
ইসরায়েলের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি গণহত্যা থেকে পালিয়ে ব্রাজিলে চলে যাওয়া ১৫ বছরের ফিলিস্তিনি কিশোরী তালা মোহাম্মদ আওয়াদ গণিত অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক জিতেছেন। ব্রাজিলের সাও পাওলো অঙ্গরাজ্যের সরকারি স্কুলগুলোর জন্য আয়োজিত অলিম্পিয়া দে ম্যাতেমেটিকা দাস এস্কুলাস এস্তাদুয়াইস দে সাও পাওলো বা ওএমএএসপি–২০২৫ এর দ্বিতীয় ধাপে স্বর্ণপদক অর্জন করেছেন।
গাজায় যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি এবং ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা অতিক্রম করে ব্রাজিলে নতুন জীবন শুরু করার পর তালা রাজ্যব্যাপী এই সরকারি স্কুলভিত্তিক গণিত প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করেন। নতুন দেশে তাঁর এই সাফল্যকে অসাধারণ এক একাডেমিক মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পর্তুগিজ ভাষায় প্রকাশিত বিভিন্ন পোস্ট অনুযায়ী, তালা প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় ধাপের স্বর্ণপদক জিতেছেন। এই ধাপটি পৌরসভাভিত্তিক বাছাইপর্বের। এই ফলাফলের মাধ্যমে তিনি এখন প্রতিযোগিতার পরবর্তী রাজ্য-পর্যায়ের ধাপে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। ওএমএএসপি সাও পাওলো অঙ্গরাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক প্রতিযোগিতা। সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের গণিত দক্ষতা বিকাশ এবং সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় একাডেমিক উৎকর্ষ বৃদ্ধি করাই এই আয়োজনের উদ্দেশ্য।
তালার এই অর্জন শুধু গণিতে তাঁর অসাধারণ দক্ষতার কারণেই নয়, বরং তাঁর জীবনের সংগ্রামের কারণেও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত। গাজার যুদ্ধ থেকে বেঁচে যাওয়া, ব্রাজিলে পুনর্বাসিত হওয়া, অল্প সময়ের মধ্যে পর্তুগিজ ভাষা শেখা এবং সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পর তিনি প্রতিযোগিতার অন্যতম সেরা শিক্ষার্থী হিসেবে উঠে এসেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তালা বলেন, এই অর্জন তাঁর দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম এবং পরিবারের সমর্থনের ফল। তিনি বলেন, ‘আমি খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম। প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। মনে হয়েছিল, এতদিনের কঠোর পরিশ্রম ও পড়াশোনা সার্থক হয়েছে। প্রথমেই বাবা-মাকে এই খবর দিতে চেয়েছিলাম। কারণ, তাঁরাই সবসময় আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন এবং বলেছেন, পরিস্থিতি যেমনই হোক, আমি সফল হতে পারব।’
তাঁর কাছে এই স্বর্ণপদক শুধু একটি একাডেমিক অর্জন নয়, বরং একজন ফিলিস্তিনি হিসেবে নিজের পরিচয়, দৃঢ়তা এবং আশার প্রতীক। তালা বলেন, ‘এই অর্জন আমার কাছে অনেক বড়, কারণ আমি গাজার একজন ফিলিস্তিনি এবং যুদ্ধের কারণে অত্যন্ত কঠিন সময় পার করেছি। কখনো কল্পনাও করিনি, একদিন অন্য একটি দেশে দাঁড়িয়ে আমি স্বর্ণপদক জিতব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়েছে, আমি শুধু নিজের নয়, বরং ফিলিস্তিন এবং প্রতিটি ফিলিস্তিনি শিশুর প্রতিনিধিত্ব করছি, যারা সব প্রতিকূলতার মধ্যেও সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখে।’
স্বর্ণপদক পাওয়ার বিষয়ে তালা বলেন, তিনি ভালো ফলের আশা করেছিলেন, তবে স্বর্ণপদক পাওয়া ছিল তাঁর জন্য এক আনন্দঘন বিস্ময়। তিনি বলেন, ‘আমি ভালো ফল আশা করেছিলাম। কিন্তু স্বর্ণপদক পাওয়া আমার জন্য সত্যিই এক অসাধারণ সুন্দর বিস্ময় ছিল।’
ব্রাজিলে এসে নতুন ভাষা ও নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘শুরুর দিকে পর্তুগিজ ভাষা আমার কাছে খুব কঠিন ছিল। অনেক সময় ভয়ও লাগত, কারণ সবকিছু বুঝতে পারতাম না। কিন্তু আমার শিক্ষক ও সহপাঠীরা আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন এবং ধৈর্য ধরে পাশে থেকেছেন।’
তালা বলেন, তাঁর বাবা-মাও প্রতিদিন তাঁকে সাহায্য করেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘বাড়িতে আমার বাবা ও মা প্রতিদিন আমাকে সাহায্য করেছেন এবং শিখতে ও কখনো আশা না হারাতে উৎসাহ দিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমি আরও বেশি বুঝতে শুরু করি এবং সবকিছু সহজ হয়ে যায়।’
গাজার শিশুদের উদ্দেশে তালা বলেন, ‘কখনো আশা হারাবে না। আমি জানি যুদ্ধ কতটা ভয়াবহ, কারণ আমি নিজেই তা পার করে এসেছি। কিন্তু স্বপ্ন দেখা কখনো বন্ধ করো না।’ তিনি আরও বলেন, ‘পড়াশোনায় কঠোর পরিশ্রম করো এবং তোমাদের স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে রাখো। কারণ সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির পরও সফল হওয়া সম্ভব।’
তালার বাবা মোহাম্মদ আওয়াদ বলেন, মেয়ের সাফল্যের খবর পেয়ে পুরো পরিবার আনন্দে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘আমরা আনন্দের কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম, ভাষা খুঁজে পাওয়ার আগেই চোখে জল এসে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, এই গর্ব ধারণ করার মতো যথেষ্ট বড় নয় আমার হৃদয়। তালা শুধু একটি পদক জেতেনি, যুদ্ধ আমাদের কাছ থেকে যে আনন্দ কেড়ে নিয়েছিল, তার একটি অংশ আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছে।’
তিনি স্মরণ করেন গাজার সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা। তালার বাবা বলেন, ‘তালাকে এই সাফল্য অর্জন করতে দেখে আমার মনে পড়ছিল গাজার সেই ভয়, বোমা বিস্ফোরণের শব্দ আর সেইসব রাতের কথা, যখন আমরা জানতাম না সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকব কি না। মনে পড়ছিল, কীভাবে আমার মেয়ে ভয় আর ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে উঠে এসে আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। এটি কোনো সাধারণ বিজয় নয়; এটি যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি শিশুর বিজয়।’
তাঁর মতে, ব্রাজিলে এসে তালা ধীরে ধীরে যুদ্ধের মানসিক ক্ষত কাটিয়ে উঠছে। তিনি বলেন, ‘তালা আবার নিজেকে ফিরে পেতে শুরু করেছে। গাজায় যুদ্ধ শিশুদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছিল। কিন্তু ব্রাজিলে সে এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ পেয়েছে, যেখানে সে শিখতে, স্বপ্ন দেখতে এবং নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারছে। আমি দেখেছি, ধাপে ধাপে সে যেন আবার জীবনে ফিরে এসেছে।’
গাজা ছেড়ে ব্রাজিলে আসার কঠিন যাত্রার কথাও তুলে ধরেন মোহাম্মদ আওয়াদ। তিনি বলেন, ‘সেটি ছিল অত্যন্ত কঠিন এক যাত্রা। আমরা ভয়, বেদনা এবং ভারী স্মৃতির বোঝা নিয়ে গাজা ছেড়েছিলাম। পেছনে রেখে এসেছি আমাদের বাড়ি, আত্মীয়স্বজন এবং পুরো একটি জীবন। আমরা এমন একটি যুদ্ধ থেকে বেঁচে এসেছি, যে যুদ্ধ শিশু, মা কিংবা বাবার প্রতিও কোনো দয়া দেখায় না। ব্রাজিলে পৌঁছানো ছিল শূন্য থেকে নতুন শুরু, কিন্তু একই সঙ্গে এটি ছিল আমাদের সন্তানদের মৃত্যু ও আতঙ্ক থেকে বাঁচিয়ে আনার একটি সুযোগ।’
তিনি বলেন, নতুন দেশে বসবাস করলেও তাঁদের পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু ফিলিস্তিনই। তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিন শুধু একটি ভূখণ্ড নয়; ফিলিস্তিন আমাদের স্মৃতি, আমাদের রক্ত, আমাদের পরিচয়। আমরা তালাকে এভাবেই বড় করছি, যাতে সে বুঝতে পারে ব্রাজিলে তাঁর এই সাফল্য একই সঙ্গে ফিলিস্তিনেরও সাফল্য। আমরা আমাদের ভাষা, আমাদের ইতিহাস এবং আমাদের শিকড়কে ধরে রেখেছি। আমরা সবসময় তাঁকে মনে করিয়ে দিই, তিনি এক ধৈর্যশীল ও অদম্য জাতির কন্যা।’
মোহাম্মদ আওয়াদ বলেন, তাঁরা ব্রাজিলে সন্তানদের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চান, তবে নিজেদের শিকড় কখনো ভুলতে চান না। তিনি বলেন, ‘আমরা ব্রাজিলে আমাদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার চেষ্টা করছি, কিন্তু হৃদয় থেকে ফিলিস্তিনকে মুছে ফেলছি না। আমরা চাই, তাঁরা এখানে সফল হোক, ব্রাজিলীয় সমাজের সম্মানিত সদস্য হয়ে উঠুক, আবার একই সঙ্গে নিজেদের উৎস ও নিজেদের ন্যায্য সংগ্রামের প্রতিও বিশ্বস্ত থাকুক।’
গাজার মানুষের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি জানি—আপনাদের কষ্টের কোনো সীমা নেই। যুদ্ধ আপনাদের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু আপনাদের মর্যাদা কিংবা বেঁচে থাকার শক্তি কেড়ে নিতে পারেনি। আজ তালা দেখিয়ে দিয়েছে, গাজার একটি শিশুও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উঠে এসে ভয়কে সাফল্যে রূপান্তর করতে পারে। আমরা পৃথিবীর যেখানেই থাকি না কেন, গাজাকে হৃদয়ে বহন করব এবং প্রতিটি উপায়ে ফিলিস্তিনের নাম উঁচু করে ধরে রাখব।’

সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত একটি মামলায় ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থার (এনআইএ) হাতে গ্রেপ্তার মার্কিন নাগরিক ম্যাথিউ অ্যারন ভ্যানডাইক তিহার জেলে নিজের খাবার নিজে রান্না করার অনুমতি চেয়ে দিল্লির আদালতে আবেদন করেছেন। মার্সেনারি বা ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ভ্যানডাইক বর্তমানে বিচারাধীন বন্দি হিসেবে তিহার জেলে
১ ঘণ্টা আগে
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির গতকাল বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে পুনরায় সংঘাত শুরু হওয়ায় যে কোনো মুহূর্তে প্রয়োজন হলে ইসরায়
২ ঘণ্টা আগে
চলতি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের মতো তাঁর এই সমর্থনের পেছনে লিওনেল মেসির পায়ের জাদু কাজ করছে না। নেতানিয়াহু নিজেই জানিয়েছেন, আর্জেন্টিনা দলকে তাঁর সমর্থনের মূল কারণ দেশটির কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট
৩ ঘণ্টা আগে
ইসরায়েল সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিছু গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করে। সেখানে বলা হয়, ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনা করছে। আর এই গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করার মাধ্যমেই ইসরায়েল ফের ইরানে হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্ররোচিত করে।
৪ ঘণ্টা আগে