Ajker Patrika

যে দ্বীপে প্রতি দুজনের বিপরীতে আছে একটি ছাগল

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
যে দ্বীপে প্রতি দুজনের বিপরীতে আছে একটি ছাগল
সম্পূর্ণ আগ্নেয়গিরি দিয়ে ঘেরা কেপ ভার্দের সান্তিয়াগো দ্বীপ। ছবি: বার্সেলো ডট কম

বাংলাদেশে বসে ছাগল নিয়ে আমরা যতই হাসাহাসি করি না কেন, কেপ ভার্দের বেলায় হিসাবটা একেবারে ঠিক। সেই দ্বীপদেশটিতে আছে প্রতি দুজনের জন্য একটি ছাগল! আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা এক টুকরো বিস্ময় রিপাবলিক অব কেপ ভার্দে। অবশ্য দেশটি বিশ্বজুড়ে সংক্ষেপে কেপ ভার্দে নামে পরিচিত। বিশ্ব ফুটবলে দেশটি এখন বেশ শক্তিশালী অবস্থানে আছে। পর্তুগিজ ভাষায় কেপ ভার্দে শব্দের অর্থ সবুজ অন্তরীপ। পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল থেকে প্রায় ৩০০ মাইল দূরে অবস্থিত ১০টি দ্বীপ এবং ৫টি ছোট উপদ্বীপ নিয়ে তৈরি এই দেশ।

২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, ১ হাজার ৫৫৭ বর্গমাইলের এই ছোট্ট দেশটিতে প্রায় ৫ লাখ ২৭ হাজার মানুষের বাস। ১০টি দ্বীপের মধ্যে ৯টিতে মানুষের বসতি থাকলেও সান্তা লুজিয়া নামের সবচেয়ে ছোট দ্বীপটি ২০০ বছর ধরে সম্পূর্ণ জনমানবহীন। বিভিন্ন প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় শতভাগ নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এই দেশ।

শূন্য দ্বীপ থেকে দাসপ্রথার ট্রানজিট

সান্তা মনিকা সৈকতকে কেপ ভার্দের সবচেয়ে সুন্দর সৈকত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ছবি: আওয়ার এনস্যাসটর্স
সান্তা মনিকা সৈকতকে কেপ ভার্দের সবচেয়ে সুন্দর সৈকত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ছবি: আওয়ার এনস্যাসটর্স

১৪৫৬ সালে পর্তুগিজ অভিযাত্রী আলভিস কাদামোস্তো এবং আন্তোনিওত্তো উসোদিমারে প্রথম এই দ্বীপমালার সন্ধান পান। এর আগে দ্বীপটি ছিল বিরান। সন্ধান পাওয়ার ছয় বছর পর সেখানে মানুষ বসতি তৈরি করতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে পর্তুগিজরা এটিকে আফ্রিকা থেকে দাস পাচারের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট বা বন্দর হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। প্রায় ৫ লাখ আফ্রিকান দাসকে এই দ্বীপের ওপর দিয়ে আমেরিকায় পাচার করা হয়েছিল! সেই অন্ধকার ইতিহাস আজও বয়ে বেড়াচ্ছে সান্তিয়াগো দ্বীপের প্রাচীন রাজধানী সিদাদে ভেলহা—যার আগের নাম রিবেরা গ্রান্দে। বর্তমানে এটি দেশটির একমাত্র ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। এখানে জলদস্যুদের হাত থেকে বাঁচার জন্য তৈরি ১৬ শতকের দুর্গ ফোর্তালেজা রিয়াল দে সাও ফিলিপে, দাসদের শাস্তি দেওয়ার মার্বেল স্তম্ভ পেলোরিনহো এবং ক্রিস্টোফার কলম্বাস বা ভাস্কো দা গামার মতো বিখ্যাত অভিযাত্রীদের স্মৃতিবিজড়িত পথ আছে।

স্বাধীনতা এবং এক দেশের দুই ভাগ

একটা সময় ইউরোপীয়রা গিনি-বিসাউ এবং কেপ ভার্দেকে একটি দেশ হিসেবে শাসন করত। পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৭৪ সালে গিনি-বিসাউ এবং ১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই কেপ ভার্দে স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীন হওয়ার পরও কিছুদিন দেশ দুটি একসঙ্গে থাকার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯৮০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দুটি দেশ আলাদা হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর থেকে কেপ ভার্দে নিজেদের দারুণভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছে। বর্তমানে এটি পশ্চিম আফ্রিকার সবচেয়ে উন্নত জীবনযাত্রার দেশ। এখানে রয়েছে আফ্রিকার অন্যতম স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক সরকার।

প্রকৃতি যেখানে রুক্ষ কিন্তু সুন্দর

ভৌগোলিক দিক থেকে কেপ ভার্দে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। এর পূর্ব দিকের দ্বীপগুলো মূলত শুষ্ক ও সমতল। পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হলো প্রাইয়া দে সান্তা মারিয়া এবং দেশটির সুন্দরতম সৈকত সান্তা মনিকা বিচ। নীল জলরাশির এই সৈকতগুলো কাইট সার্ফিং এবং স্কুবা ডাইভিংয়ের জন্য বিশ্বখ্যাত। অন্যদিকে ফোগো এবং সান্তিয়াগো দ্বীপ সম্পূর্ণ আগ্নেয়গিরি দিয়ে ঘেরা। পিকো দো ফোগো দেশটির সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, যা একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। এখানকার উর্বর কালো আগ্নেয় মাটিতে চমৎকার আঙুর এবং কফি জন্মায়। আর সবচেয়ে সবুজ দ্বীপ সান্তো আন্তাও-এ তৈরি হয় তাদের জাতীয় পানীয় গ্রোগু। এটি আখ থেকে তৈরি একধরনের কড়া লিকার, যার সুবাস পাকা কলার মতো!

গত ১৫ জুন স্পেনের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করার পর কেপ ভার্দের সমর্থকদের ছাগল নিয়ে উচ্ছাস। ছবি: ইনস্টাগ্রাম
গত ১৫ জুন স্পেনের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করার পর কেপ ভার্দের সমর্থকদের ছাগল নিয়ে উচ্ছাস। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

তবে প্রকৃতির এক নির্মম সত্য হলো, কেপ ভার্দে পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক অঞ্চল। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখানে দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দেয়। এখানে চাষাবাদের উপযোগী জমি মাত্র ১০ শতাংশ হওয়ায় প্রয়োজনের ৯০ শতাংশ খাদ্যই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সুপেয় পানির সংকট এবং তীব্র খরার কারণে ২০ শতকে হাজার হাজার মানুষ দেশটি ছেড়ে চলে যায়। বর্তমানে কেপ ভার্দেতে যত মানুষ বাস করে, তার চেয়ে বেশি মানুষ বাস করে প্রবাসে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১ লাখ এবং পর্তুগালে কেপ ভার্দের প্রায় ৭০ হাজার মানুষ বসবাস করে।

অনন্য সংস্কৃতি ও ছাগলের গল্প

কেপ ভার্দের জনসংখ্যার ৭১ শতাংশ ক্রেওল, ২৮ শতাংশ আফ্রিকান এবং ১ শতাংশ ইউরোপীয়। দেশটির অফিশিয়াল ভাষা পর্তুগিজ হলেও ক্রিওলু ভাষা প্রচলিত আছে সেখানে। দেশটির সমাজে এক অদ্ভুত পরিসংখ্যান আছে। সেখানে প্রতি দুজনের বিপরীতে আছে একটি ছাগল। পর্তুগিজদের আনা এই ছাগলগুলোই এখন স্থানীয় মানুষের দুধ, মাংস এবং সুস্বাদু পনিরের প্রধান উৎস।

পৃথিবীতে লগারহেড কচ্ছপদের তৃতীয় বৃহত্তম প্রজননক্ষেত্র বলে গণ্য করা হয় কেপ ভার্দেকে। এ ছাড়া বোয়া ভিস্তার সমুদ্রে মার্চ-এপ্রিল মাসে হাম্পব্যাক তিমির খেলা দেখা যায়। আর ডানাওয়ালা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে লং-ইয়ার্ড ব্যাট বা লম্বা কানবিশিষ্ট বাদুড় এই দ্বীপের একমাত্র আদি ও নিজস্ব স্তন্যপায়ী জীব।

কেপ ভার্দের ঐতিহ্যবাহী ঘরানার মোর্না গানকে বিশ্বমঞ্চে জনপ্রিয় করেছিলেন দেশটির কিংবদন্তি গায়িকা সিজারিয়া ইভোরা। ছবি: উইকিপিডিয়া
কেপ ভার্দের ঐতিহ্যবাহী ঘরানার মোর্না গানকে বিশ্বমঞ্চে জনপ্রিয় করেছিলেন দেশটির কিংবদন্তি গায়িকা সিজারিয়া ইভোরা। ছবি: উইকিপিডিয়া

এখানকার সংস্কৃতির মূল প্রাণ একধরনের ধীর ও বিষাদময় ঐতিহ্যবাহী গান মোর্না। সে গানে ভালোবাসা, হারিয়ে যাওয়া আর আকুলতার গল্প বলা হয়। এই মোর্না গানকে বিশ্বমঞ্চে জনপ্রিয় করেন দেশটির কিংবদন্তি প্রয়াত গায়িকা সিজারিয়া ইভোরা।

কেপ ভার্দেতে জনসমক্ষে একা একা কিছু খাওয়া অত্যন্ত অভদ্রতা বলে গণ্য করা হয়। দেশটির মানুষেরা বিশ্বাস করে ‘শেয়ারিং ইজ কেয়ারিং’। তাই তারা খাবার কিনলে আশপাশের সবার সঙ্গে ভাগ করে খায়। অবশ্য বিশ্বকাপের মাঠে অসাধারণ সংস্কৃতির, লড়াকু ইতিহাসের কেপ ভার্দে হয়তো সেই মানসিকতা রাখে না। তখন হয়তো ৯০ মিনিটের লড়াই ‘শেয়ারিং’য়ের বদলে যুদ্ধে পরিণত হয়। তবে মাঠের বাইরে তাদের এই গল্প ফুটবলকে আসলেই আরও সুন্দর করে তোলে।

সূত্র: রাস্টিক পাথওয়েজ, আওয়ার এনস্যাসটর্স

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত