Ajker Patrika

সুরা ফিলের প্রেক্ষাপট: কাবার অলৌকিক সুরক্ষা

ইসলাম ডেস্ক 
সুরা ফিলের প্রেক্ষাপট: কাবার অলৌকিক সুরক্ষা
পবিত্র কাবা। ছবি: সংগৃহীত

ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর ও শিক্ষণীয় ঘটনা হলো আসহাবুল ফিল বা হস্তী বাহিনীর ঘটনা। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে ইয়েমেনের দাম্ভিক শাসক আবরাহা পবিত্র কাবা শরিফ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কায় অভিযান চালায়। মানুষের তৈরি বিশাল শক্তির বিরুদ্ধে মহান আল্লাহর কুদরতি শক্তির সেই লড়াইয়ের ইতিহাস আজও মুমিনদের ইমানকে শাণিত করে। এই অলৌকিক ঘটনার বিবরণ দিয়েই মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে সুরা ফিল নাজিল করেছেন।

আবরাহার জিঘাংসা ও গির্জা নির্মাণ

ইয়েমেনের তৎকালীন শাসক আবরাহা চাইলেন মানুষ মক্কার কাবা শরিফে না গিয়ে যেন ইয়েমেনে তার তৈরি বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ গির্জায় তীর্থযাত্রা (হজ) করতে আসে। কিন্তু মক্কাবাসীর হৃদয়ে কাবার প্রতি অগাধ ভালোবাসা থাকায় তারা আবরাহার সেই গির্জাকে প্রত্যাখ্যান করে। লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, কোনো এক আরব ব্যক্তি ক্ষোভে সেই গির্জায় মলত্যাগ করে আসে অথবা আগুন লাগিয়ে দেয়। এ ঘটনায় আবরাহা চরম অপমানিত বোধ করে এবং প্রতিশোধ নিতে কাবা ঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার শপথ করে।

মক্কা অভিমুখে বিশাল হস্তী বাহিনী

পবিত্র কাবা ধ্বংসের জন্য আবরাহা বিশালাকার হস্তী বাহিনী নিয়ে মক্কার পথে রওনা হয়। পথে আরবের বিভিন্ন গোত্র তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তার বিশাল সামরিক শক্তির সামনে তারা পরাজিত হয়। মক্কার নিকটবর্তী মোগাম্মাস নামক স্থানে পৌঁছে আবরাহার সেনারা মক্কাবাসীদের বহু গবাদিপশু লুট করে, যার মধ্যে তৎকালীন কুরাইশ নেতা আবদুল মুত্তালিবের ২০০টি উটও ছিল।

আবদুল মুত্তালিব ও আবরাহার কথোপকথন

আবরাহা কুরাইশদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায়নি, বরং তার লক্ষ্য ছিল কাবা ধ্বংস করা। আবদুল মুত্তালিব যখন আবরাহার কাছে তাঁর লুট হওয়া উটগুলো ফেরত চাইলেন, তখন আবরাহা বিস্মিত হয়ে বলল, ‘আমি আপনার উপাস্য ঘর ধ্বংস করতে এসেছি, আর আপনি সে বিষয়ে কিছু না বলে আপনার উটের কথা বলছেন?’ আবদুল মুত্তালিব অটল কণ্ঠে জবাব দিয়েছিলেন, ‘উটের মালিক আমি, তাই আমি উট চাচ্ছি। আর এই ঘরের মালিক মহান আল্লাহ, তিনিই তাঁর ঘর হেফাজত করবেন।’

পাখির ঝাঁক ও আবরাহার করুণ পরিণতি

পরদিন সকালে যখন আবরাহার বাহিনী কাবার দিকে অগ্রসর হতে চাইল, তখন তাদের প্রধান হাতি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তাকে কোনোভাবেই কাবার দিকে নেওয়া যাচ্ছিল না। ঠিক সেই মুহূর্তে মহান আল্লাহর নির্দেশে সাগর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে এল।

প্রতিটি পাখির চঞ্চুতে ও পায়ে মোট তিনটি করে কঙ্কর ছিল। এই কঙ্করগুলো যখন সেনাদের ওপর নিক্ষিপ্ত হলো, তা বুলেটের মতো তাদের শরীর ভেদ করে চলে গেল। এভাবে আবরাহার বাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে ধ্বংস হয়ে গেল। আবরাহা নিজে সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়নি; বরং তার শরীরে পচন ধরে এবং অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক অবস্থায় ইয়েমেনে পৌঁছানোর পর তার মৃত্যু হয়।

কিয়ামত পর্যন্ত আসা মানুষের জন্য শিক্ষা

এ ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘আপনি কি দেখেননি, আপনার পালনকর্তা হস্তী বাহিনীর সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেছেন? তিনি কি তাদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেননি? তিনি তাদের ওপর প্রেরণ করেছেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি, যারা তাদের ওপর নিক্ষেপ করছিল পাথরের কঙ্কর। অতঃপর তিনি তাদের করে দিলেন ভক্ষিত তৃণসদৃশ।’ (সুরা ফিল: ১-৫)

আবরাহার এই পতন প্রমাণ করে, আল্লাহর ঘরের ওপর আঘাত করতে আসা কোনো শক্তিই টিকে থাকতে পারে না। এটি দম্ভ ও অহংকারের বিরুদ্ধে আল্লাহর এক চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি। আজও আবরাহার সেই পরিণতির কথা শুনে বিশ্বাসীরা আল্লাহর অসীম ক্ষমতার প্রতি সিজদাবনত হয়।

লেখক: মাওলানা মাহাদী হাসান পলাশ, দাঈ ও সমাজ গবেষক।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত