Ajker Patrika

ইনসাফ—রাজনৈতিক নৈতিকতার মেরুদণ্ড

আনওয়ার হুসাইন
আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ১১: ৩৭
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় তার সংবিধানে নয়, বরং সেই সংবিধানের ন্যায়সংগত প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়—বিপুল সম্পদ, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা শক্তিশালী সামরিক বাহিনী কোনো রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে পারে না, যদি সেখানে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার অনুপস্থিত থাকে। পক্ষান্তরে, সীমিত সম্পদ নিয়েও অনেক রাষ্ট্র দীর্ঘকাল স্থিতিশীল থেকেছে কেবল ন্যায়ের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে। ইসলাম এই শাশ্বত সত্যকেই তার রাষ্ট্রদর্শনের মূল ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করেছে।

রাষ্ট্রপ্রধান জাতির নৈতিক অভিভাবক

ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধান কেবল একজন প্রশাসনিক শাসক নন; তিনি জাতির নৈতিক অভিভাবক এবং আমানতের ধারক। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন যে তোমরা যেন আমানতসমূহ তার হকদারদের নিকট পৌঁছে দাও। আর যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করবে।’ (সুরা নিসা: ৫৮)

এখানে ‘আমানত’ শব্দটির পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার—সবই রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত। এই আমানতে সামান্য খিয়ানতও কেবল রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং একটি গুরুতর নৈতিক ও ধর্মীয় অপরাধ।

ন্যায়ের অবিচল মানদণ্ড

ইসলামি ন্যায়বোধ কোনো সুবিধাবাদী বা একপক্ষীয় ধারণা নয়। ন্যায়বিচার মানে কেবল নিজের অনুকূলে রায় পাওয়া নয়; বরং সত্যের পক্ষে অটল থাকাই হলো প্রকৃত ইনসাফ। কোরআন নির্দেশ দেয়, ‘হে মুমিনগণ, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানে তোমরা অবিচল থাকবে। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শক্ৰতা তোমাদের যেন সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা সুবিচার করবে, এটা তাকওয়ার অধিকতর নিকটবর্তী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবহিত।’ (সুরা মায়েদা: ৮)

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জন্য এটি একটি কালজয়ী দিকনির্দেশনা। রাষ্ট্রপ্রধান যদি দলীয় আনুগত্য, রাজনৈতিক স্বার্থ কিংবা সংকীর্ণ বলয়ের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে ন্যায়ের প্রশ্নে আপস করেন, তবে সমাজে বৈষম্যের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুশাসন

রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন ন্যায়পরায়ণতার এক অতুলনীয় আদর্শ। তাঁর শাসনামলে আইন ছিল সবার জন্য সমান। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।’ (সহিহ বুখারি: ৬৭৮৮)। এই বলিষ্ঠ উচ্চারণের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে গেছেন যে ব্যক্তির বংশমর্যাদা, প্রভাব কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে আত্মীয়তা ন্যায়বিচারের পথে কোনোভাবেই প্রতিবন্ধক হতে পারে না। এটিই ইসলামের রাজনৈতিক নৈতিকতার মেরুদণ্ড।

খোলাফায়ে রাশেদিন ও জনমুখী শাসন

ইসলাম ন্যায়পরায়ণ শাসককে কেবল পার্থিব কল্যাণের প্রতীক মনে করে না, বরং তাঁর সফলতাকে পরকালীন মুক্তির সর্বোচ্চ সোপান হিসেবে ঘোষণা করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘সাত শ্রেণির মানুষ কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় পাবেন; তাঁদের মধ্যে প্রথমজন হলেন ন্যায়পরায়ণ শাসক।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

ন্যায়বিচারের এই ধারা খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে পূর্ণতা পেয়েছিল। বিশেষ করে হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনকাল বিশ্ব ইতিহাসের এক বিস্ময়। তাঁর সেই কালজয়ী উক্তি—‘ফোরাত নদীর তীরে একটি কুকুরও যদি অনাহারে মারা যায়, তবে আমি আশঙ্কা করি আল্লাহর দরবারে আমাকে এ জন্য জবাবদিহি করতে হবে’—শাসককে জনগণের প্রকৃত সেবকে পরিণত করার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

আজকের বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বৈষম্য ও অনিশ্চয়তার মূলে রয়েছে ন্যায়বিচারের সংকট। যখন রাষ্ট্রপ্রধান ন্যায়ের বদলে ক্ষমতার স্থায়িত্ব ও পক্ষপাতকে অগ্রাধিকার দেন, তখন রাষ্ট্রের অবক্ষয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। ইসলাম এই বৈশ্বিক সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে ‘ইনসাফ’ বা ‘ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠার কথা বলে।

লেখক: শিক্ষক, মা’হাদুল মাদীনাহ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত