Ajker Patrika

বিশ্বযুদ্ধের প্রেমের যাত্রা থেমেছিল হাওরে, কুলপতাক গ্রামে শায়িত তিন অস্ট্রেলীয়

নেত্রকোনা প্রতিনিধি
বিশ্বযুদ্ধের প্রেমের যাত্রা থেমেছিল হাওরে, কুলপতাক গ্রামে শায়িত তিন অস্ট্রেলীয়
কুলপতাক ব্যাপ্টিস্ট চার্চের আঙিনায় একটি সমাধিতে শায়িত সিরিল জেমস মূর ও এডনা। পাশেই আলাদা সমাধিতে রয়েছেন রোনাল্ড চেস্টারটন পটার। ছবি: আজকের পত্রিকা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজছে চারদিকে। সেই অস্থির সময়ে ময়মনসিংহ অঞ্চলে পরিচয়, তারপর প্রেম—অস্ট্রেলীয় নাগরিক সিরিল জেমস মূর ও এডনার। যুদ্ধের বিভীষিকার মাঝেও স্বপ্ন দেখেছিলেন একসঙ্গে ঘর বাঁধার। বিয়ের জন্য বেছে নিয়েছিলেন নেত্রকোনার মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের একটি ব্যাপ্টিস্ট চার্চ। কিন্তু সেই গন্তব্যে আর পৌঁছানো হয়নি তাঁদের। হাওরের বুক চিরে বিয়ের পথে এগিয়ে চলা নৌকাটি ঝড়ের কবলে পড়ে। থেমে যায় মূর ও এডনার নতুন জীবনের স্বপ্ন। প্রাণ হারান তাঁদের সঙ্গী অস্ট্রেলীয় সেনা কর্মকর্তা রোনাল্ড চেস্টারটন পটারও।

১৯৪৪ সালের ২৯ জুলাইয়ের সেই মর্মান্তিক ঘটনা। প্রায় আট দশক পেরিয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে হাওরের জনপদ, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা। কিন্তু মোহনগঞ্জের কুলপতাক ব্যাপ্টিস্ট চার্চের আঙিনায় পাশাপাশি থাকা তিনটি সমাধি আজও বহন করছে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব আর যুদ্ধকালীন এক করুণ ইতিহাসের স্মৃতি।

বিয়ের উদ্দেশে দীর্ঘ যাত্রা

স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য ও চার্চের সংরক্ষিত ডায়েরি অনুযায়ী, সিরিল জেমস মূর ও এডনা ১৯৪৪ সালের ২৮ জুলাই ময়মনসিংহ থেকে গোবিন্দশ্রীর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। সঙ্গে ছিলেন মূরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু রোনাল্ড চেস্টারটন পটার। তিনি অস্ট্রেলীয় সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা ছিলেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর হয়ে এ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

প্রথমে ট্রেনে ময়মনসিংহ থেকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে পৌঁছান তাঁরা। বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ময়মনসিংহ থেকে আরও কয়েকজনও তাঁদের সঙ্গে আসেন। এরপর শুরু হয় নৌপথের যাত্রা।

মোহনগঞ্জ থেকে শাপমারা খাল হয়ে ডিঙ্গাপোতা হাওর পেরিয়ে ছেছরাখালী, বর্তমানে আদর্শনগর বাজারের খাল দিয়ে ধলাই নদীতে ওঠেন তাঁরা। সেখান থেকে বাওয়াইচের হাওর পেরিয়ে গোবিন্দশ্রীর কাছাকাছি পৌঁছানোর সময় হঠাৎ বৈরী আবহাওয়ার মুখে পড়ে তাঁদের নৌকা।

ঝড়ের রাতে শেষ হয়ে যায় তিন জীবন

প্রচণ্ড ঝড়ে নৌকাটি উল্টে গেলে পানিতে পড়ে যান যাত্রীরা। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মূর, এডনা ও পটার সাঁতার জানতেন না। সন্ধ্যার দিকে নৌকাডুবির খবর পেয়ে গোবিন্দশ্রী গ্রামের লোকজন নৌকা নিয়ে উদ্ধার করতে ছুটে যান। কিন্তু তাঁদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। পানিতে ডুবে তিন অস্ট্রেলীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়।

যে যাত্রা শুরু হয়েছিল বিয়ের আনন্দ আর নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে, তার পরিণতি হয় শোকে। স্থানীয় লোকজন তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করে গোবিন্দশ্রীতে সমাহিত করেন।

যে চার্চে বিয়ের আয়োজন হওয়ার কথা ছিল, সেখানে আর বিয়ের ঘণ্টা বাজেনি। বর-কনে ও তাঁদের বন্ধুর জন্য তৈরি হয়েছিল তিনটি সমাধি।

গোবিন্দশ্রী থেকে কুলপতাকে সমাধির স্মৃতি

দীর্ঘদিন গোবিন্দশ্রী গ্রামের সমাধিগুলো স্থানীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের কাছে স্মৃতির অংশ হয়ে ছিল। পরে ১৯৫৮ সালে গোবিন্দশ্রী ব্যাপ্টিস্ট চার্চের সদস্যরা মোহনগঞ্জ উপজেলার কুলপতাক গ্রামে চলে আসেন। সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় কুলপতাক ব্যাপ্টিস্ট চার্চ। পরবর্তী সময়ে তিন অস্ট্রেলীয় নাগরিকের সমাধিও নতুন চার্চ প্রাঙ্গণে স্থানান্তর করা হয়।

সেই থেকে কুলপতাক চার্চের আঙিনায় সংরক্ষিত রয়েছে তাঁদের স্মৃতিচিহ্ন। সময়ের ব্যবধানে সমাধিগুলো হয়ে উঠেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের এক বিস্মৃত যোগসূত্র।

সমাধিফলকে লেখা প্রেম ও বন্ধুত্বের ইতিহাস

গত শুক্রবার কুলপতাক ব্যাপ্টিস্ট চার্চে গিয়ে দেখা যায়, চার্চের আঙিনায় পাশাপাশি রয়েছে তিন অস্ট্রেলীয় নাগরিকের সমাধি। একটি সমাধিতে শায়িত সিরিল জেমস মূর ও এডনা। পাশেই আলাদা সমাধিতে রয়েছেন রোনাল্ড চেস্টারটন পটার। মূর ও এডনার সমাধিফলকে তাঁদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সমাধিগুলোর পাশে দাঁড়ালে যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রায় আট দশক আগের সেই যাত্রার গল্প। যে দুই মানুষ একসঙ্গে নতুন জীবন শুরু করতে চেয়েছিলেন, তাঁদের শেষ ঠিকানা হয়েছে একই সমাধি। আর তাঁদের বন্ধুর সমাধি রয়েছে পাশেই।

কুলপতাক ব্যাপ্টিস্ট চার্চের সহকারী পালক ডেভিড দাস বলেন, চার্চটি একসময় পাশের মদন উপজেলায় ছিল। তখন সেখানে অনেক অস্ট্রেলীয় নাগরিকের বসবাস ছিল। সেই সূত্রেই জেমস মূর ও এডনা বিয়ের জন্য ওই চার্চকে বেছে নেন। তাঁদের সঙ্গে বন্ধু ও সেনা কর্মকর্তা রোনাল্ড চেস্টারটন পটারও ছিলেন।

ডেভিড দাস বলেন, ঝড়ের রাতে হাওর পেরিয়ে চার্চে যাওয়ার পথে তাঁদের নৌকাটি ডুবে যায়। তিনজনই সাঁতার জানতেন না। পরে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করে চার্চের পাশে সমাহিত করা হয়। চার্চটি কুলপতাকে স্থানান্তরিত হওয়ার পর সমাধিগুলোও সেখানে নিয়ে আসা হয়।

তিনি আরও বলেন, প্রতিবছর অস্ট্রেলিয়া ও ব্রিটিশ দূতাবাসের কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা সমাধিগুলো দেখতে এবং শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। তাঁদের মৃত্যুর ঘটনা ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য চার্চের ডায়েরিতে সংরক্ষিত রয়েছে, যাতে পরবর্তী প্রজন্মও এই ইতিহাস জানতে পারে।

হাওরের বুকে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী

কুলপতাক ব্যাপ্টিস্ট চার্চের ডায়েরিতে সংরক্ষিত রয়েছে সিরিল জেমস মূর, এডনা ও রোনাল্ড চেস্টারটন পটারের সেই স্মৃতিময় অধ্যায়। তাঁদের পরিচয়, যাত্রাপথ ও মৃত্যুর ঘটনা আজও আগলে রেখেছেন চার্চের সদস্যরা। গোবিন্দশ্রীর মাটিতে তৈরি হওয়া সেই তিনটি সমাধি আজ কুলপতাকে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে।

স্থানীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের কাছে সমাধিগুলো কেবল তিন বিদেশির শেষ ঠিকানা নয়; এগুলো ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও মানবিক সম্পর্কের এক অনন্য স্মারক। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলীয় ও ব্রিটিশ দূতাবাসের প্রতিনিধিদের আগমনও এই ইতিহাসের প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহের পরিচয় বহন করে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত