Ajker Patrika

বসতবাড়ির ব্যাটারিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্মন্ট অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ২১: ৩৩
বসতবাড়ির ব্যাটারিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্মন্ট অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র
ছবি: বিবিসি

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্মন্ট অঙ্গরাজ্যে বসতবাড়িতে বসানো ব্যাটারিগুলোকে এক সুতায় গেঁথে তৈরি করা হয়েছে এমন এক বিদ্যুৎব্যবস্থা, যা এখন রাজ্যটির বিদ্যুতের সবচেয়ে বড় উৎসে পরিণত হয়েছে। বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের সময় বাড়িগুলোকে ব্যাকআপ সরবরাহের পাশাপাশি এসব ব্যাটারি একসঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্ট’ বা ভার্চুয়াল বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। এতে গ্রাহকেরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছেন এবং প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় কম খরচে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত কয়েক বছরে ভার্মন্টে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা বেড়েছে। এতে বিদ্যুৎ-বিভ্রাটও বেড়েছে। ভার্মন্টের বাসিন্দা পলিয়ানা ব্লাডাইকা বলেন, পরিস্থিতি একসময় অসহনীয় পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। যখনই ঝড় হতো, তখনই বিদ্যুৎ চলে যেত, কখনো কখনো কয়েক ঘণ্টার জন্য। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালে তিনি গ্যাসচালিত জেনারেটর কেনার কথা ভাবছিলেন।

তবে জেনারেটর বসানোর জন্য ডাকা ইলেকট্রিশিয়ান তাঁকে গ্রিন মাউন্টেন পাওয়ারের একটি বিকল্প ব্যবস্থার কথা জানান। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্মন্টের সবচেয়ে বড় এই বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের বাড়িতে ব্যাটারি বসানোর একটি ব্যবস্থা চালু করেছে। এতে দুটি ব্যাটারি বসানোর জন্য ১০ বছরের লিজ চুক্তিতে মাসে ৫৫ ডলার দিতে হয়।

ব্লাডাইকা ও তাঁর স্বামী বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর নেওয়ার পর ব্যাটারি ব্যবস্থাটিকেই বেছে নেন। কারণ, তাঁরা যে গ্যাস জেনারেটর কিনতে চেয়েছিলেন, সেটির খরচ প্রায় ১২ হাজার ডলার। ২০২৪ সালে ব্যাটারি বসানোর পর থেকে তাঁদের বাড়িতে আর একবারও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়নি।

ভার্মন্টে এখন ৫ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ একই ধরনের বাড়িভিত্তিক ব্যাটারি ব্যবহার করছেন। বাড়িতে বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের সময় নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি এসব ব্যাটারি একসঙ্গে একটি বৃহত্তর বিদ্যুৎব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করছে। এই ব্যবস্থাই ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্ট নামে পরিচিত।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে এখন ৪০ গিগাওয়াটের বেশি ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্ট সক্ষমতা রয়েছে। প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় এটি এখনো ছোট। তবে ২০২৫ সালের মার্কিন জ্বালানি বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্টের মাধ্যমে ১৬০ গিগাওয়াট সক্ষমতা কাজে লাগানো যাবে। এটি ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশিত সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশের সমান।

ভার্মন্টে ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্টের অন্যতম বড় সুবিধা হলো বিদ্যুৎ-বিভ্রাট মোকাবিলা করা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা বাড়ছে। ভার্মন্টেও বন্যা থেকে শুরু করে তুষারঝড় পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ দেখা যাচ্ছে। ২০২২ সালে সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে অ্যাসোসিয়েট প্রেসও (এপি) যুক্তরাষ্ট্র ও ভার্মন্টে বিদ্যুৎ-বিভ্রাট বাড়ার প্রবণতা তুলে ধরেছিল।

গ্রিন মাউন্টেন পাওয়ারের ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষতিকর ১০টি ঝড়ের সাতটিই গত এক দশকে ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে এসব ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি।

ভার্মন্টের গ্রামীণ পরিবেশ ও শীতকালে প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। তবে বাড়িতে ব্যাটারি থাকার কারণে ব্লাডাইকার মতো গ্রাহকদের সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে। তাঁর ব্যাটারি সীমিত বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রায় দুই দিন পর্যন্ত বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে।

উত্তর ভার্মন্টের বাসিন্দা মেগান ব্রাউনিংও গ্রিন মাউন্টেন পাওয়ারের কর্মসূচির মাধ্যমে দুটি ব্যাটারি নিয়েছেন। তাঁর বাড়িতে ছাদে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রায় এক বছর ধরে তিনি বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের মুখে পড়েননি। সম্প্রতি একটি ঝড়ে তাঁর বাড়ির কাছে বিদ্যুতের লাইন পড়ে গেলে আশপাশের অনেক বাড়ি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। তবে তিনি বিষয়টি টেরই পাননি। তাঁর বাড়িতে ওই ঝড়ের মধ্যেও বিদ্যুৎ ছিল।

মেগান ব্রাউনিং জানান, এক বছর আগে বাড়িতে ব্যাটারি বসানোর পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দিন বিদ্যুৎ যায়নি। ছবি: বিবিসি
মেগান ব্রাউনিং জানান, এক বছর আগে বাড়িতে ব্যাটারি বসানোর পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দিন বিদ্যুৎ যায়নি। ছবি: বিবিসি

গ্রিন মাউন্টেন পাওয়ার ভার্মন্টের ৭৫ শতাংশের বেশি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ-বিভ্রাট পুরোপুরি দূর করার লক্ষ্য রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এই পরিকল্পনায় বাড়িভিত্তিক ব্যাটারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কীভাবে ভার্চুয়াল বিদ্যুৎকেন্দ্র কাজ করে

গ্রিন মাউন্টেন পাওয়ারের এই কর্মসূচি ২০১৭ সালে পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে শুরু হয়েছিল। ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্ট বিশেষজ্ঞ কেট পিটার্সের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় ব্যাটারি কর্মসূচি হতে পারে।

প্রয়োজনের সময় প্রতিষ্ঠানটি কর্মসূচিতে যুক্ত গ্রাহকদের ব্যাটারি ব্যবহার করতে পারে। তবে গ্রাহকেরা নিজেদের জন্য কিছু বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে রাখতে পারেন, বিশেষ করে বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের সময়। বাড়ির ব্যাটারির পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, বাণিজ্যিক পর্যায়ের বিদ্যুৎ-চাহিদা ব্যবস্থাপনা ও কিছু বড় ব্যাটারিও এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।

বর্তমানে এই ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রায় ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। এটি একটি ছোট থেকে মাঝারি আকারের প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমপরিমাণ ও ভার্মন্টের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ উৎস।

তবে ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্ট নিজে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। যেসব বাড়ির সৌর প্যানেল এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, সেগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। কর্মসূচিতে থাকা প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়িতে ব্যাটারির পাশাপাশি সৌর প্যানেলও রয়েছে।

মূল বিষয় হলো সফটওয়্যার। সফটওয়্যার ব্যবহার করে বিভিন্ন জায়গায় থাকা বিদ্যুৎ সঞ্চয় ও ব্যবহার আরও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। গ্রিডে যখন বিদ্যুতের প্রয়োজন বেশি থাকে, তখন বিদ্যমান সম্পদকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ বিদ্যুৎ গ্রিডই সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ের কথা মাথায় রেখে তৈরি। অথচ বছরের মাত্র কয়েকটি দিনে অনেক এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এই কয়েকটি দিনের চাহিদা পূরণ করতে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো সাধারণত ‘পিকার প্ল্যান্ট’ তৈরি করে।

এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র সাধারণত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর হওয়ায় ব্যয়বহুল ও দূষণকারী। গ্রিন মাউন্টেন পাওয়ারও একসময় তেল, ডিজেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসচালিত পিকার প্ল্যান্টের ওপর নির্ভর করত। এখন তাদের ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্ট কার্যত এসব কেন্দ্রের জায়গা নিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মারি ম্যাকক্লুর।

গ্রিন মাউন্টেন পাওয়ারের হিসাবে, তাদের ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্ট গত বছর গ্রাহকদের ১ কোটি ১০ লাখ ডলার সাশ্রয় করেছে। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্ট ব্যবহারের মাধ্যমে বছরে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সাশ্রয় সম্ভব হতে পারে।

তবে ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্টের সামনে কিছু বাধাও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর প্রচলিত আর্থিক কাঠামো অনেক সময় তাদের এ ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহারে উৎসাহিত করে না। গ্রাহকদের কর্মসূচিতে যুক্ত করার প্রাথমিক খরচ ও বিদ্যুতের পাইকারি বাজারের সঙ্গে ভার্চুয়াল পাওয়ার প্ল্যান্টকে সমন্বয় করার সমস্যাও রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত