স্বার্থপরতা এক মানবিক দুর্বলতা—যা ব্যক্তির চিন্তা-চেতনাকে কেন্দ্রমুখী করে তোলে। যখন এই স্বভাব একক ব্যক্তি থেকে পরিবার এবং সমাজে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা নানাবিধ দ্বন্দ্ব, বিচ্ছিন্নতা ও অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কোরআন-সুন্নাহ এ বিষয়ে আমাদের সতর্ক করেছে, আর আধুনিক সমাজবিজ্ঞানও এ ধরনের আচরণের নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরেছে।
স্বার্থপরতা মানে নিজের প্রয়োজন, সুবিধা ও চাহিদাকে অন্যের চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া। এর বহুমুখী রূপ হলো, আত্মকেন্দ্রিক, উপকারভোগী মনোভাব, সম্পর্কে এক পাক্ষিক প্রত্যাশা, পারিবারিক দায়িত্ব এড়ানো ও সামাজিক সহনশীলতার অভাব।
এর ফলে তৈরি হয়—
১. পরিবারিক বিভক্তি ও শীতলতা
পিতা-মাতা, ভাইবোন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ত্যাগের জায়গায় যখন ‘আমার সুবিধা আগে’ মনোভাব ঢুকে পড়ে—তখন ঘরে ঘরে ঝগড়া, অবিশ্বাস ও বিচ্ছিন্নতা দেখা দেয়।
২. সমাজে পারস্পরিক অবিশ্বাস
সমাজে মানুষ একে অপরকে ব্যবহার্য বস্তু হিসেবে দেখতে শুরু করে, ফলে সহানুভূতি, উদারতা ও ন্যায়বিচার হ্রাস পায়। এর পরিণতিতে সমাজে হিংসা, প্রতারণা ও অপরাধ বাড়ে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ন্যায়বিচার কর, সৎকাজের আদেশ দাও এবং আত্মীয়-স্বজনের হক দাও। আর অশ্লীলতা, অন্যায় ও অহংকার নিষেধ করো।’ (সুরা নাহল: ৯০)। অন্য আয়াতে এসেছে, ‘তোমরা পরস্পরের ধনসম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না...।’ -(সুরা বাকারা: ১৮৮)
এই আয়াতগুলো স্বার্থপরতা বর্জনের এবং সামাজিক সুবিচার ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সত্যিকার মোমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য এমন কিছু চাও, যা তোমরা নিজেদের জন্য চাও।’ (সহিহ্ বুখারি: ১৩)
এই হাদিস সরাসরি স্বার্থপরতার বিপরীতে আত্মত্যাগ ও সহানুভূতির শিক্ষা দেয়।
মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী, স্বার্থপরতা পারিবারিক বন্ধন দুর্বল করে—যা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ পারস্পরিক নির্ভরতায় টিকে থাকে। সামাজিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা সহানুভূতিশীল ও অংশীদারত্বের আচরণ করে—তারা দীর্ঘ মেয়াদে বেশি সুখী ও সফল হয়।
পারিবারিক বন্ধন ভাঙন, মানসিক অবসাদ ও একাকিত্ব—সমাজে অপরাধের হার বৃদ্ধি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও দ্বন্দ্ব ইত্যাদি হলো স্বার্থপরতার পরিণতি ও ফলাফল।
স্বার্থপরতা দূর করতে কয়েকটি কাজ করা যায়—
১. আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া চর্চা
আল্লাহভীতির মাধ্যমে মানুষ নিজে পরিশুদ্ধ হয় ও অন্যদের হক আদায়ে সচেষ্ট হয়।
২. পারস্পরিক ত্যাগ ও সহযোগিতা
পরিবার ও সমাজে একে অপরকে সহায়তা করা ও কিছু ছাড় দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা। সুস্থ পারিবারিক বন্ধন রক্ষা, খোলা মনে আলোচনা করা, একে অপরকে সময় দেওয়া, সম্মান ও দায়িত্ব ভাগাভাগির মাধ্যমে পরিবারে সুস্থ পরিবেশ গড়ে তোলা।
এ ছাড়া সামাজিক শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে স্কুল, মসজিদ, গণমাধ্যম ও সমাজ উন্নয়নমূলক সংগঠনগুলো সচেতনতামূলক কাজ করা।
বহুমুখী স্বার্থপরতা আজকের সমাজ ও পরিবারের শান্তি নষ্ট করছে। ইসলাম এই প্রবণতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে আত্মত্যাগ, পরোপকার ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা দিয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানও এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। তাই কোরআন-সুন্নাহর আলোকে এবং সচেতন প্রয়াসে আমরা একটি শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল সমাজ গঠন করতে পারি।
আরও পড়ুন:

মুমিনের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা। এটি এমন এক আমল, যা সরাসরি কোরআনের নির্দেশ এবং অসংখ্য সহিহ হাদিসে এর ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পাঠ করেন।
৬ ঘণ্টা আগে
একজন মুমিনের জন্য নামাজ হলো আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও জীবনের বরকত লাভের সর্বোত্তম মাধ্যম। প্রতিদিন সময়মতো নামাজ আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ। নিচে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য আজকের নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো।
১০ ঘণ্টা আগে
মানবজীবনে জীবনসঙ্গীর প্রভাব অপরিসীম। একজন ভালো সঙ্গী মানুষকে আলোর পথে চালিত করে, আর মন্দ সঙ্গী জীবনকে বিপথগামী করে তোলে। সারা দিনের ক্লান্তি শেষে ঘরে ফিরে সঙ্গীর একটু সহমর্মিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ দেহ-মনকে প্রফুল্ল করে তোলে, মানুষকে নতুন উদ্যমে বাঁচার প্রেরণা জোগায়।
১ দিন আগে
মহানবী মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাচনশৈলীর অধিকারী। তাঁর কথা বলার ধরন ও শব্দ চয়ন ছিল এতটাই মনোমুগ্ধকর, যা শ্রোতার হৃদয়ে সরাসরি রেখাপাত করত। তাঁর সুমিষ্ট বাণী মানুষকে সত্যের পথে আকর্ষিত করত।
১ দিন আগে