ভূতের ফ্যাশন, না ফ্যাশনের ভূত

ভর সন্ধ্যাবেলা বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকার সিঁড়ি ভাঙতে আপনার লোম দাঁড়িয়ে যায়, এই আধুনিক কালে? সহজ কথায়, সেটা ভূতের ভয়।
কার্তিকের ঠিক সন্ধ্যাবেলা। বাড়ির পাশের বাঁশঝাড় থেকে ভেসে আসছে ইলিশ ভাজার গন্ধ। সবার না হলেও কারও কারও নাকে সেই গন্ধ ঢুকে পড়ে। শরীর শিরশির করে ওঠে অশরীরী কারও উপস্থিতির কথা ভেবে। মনে হলো, অদৃশ্য দুটি চোখ আপনাকে দেখছে আর ইলিশের গন্ধে ভোলাতে চাইছে। আপনি ভাবলেন, সর্বনাশ!
এসব ভাবনা নিছক কল্পনা নয়। কেউ কেউ এগুলোকে সত্য বলেই মেনে নেন। কেউ আবার তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন। সে যাক, সেসবে আগ্রহ নেই। আমাদের আগ্রহ বরং এই যে ভূত, বাংলা সংস্কৃতিতে যারা ব্রহ্মদৈত্য, পেতনি, শাকচুন্নি, মেছো কিংবা মামদো নামে পরিচিত, তারা কী পরে? তাদের কি কোনো ফ্যাশন আছে? ঠিক ফ্যাশন হিসেবে আমরা যা জানি, তা না থাকলেও ভূতের গল্পগুলোয় তাদের নিজস্ব পোশাক ও স্টাইলের কথা বলা হয়েছে সেই পুরোনো সময় থেকে। যেমন ব্রহ্মদৈত্যর গায়ে ধবধবে সাদা ধুতি, শাকচুন্নির পরনে লাল পেড়ে শাড়ি, পেতনির এলোমেলো বেশ। আবার মেছো ভূত মাছ খেতে পছন্দ করে। বাংলার লোককথায় ভূতেরা শুধু ভয় দেখানোর চরিত্র নয়; তাদের পোশাক, সাজসজ্জা, জীবনযাপন ও আচরণের মধ্যেও লুকিয়ে আছে বাঙালি সমাজের সংস্কৃতি, বিশ্বাস আর লোকজ কল্পনার বিচিত্র পরিচয়।
বাংলার ভূতের গল্পে ভয় যেমন আছে, তেমনি আছে সামাজিক ইতিহাস এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিফলন। এই ভূতেরা কেউ উচ্চ বর্ণের, কেউ বিবাহিত নারী, কেউ অকালমৃত, কেউ আবার মাছপ্রিয় খাদ্যরসিক। তাদের অনেকের পরিচয় তৈরি হয়েছে পোশাক ও সাজসজ্জার মধ্য দিয়ে।
বাংলার ভূতসমাজে ব্রহ্মদৈত্যকে বলা যায় অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধি। ফলে তার পোশাকও তেমনই। মূলত ধুতি। অনেকে আবার রাতের বেলা কাঠের খড়মের শব্দ শুনে মনে করেন, ব্রহ্মদৈত্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফলে বোঝা যায়, সেটিও তার পরিচ্ছদেরই অনুষঙ্গ।

লেখক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘ঘুঘুডাঙার ব্রহ্মদৈত্য’ গল্পে এই ভূতের সাজসজ্জার একটি চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে চরিত্রটির পরনে খাটো ধুতি, গায়ে কোনো জামা নেই, বুকে পইতা এবং পায়ে খড়ম।

শাকচুন্নি বাংলার পরিচিত নারী ভূত। বিভিন্ন বর্ণনায় একে সধবা ভূত বলা হয়। অর্থাৎ স্বামী জীবিত থাকতেই মারা যাওয়া অতৃপ্ত নারী হয়ে যায় শাকচুন্নি। ফলে তার পোশাকে বিবাহিত নারীর ছাপ স্পষ্ট। এদের শরীর সাধারণত অপুষ্ট। গায়ের রং সবুজ বা ফ্যাকাশে। আর পরনে থাকে সাদা বা লাল শাড়ি অথবা লাল পেড়ে সাদা শাড়ি। কোনো কোনো বর্ণনায় তার হাতে শাঁখা-পলা, সিঁথিতে সিঁদুর, কপালে লাল টিপ আর পায়ে নূপুরের কথাও বলা হয়েছে। আরেকটি পরিচিত ভূত হলো স্কন্ধকাটা বা কবন্ধ কাটা। এই ভূতের পরনে শুধু ধুতি দেখা যায়। আবার কোনো কোনো গল্পে তার পরনে সাহেবি পোশাকের কথাও জানা যায়।
মূলকথায় আসা যাক এবার। ভূতের গল্প একক কোনো দেশের বা সংস্কৃতির সম্পদ নয়। প্রায় সব দেশে এরা বর্তমান। পশ্চিমের দেশগুলোতে হোয়াইট লেডি বা সাদা পোশাকধারী নারী ভূতের কথা আছে। তারা শুধু গল্পেই নয়, চলচ্চিত্রেও আছে। অনেক ঐতিহাসিক ও ভুতুড়ে বাড়িতে গ্রে লেডি বা ধূসর পোশাকের নারীর উপস্থিতির কথা প্রচলিত আছে। এ ছাড়া কালো বা কালচে রঙের অবয়বের কথাও লোককথায় পাওয়া যায়। আবার অনেক প্যারাসাইকোলজিক্যাল গবেষণায় ভূতকে সম্পূর্ণ বা আংশিক রঙিন পোশাক বা চুলে দেখার দাবি করেছেন অনেকে।
আসল কথা হলো, বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এদের উপস্থিতি বিভিন্নভাবে। ফলে বিশ্ব ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে তার হাওয়া লাগাও বিচিত্র নয়। ভূতদের বৈচিত্র্যপূর্ণ পোশাক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ফ্যাশনের জগতে অনেক ডিজাইনার ইতিমধ্যে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন। আমাদের দেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির ডিজাইনাররাও পিছিয়ে নেই এ ক্ষেত্রে। বিশ্বজুড়ে ভূতদের এই পোশাক দেখা যায় বিশেষ করে হ্যালোইনের সময়, অর্থাৎ অক্টোবর মাসজুড়ে। আর আমাদের দেশে সমাগত ভূত চতুর্দশীকে সামনে রেখে অনেকে একটা ফিউশন করার চেষ্টা করে থাকেন।
হরিতকী ও মনচাঙ্গা নামের দুটি ফ্যাশন হাউসও সে রকম পোশাক তৈরি করেছে। তারা মূলত দেশীয় ভূত এবং তাদের পোশাকের একটা কম্বিনেশন তৈরি করেছে। ব্রহ্মদৈত্যর ধুতির সঙ্গে তৈরি হয়েছে পাঞ্জাবি। আর শাকচুন্নি পরেছে বাহারি লাল শাড়ি।
‘ভূত’ শব্দটি বেশ অন্য রকম। এর অর্থ অশরীরী আত্মা। আমরা যাকে দেখলে বা যার কথা ভাবলে ভয় পাই। এর আর একটি অর্থ অতীত কাল, যা ঘটে গেছে। এ দুটি অর্থের বাইরে শব্দটির আরও দুটি অর্থ আছে। সেই অর্থে আছে মানুষ ও পৃথিবী। অর্থাৎ ভূত শব্দটির একটি অর্থ জীব বা সৃষ্টি, সে জন্যই বলা হয় ‘সর্বভূতে দয়া করো’। অন্য অর্থ পঞ্চভূত বা পৃথিবী সৃষ্টির মৌলিক পাঁচটি উপাদান। ভূত শব্দটির সঙ্গে যেহেতু মানুষের যোগাযোগ আছে, তাই ফ্যাশনেরও যোগাযোগ থাকবে। তাতে নতুন নতুন উপাদান যোগ হবে। এভাবেই ভূতেরা অতীত থেকে বর্তমানে বিরাজ করছে।









