Ajker Patrika

আল্লামা হাবিবুর রহমান আজমি: প্রথিতযশা মুহাদ্দিস ও পাণ্ডুলিপি গবেষক

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আন নোমান আরীফী
আল্লামা হাবিবুর রহমান আজমি: প্রথিতযশা মুহাদ্দিস ও পাণ্ডুলিপি গবেষক
আল্লামা হাবিবুর রহমান আজমি (রহ.)। ছবি: সংগৃহীত

আল্লামা হাবিবুর রহমান আজমি (১৯০১-১৯৯২ খ্রি.) কেবল হিন্দুস্তান বা আরব বিশ্বে নয়, বরং সমকালীন মুসলিম বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকজন পণ্ডিত, ফকিহ ও মুহাদ্দিসের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাম। হাদিস শাস্ত্রের বিলুপ্তপ্রায় পাণ্ডুলিপি উদ্ধার ও সম্পাদনায় (তাহকিকুত তুরাস) তাঁর অবদান তাঁকে বিশ্বজুড়ে অমর করে রেখেছে।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন: দেওবন্দের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সান্নিধ্য

মাওলানা হাবিবুর রহমান আজমি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন মাওলানা আবুল হাসান ইরাকি ও মাওলানা আবদুর রহমান আওরঙ্গবাদির কাছে। তবে তাঁর জীবনের প্রকৃত রূপকার ছিলেন প্রাজ্ঞ শিক্ষক মাওলানা আবদুল গফফার ইরাকি। উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য তিনি ইলমের প্রাণকেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দে গমন করেন। সেখানে তিনি সমকালীন যেসব শ্রেষ্ঠ ওস্তাদের সান্নিধ্য লাভ করেন, তাঁরা হলেন আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.), আল্লামা শাব্বির আহমাদ উসমানি (রহ.), সাইয়িদ আসগর হুসাইন (রহ.) প্রমুখ।

কর্মজীবন ও গবেষণায় বিপ্লব

প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ শেষে তিনি শিক্ষকতা শুরু করলেও পরে গবেষণায় পূর্ণ মনোযোগ দেন। তিনি বিশেষত হাদিস শাস্ত্রের দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য কিতাবসমূহ খুঁজে বের করে তা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থসমূহ আজ বিশ্বের বড় বড় গ্রন্থাগারের শোভা বর্ধন করছে।

তাঁর উল্লেখযোগ্য সম্পাদিত কিতাবসমূহ:

  • ১. মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক (১১ খণ্ড)
  • ২. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ (১৫ খণ্ড)
  • ৩. আল-মাতালিবুল আলিয়া (৪ খণ্ড)
  • ৪. মুসনাদে হুমাইদি (২ খণ্ড)
  • ৫. আজ-জুহ্দ ওয়ার রাকাইক (ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক)

বিশ্ববরেণ্য আলেমদের দৃষ্টিতে আল্লামা আজমি

আল্লামা আজমির পাণ্ডিত্য দেখে সমকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মুহাক্কিকরা অবাক হয়েছিলেন। তাঁর সম্পর্কে কয়েকজন প্রখ্যাত আলেমের মন্তব্য:

  • ১. আল্লামা জাহেদ কাউসারি (মিসর):

মিসরের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস জাহেদ কাউসারি তাঁকে ‘অনন্য গবেষক’ উপাধিতে সম্বোধন করতেন। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)-এর একটি দুর্লভ পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করে দেওয়ার পর কাউসারি (রহ.) তাঁর প্রতি ঈর্ষান্বিত প্রশংসা করেছিলেন।

  • ২. আল্লামা আহমাদ মুহাম্মাদ শাকের (মিসর):

মিশরের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও মুহাদ্দিস আল্লামা আহমাদ শাকের তাঁর ‘মুসনাদে আহমাদ’-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থের ওপর আজমির সূক্ষ্ম তাত্ত্বিক পর্যালোচনা দেখে মুগ্ধ হন এবং তা কিতাবের সঙ্গে ছেপে দেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আগে তাঁকে চেনার সৌভাগ্য হয়নি, কিন্তু তাঁর চিঠির মাধ্যমে তাঁর গভীর গবেষণার ব্যাপ্তি বুঝতে পেরেছি।’

  • ৩. শায়খুল আজহার আবদুল হালিম মাহমুদ:

তৎকালীন শায়খুল আজহার এক আন্তর্জাতিক মজলিসে আল্লামা আজমিকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, যদি পুরো বিশ্বে কাউকে “মুহাদ্দিসে আজম” উপাধিতে ভূষিত করা যায়, তবে তিনি হলেন আল্লামা আজমি।’

  • ৪. হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলি থানবি (রহ.):

হাদিস অস্বীকারকারীদের জবাবে আল্লামা আজমির লেখা ‘নুসরাতুল হাদিস’ কিতাব দেখে মাওলানা থানবি বলেছিলেন, ‘আমি এমন পূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁত কিতাব লিখতে অক্ষম।’

আল্লামা হাবিবুর রহমান আজমি ছিলেন ভারতবর্ষের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর বিনয় ও জ্ঞানের গভীরতা বিশ্বের বড় বড় আলেমের মাথা নত করতে বাধ্য করেছে। ইলমে হাদিসের এই মহান খাদেম ১৯৯২ সালে পরলোকগমন করেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত