Ajker Patrika

অস্ত্র–প্রতিরক্ষায় বড় তহবিল গঠন করছে আমিরাত–ইসরায়েল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
অস্ত্র–প্রতিরক্ষায় বড় তহবিল গঠন করছে আমিরাত–ইসরায়েল
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল–নাহিয়ান। ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধ সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলকে আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলছে। সেই প্রেক্ষাপটে দুই দেশ যৌথভাবে নতুন অস্ত্রব্যবস্থা কিনতে ও উন্নয়ন করতে একটি তহবিল গঠন করেছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত বর্তমান ও সাবেক দুই মার্কিন কর্মকর্তা লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

বর্তমান ওই মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের আওতায় দুই দেশ ‘যৌথভাবে অস্ত্রব্যবস্থা অধিগ্রহণ’ করবে। তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত উন্নয়নেও অর্থায়ন করতে পারে আমিরাত।

ওই কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আরব আমিরাত সফর করেন। সেই সফরেই চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়। নেতানিয়াহুর দপ্তর সফর নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিলেও আবুধাবি তা অস্বীকার করে। ওয়াশিংটনে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েল দূতাবাস এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত মিডল ইস্ট আইয়ের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

বর্তমান মার্কিন কর্মকর্তাটি আরও বলেন, আমিরাত ও ইসরায়েল যৌথভাবে কাউন্টার-আনম্যানড এয়ারক্রাফট সিস্টেমস (সি-ইউএএস) এবং অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনতে ও উন্নয়ন করতে চায়। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, এই তহবিলে ‘যথেষ্ট অর্থ’ বরাদ্দ করা হয়েছে এবং কেনাকাটা সম্ভবত শুধু আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

তেল আবিবভিত্তিক থিংক ট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং উপসাগরীয় রাজনীতি বিশেষজ্ঞ ইয়েল গুজানস্কি বলেন, ‘আমিরাত-ইসরায়েল সম্পর্ক এখন ইতিহাসের সেরা অবস্থানে। কোনো আরব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের এত ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা আগে কখনো হয়নি।’ ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চজুড়ে হাজারো হামলা চালায়।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটিকে লক্ষ্য করে প্রায় ৩ হাজার ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েল আমিরাতে আয়রন ডোম আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাটারি ও তা পরিচালনার জন্য জনবল মোতায়েন করেছিল। মে মাসে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

গুজানস্কি বলেন, অস্ত্রব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য যৌথ তহবিল গঠন দুই দেশের জন্য যৌক্তিক পরবর্তী পদক্ষেপ। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের আমিরাতের অর্থ প্রয়োজন হবে। আমাদের প্রযুক্তি আছে, কিন্তু সম্পদ কম। আমিরাতের সম্পদ আছে, কিন্তু প্রযুক্তি নেই।’

যুক্তরাষ্ট্রের বদলে কি আমিরাতের দিকে ঝুঁকছে ইসরায়েল?

যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যয় সবসময় সহজ বিষয় নয়। রাশিয়াকে সামনে রেখে ইউরোপীয় দেশগুলোও যৌথ প্রতিরক্ষা ক্রয় তহবিল গঠনের চেষ্টা করছে, তবে নানা বাধার মুখে পড়েছে। তবে আমিরাতের জন্য বিষয়টি সহজতর। কারণ এটি একটি পূর্ণ রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিরক্ষা বাজেট প্রকাশ করে না। তবে কয়েকটি হিসাব অনুসারে, ২০২৬ সালে আমিরাতের প্রতিরক্ষা ব্যয় হতে পারে ২৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির প্রায় পাঁচ শতাংশ।

কূটনীতিক ও প্রতিরক্ষা শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইরানের হামলার পর উপসাগরীয় সব দেশই প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত সাতটি আমিরাত নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও ধনী আবুধাবি ফেডারেল সরকারের কেন্দ্র। আবুধাবির শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান দেশটির প্রেসিডেন্ট। শুধু আবুধাবির সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলোতেই প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ রয়েছে। পাশাপাশি দেশটির অধিকাংশ তেল মজুতও তাদের নিয়ন্ত্রণে।

চলতি মাসে ব্লুমবার্গ জানায়, আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স খালেদ বিন মোহাম্মদ আল নাহিয়ান প্রতিরক্ষাভিত্তিক একটি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের বিষয়ে মুবাদালা ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির প্রধান নির্বাহী খালদুন আল মুবারক এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

এর আগে, ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস চুক্তির সমর্থকেরা শুরু থেকেই বলছিলেন—এই সমঝোতার বড় সুফল হবে আমিরাত ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীর হওয়া। ওই চুক্তির মাধ্যমেই উপসাগরীয় দেশটি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। ২০২৫ সালের জুনে আমিরাতের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এজ গ্রুপ ইসরায়েলের থার্ডআই সিস্টেমসের ৩০ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়। প্রতিষ্ঠানটি ড্রোনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির নিকটপ্রাচ্য অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক বার্নার্ড হাইকল বলেন, ‘এই চুক্তি এর আগের প্রতিরক্ষা সমঝোতাগুলোরই ধারাবাহিকতা। দুই পক্ষের জন্যই এটি যৌক্তিক।’

প্রতিরক্ষা খাতে দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন করদাতাদের সহায়তার বড় সুবিধাভোগী ইসরায়েল। প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দেয়। পাশাপাশি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটির প্রতিরক্ষায় অতিরিক্ত ২১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কস্টস অব ওয়ার প্রজেক্ট এ তথ্য জানিয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নিজেও বলেছেন, ভবিষ্যতে ইসরায়েলকে হয়তো মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে তরুণ ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন ছাড়িয়ে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমছে। হাইকল বলেন, ‘আমিরাতের কাছে অর্থ আছে। এমন সময়ে, যখন মার্কিন অর্থ সহায়তা অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, তখন আমিরাতের দিকে ঝুঁকবে না কেন? ইসরায়েলের অর্থের উৎস বৈচিত্র্যময় করা প্রয়োজন।’

ইরানের বিরুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রভাবের হাতিয়ার ইসরায়েল

সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতার ৩ দেশই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। তবে সংঘাত শুরু হওয়ার পর তাদের অবস্থান ভিন্ন হয়ে যায়। সৌদি আরব ও আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার ও আকাশসীমা ব্যবহারের সুযোগ দেয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, আমিরাত ও সৌদি আরব ইরানের ওপর হামলাও চালায়।

তবে একই সময়ে সৌদি আরব যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে সমর্থন দেয়। বিপরীতে, আমিরাত নাকি ওই আলোচনা ঠেকানোর চেষ্টা করে এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে যেতে চাপ দেয়। বিশেষ করে আবুধাবি আশঙ্কা করছে, যুদ্ধের পর তেহরান হরমুজ প্রণালিতে আরও শক্তিশালী অবস্থানে যেতে পারে।

থিংক ট্যাংক মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরাস মাকসাদ বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো মনে করছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে যে কোনো চুক্তি করলে তার বোঝা শেষ পর্যন্ত তাদেরই বইতে হবে। কারণ ওয়াশিংটনের মনোযোগ মূলত পারমাণবিক ইস্যু ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। অথচ উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠী, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বড় উদ্বেগের বিষয়।’

ইসরায়েলের আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার ক্ষেত্রে আমিরাত প্রতিবেশীদের থেকে আলাদা পথ নিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, সৌদি আরব ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা ছাতার স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগের পর পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করছে। গত সোমবার রয়টার্স জানায়, পাকিস্তান সৌদি আরবে আট হাজার সেনা এক স্কোয়াড্রন যুদ্ধবিমান এবং চীনা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।

ফিরাস মাকসাদ বলেন, ‘আমিরাত এই কাঠামোর অংশ হবে না। ইরানিদের ওপর প্রভাব খাটানোর তাদের প্রধান উপায় হচ্ছে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক যত বৈরী হবে, আমিরাত তত বেশি ইসরায়েলের দিকে ঝুঁকবে এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও গভীর করবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

চিকিৎসক দম্পতির সন্তানের মৃত্যু: ‘কল দিয়ে ডাক্তার আশীষ স্যারের পা ধরেছি, তাও তিনি আসবেন না’

কারিনা কায়সারের কবরে সাপ? ভাইরাল ভিডিওটি পুরোনো

মাহমুদ আহমেদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছিল ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত, কর্মকর্তাদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত

কর্ণফুলীতে পশুর হাটের ৫ দিনের অনুমতি ঘিরে বিতর্ক

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত