিন্ন অলংকার, ঝুনঝুনি ও লাঠি হাতে দলটির প্রধান হিসেবে আগে আগে চলতেন এবং বিভিন্ন উপজাতির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতেন।
১৫৩৯ সালে নিউ স্পেনের (বর্তমান মেক্সিকো) ভাইসরয় বা গভর্নর এস্তেভ্যানিকোকে গাইড (পথপ্রদর্শক) বানিয়ে উত্তর দিকে ‘স্বর্ণের সাত শহর’ (সেভেন সিটিস অব গোল্ড) অনুসন্ধানের জন্য পাঠান। এস্তেভ্যানিকো স্প্যানিশ ফ্রায়ার বা ধর্মযাজকদের দলের আগে আগে চলতেন। নিয়ম ছিল, কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেলে তিনি বার্তাবাহকের মাধ্যমে স্প্যানিশদের কাছে কাঠের তৈরি ক্রুশ পাঠাতেন। তথ্যের গুরুত্ব অনুযায়ী ক্রুশের আকার ছোট, মাঝারি বা বড় হতো।
একদিন এস্তেভ্যানিকো জুনি পুয়েবলো উপজাতি এলাকায় প্রবেশ করে মানুষের সমান উচ্চতার এক বিশাল ক্রুশ পাঠান। এটি দেখে স্প্যানিশরা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে দ্রুত এগিয়ে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, কল্পিত সোনার শহর ‘হাউইকুহ’-এ প্রবেশের চেষ্টা করার সময় জুনি আদিবাসীরা এস্তেভ্যানিকোকে হত্যা করেছে।
স্প্যানিশরা সেই সোনার শহরের খোঁজ কখনো না পেলেও এস্তেভ্যানিকোর এই শেষ অভিযানই আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্প্যানিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ সুগম করেছিল, যা পরে আমেরিকার সংস্কৃতি, ধর্ম ও ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দেয়।
তবে বিলম্বে হলেও ইতিহাসের স্বীকৃতি পেয়েছেন এস্তেভ্যানিকো। শত শত বছর ধরে স্প্যানিশ ইতিহাসের পাদটীকা হয়ে থাকা এই মহান আফ্রিকান অভিযাত্রীকে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জাদুঘর ও স্মারকস্তম্ভে সম্মান জানানো হচ্ছে।
২০১৬ সালে টেক্সাসের ক্যাপিটল ভবনে এস্তেভ্যানিকোর একটি ৭ ফুট উঁচু ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে, যা টেক্সাসের মাটিতে পা রাখা প্রথম আফ্রিকানের স্বীকৃতি। মিশিগানের আরব আমেরিকান ন্যাশনাল মিউজিয়ামের পরিচালক ডায়ানা আবুয়ালি বলেন, আমাদের জাদুঘরের ‘কামিং টু আমেরিকা’ প্রদর্শনীর শুরুতেই আমরা এস্তেভ্যানিকোকে উপস্থাপন করি। এর উদ্দেশ্য হলো বিশ্বকে জানানো যে আরবি ভাষা এবং সংস্কৃতি এই আমেরিকার ভূখণ্ডে বহু প্রাচীনকাল থেকে বিদ্যমান।
মরোক্কান-আমেরিকান ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক লায়লা লালামি এস্তেভ্যানিকোর জীবনের ওপর ভিত্তি করে ‘দ্য মুরস অ্যাকাউন্ট’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘তিনি (এস্তেভ্যানিকো) উত্তর আমেরিকা জয় করা প্রথম আফ্রিকান। তবে তাঁর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো তাঁর অবস্থান—তিনি এই দেশে কোনো বিজয়ী বা শোষক হিসেবে আসেননি, আবার তিনি এখানকার বিজিত বা শোষিত আদিবাসীদেরও অংশ ছিলেন না। তিনি ছিলেন এই দুই জগতের মাঝামাঝি এক অনন্য সেতু।’
তথ্যসূত্র: বিবিসি

ঝাল আর চর্বিযুক্ত খাবারের পর মুখে মিষ্টির ছোঁয়া আরাম দেয়। এ জন্য অতিথি আপ্যায়নে ঘরেই ঝটপট তৈরি করে নিতে পারেন টার্কিশ মিষ্টি ‘হালকা তাতলিসি’। দেখতে অনেকটা আমাদের দেশের প্যাঁচ ছাড়া জিলাপির মতো অথবা ম্যাক্সিকান চুরোসের মতো। মূলত এটি মুচমুচে ও রসাল রিং ডেজার্ট। অটোমান সাম্রাজ্য থেকে চলে আসা এই...
১ ঘণ্টা আগে
সাধারণত তাজা পার্সলে পাতা, পেঁয়াজ, রসুন এবং সুগন্ধি কাফতা মসলার মিশ্রণে গরুর মাংস, ভেড়ার মাংস অথবা এই দুটির কিমা একসঙ্গে মিশিয়ে এটি তৈরি করা হয়। এই কাবাবটির মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর সিগনেচার লম্বাটে ডিম্বাকৃতি বা নলাকার গঠন। এটি তৈরি করা যেমন সহজ, তেমনি এটি ওভেনে বেক করে, কয়লায় গ্রিল করে কিংবা এয়ার...
৩ ঘণ্টা আগে
ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘পুওর মোয়া’র নতুন এক বিশ্লেষণে এমন কিছু গন্তব্য চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোতে দম্পতিদের ছুটি কাটানো তুলনামূলক ঝামেলামুক্ত ও স্মরণীয় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্ক ও যৌনতা বিষয়ক থেরাপিস্ট জর্জিনা ভাসের সহায়তায় ৪০টির বেশি দেশের ১০০টি গন্তব্য বিশ্লেষণ করে সেরা জায়গাগুলো...
১ দিন আগে
কোরবানির ঈদে খাওয়া হয় হরেক রকমের সুস্বাদু মাংসের পদ। তবে এর আসল চ্যালেঞ্জ শুরু হয় রান্নাবান্না ও খাওয়াদাওয়ার পর। মাংসের চর্বিযুক্ত ঝোল, ভুনা বা কাবাব তৈরির পর কড়াই, পাতিল ও প্লেটে যে চটচটে তেলের আস্তরণ জমে, তা সাধারণ উপায়ে ধুতে গেলে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। অনেকে অলসতা করে লোহার কড়াই বা ননস্টিকের...
১ দিন আগে