Ajker Patrika

চীনের বুকে এক টুকরা মারাকেশ

ফিচার ডেস্ক
চীনের বুকে এক টুকরা মারাকেশ

সরু গলিপথ, লাল মাটির দেয়াল আর জমজমাট সুক কিংবা ঐতিহ্যবাহী বাজার। প্রথমবারের মতো দেখায় যেকোনো মরক্কোবাসীর মনে হবে, তাঁরা বুঝি মরক্কোর ঐতিহাসিক শহর মারাকেশের প্রাচীন কোনো রাস্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছেন। জাফরান বা গেরুয়া রঙের দেয়াল, খোদাই করা কাঠের দরজা আর ছোট ছোট কারখানায় কারিগরদের কাজ করার দৃশ্য—সবকিছুই মনে করিয়ে দেয় সেই বিখ্যাত রেড সিটি কিংবা লাল শহরের কথা। তবে মজার বিষয় হলো, এই দৃশ্য মরক্কোর নয়, এটি মরক্কো থেকে প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চীনের সুদূর পশ্চিমের জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের একটি প্রাচীন ওয়েসিস বা মরূদ্যান শহর, নাম কাশগর।

■ ইন্টারনেটে আলোড়ন এবং মরক্কোবাসীর বিস্ময়

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাশগর শহরের বেশ কিছু ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর মরক্কো এবং বিভিন্ন আরব দেশের কনটেন্ট ক্রিয়েটররা বিস্মিত হয়েছেন। অনেক ভ্রমণকারী এসব ভিডিওতে জানিয়েছেন, রাস্তার ধারের চীনা সাইনবোর্ডগুলো না থাকলে যে কেউ ধরে নেবেন, তাঁরা মরক্কোতে আছেন। এক ভিডিওতে দেখা যায়, কাশগরের পরিবেশ দেখে এক পর্যটক এতটাই আপ্লুত হয়েছিলেন, ভুলবশত একজন স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে মরক্কোর নিজস্ব ভাষা ‘দারিজা’য় কথা বলতে শুরু করেন। শত শত বছরের প্রাচীন হওয়া সত্ত্বেও কাশগর কোনো উন্মুক্ত জাদুঘর বা মৃত শহর নয়; এটি স্পন্দনশীল ও জীবন্ত শহর। সে কারণে অনলাইনের কল্যাণে সুদূর এশিয়ার বুকে নিজেদের সংস্কৃতির এই প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়ে বিশ্বজুড়ে মরক্কোবাসী প্রতিনিয়ত মুগ্ধ হচ্ছে।

■ সিল্ক রোড এবং ইতিহাসের যোগসূত্র

এশিয়ার এক প্রান্তের একটি শহরের সঙ্গে আফ্রিকার অন্য প্রান্তের শহরের এই অবিশ্বাস্য মিল কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। আবার এই দুটি শহরের একটি সরাসরি কোনো শহরকে দেখে প্রভাবিতও হয়নি; বরং দুটি শহরই ইসলামিক স্থাপত্যশৈলীর এক বৃহৎ ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে গড়ে উঠেছে। সেখানে একই ধরনের জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপাদান এবং সমমানের নির্মাণকৌশল ব্যবহৃত হয়েছে।

প্রাচীন সিল্ক রোডের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র কাশগরের বয়স ২ হাজার বছরের বেশি। ঐতিহাসিক দিক থেকে এটি ১১ শতকে আলমোরাভিদ রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত মারাকেশ শহরের চেয়ে দ্বিগুণ পুরোনো। চীন, মধ্য এশিয়া, পারস্য এবং ভারতীয় উপমহাদেশের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় কাশগর এমন একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, যেখানে বণিক, তীর্থযাত্রী ও পর্যটকেরা শুধু পণ্যের আদান-প্রদানই করেননি, বরং নিজেদের চিন্তাভাবনা ও শিল্পকলাও বিনিময় করেছিলেন।

■ স্থাপত্য ও জীবনযাত্রার হুবহু মিল

কাশগরের প্রায় ৩ দশমিক ৬ বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত ওল্ড সিটি কিংবা প্রাচীন শহরটির সঙ্গে মরক্কোর মেদিনাগুলোর মিল সত্যিই দেখার মতো। প্রচণ্ড গরম থেকে বাঁচতে পর্যাপ্ত ছায়া পাওয়ার আশায় কাশগরের ওল্ড সিটির ভেতরের গলিপথগুলো অত্যন্ত সরু ও আঁকাবাঁকা করে তৈরি করা হয়েছে। এখানকার বাড়িগুলো কাদামাটি এবং রোদে পোড়ানো ইট দিয়ে তৈরি, যা শহরটিকে মারাকেশের মতোই একধরনের লালচে-মাটি রঙের আবহ এনে দিয়েছে। বাড়ির বাইরে সাধারণ দেয়াল থাকলেও ভেতরে রয়েছে চমৎকার উঠান। এই ব্যবস্থা বাসিন্দাদের গোপনীয়তা রক্ষার পাশাপাশি বাড়িকে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা রাখে। মারাকেশ বা ফেজ শহরের মেদিনাগুলোতেও ঠিক একই ধরনের বাড়ি দেখা যায়।

মারাকেশের মতো কাশগর শহরটিও গড়ে উঠেছে এর ব্যস্ত বাজারগুলোকে কেন্দ্র করে, যেখানে বিভিন্ন পাড়া কিংবা মহল্লা নির্দিষ্ট পেশা অনুযায়ী বিভক্ত। বংশানুক্রমিকভাবে এখনো সেখানে কাঠ খোদাইকারী, তামার কারিগর, কুমোর, তাঁতি এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার বিক্রেতারা তাঁদের ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন। এখানকার চা-খানা এবং বেকারিগুলো রাস্তাঘাটকে সব সময় প্রাণবন্ত করে রাখে। কাশগর ওল্ড সিটির ঠিক কেন্দ্রস্থলে আছে ১৫ শতকে নির্মিত ঐতিহাসিক ইদ কাহ মসজিদ। এটি চীনের অন্যতম বৃহত্তম মসজিদ। এটি শুধু কাশগরের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রই নয়, বরং শহরটির শতাব্দীপ্রাচীন ইসলামিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক।

সূত্র: ভিএন এক্সপ্রেস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত