Ajker Patrika

চীনে বিদেশিদের চাকরি করা কেন এখনো সহজ নয়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
চীনে বিদেশিদের চাকরি করা কেন এখনো সহজ নয়
ছবি: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

চীনের দ্রুত সম্প্রসারিত অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় দেশটির ক্রমবর্ধমান ভূমিকা বিদেশি তরুণ পেশাজীবীদের আকৃষ্ট করছে। তবে চীনে চাকরি পাওয়া গেলেও সেটিকে বৈধভাবে করার অনুমতি বা ওয়ার্ক ভিসা পাওয়া অনেকের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জটিল পয়েন্টভিত্তিক ব্যবস্থা, নিয়োগদাতার স্পনসরশিপ এবং বিপুলসংখ্যক কাগজপত্রের কারণে বিদেশি কর্মীদের দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

স্পেনের বার্সেলোনার তরুণ অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আইতর। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তিনি চীনে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে সাংহাইয়ে মাস্টার্স করতে এসে তিনি একটি সাপ্লাই-চেইন প্রতিষ্ঠানে চাকরিও পান। কিন্তু চাকরি পাওয়ার পরই শুরু হয় তার আসল সমস্যা—ওয়ার্ক ভিসা।

চীনে বিদেশি গ্র্যাজুয়েটদের চাকরি পাওয়া এমনিতেই কঠিন। স্থানীয় বিপুলসংখ্যক যোগ্য প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশিদের আবেদনও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে না। আইতরের চীনা ভাষাজ্ঞান অবশ্য তাঁকে কিছুটা সুবিধা দিয়েছে। তিনি স্থানীয় জনপ্রিয় নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম ‘বস ঝিপিন’-এ চাকরি খুঁজতে পেরেছেন। তবে তাঁর কথা হলো—প্ল্যাটফর্মটি বিদেশিদের জন্য খুব একটা বন্ধুবান্ধবসুলভ নয়।

এরপর শুরু হয় ভিসার লড়াই। পয়েন্টভিত্তিক যোগ্যতা নির্ধারণ, বিভিন্ন শ্রেণির জটিলতা এবং বিপুল নথিপত্রের কারণে তাঁর ওয়ার্ক পারমিটের আবেদন ছয় মাস পরও প্রক্রিয়াধীন ছিল।

আইতর বলেন, চীনে চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকায় তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন। কারণ অনেক শিক্ষিত ও দক্ষ বিদেশি চীনে বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ পেতে সমস্যায় পড়ছেন। পরিবারভিত্তিক ভিসা খুব বেশি নমনীয় নয়, আর স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের স্পনসরশিপ ছাড়া ওয়ার্ক ভিসা পাওয়া কঠিন।

রোববার (৯ আগস্ট) এক প্রতিবেদনে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো ঐতিহ্যগত অভিবাসন-গন্তব্যের তুলনায় চীন দীর্ঘদিন বিদেশি শ্রমশক্তির ওপর কম নির্ভর করেছে। ফলে বিদেশি কর্মীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গড়ে উঠতেও সময় লেগেছে। চীনে থাকা অনেক বিদেশি কর্মী আবার বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেখানে যান। এসব প্রতিষ্ঠানে সাধারণত ভিসা, বাসস্থান ও স্থানান্তরের খরচ নিয়োগদাতাই বহন করে। কিন্তু যারা স্বাধীনভাবে চীনের চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে চান, তাদের অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন।

চীনের তরুণদের মধ্যেও কর্মসংস্থানের চাপ বাড়ছে। ফলে বিদেশি কর্মী আকর্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থান রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালের জুনে দেশটির যুব বেকারত্বের হার ছিল ২১ দশমিক ৩ শতাংশ। পরে পরিসংখ্যান পদ্ধতি পরিবর্তনের পর চলতি হিসাবে হারটি ১৪ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়ায়।

গত বছর তরুণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পেশাজীবীদের আকৃষ্ট করতে চীন চালু করে ‘কে ভিসা’। তবে ভিসা পরামর্শক আনা চেনের মতে, এর আওতা অত্যন্ত সীমিত। বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন প্রযুক্তি পেশাজীবীরাই মূলত এর লক্ষ্য। এখন পর্যন্ত তিনি কোনো কে ভিসা আবেদন সফল হতে দেখেননি।

অন্যদিকে অধিকাংশ বিদেশি কর্মীর প্রধান পথ এখনো ‘জেড ভিসা’। এতে নিয়োগদাতার স্পনসরশিপ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, কাজের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক নথি প্রয়োজন। জেড ভিসার ‘এ’ শ্রেণি উচ্চপর্যায়ের প্রতিভাবানদের জন্য, ‘বি’ শ্রেণি অধিকাংশ দক্ষ পেশাজীবীর জন্য এবং ‘সি’ শ্রেণি অপেক্ষাকৃত অস্থায়ী বা মৌসুমি কর্মীদের জন্য।

চীনে বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর অনীহারও কিছু কারণ রয়েছে। সাংহাইয়ের সাবেক নিয়োগকর্তা মার্শাল মা বলেন, মহামারির পর শহরটির চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। অনেক পদেই কম খরচে তরুণ চীনা কর্মী পাওয়া যায়, যারা স্থানীয় ভাষায় দক্ষ। বিদেশিদের ক্ষেত্রে বেতন ও ছুটির মতো সুবিধার প্রত্যাশাও তুলনামূলক বেশি বলে মনে করেন তিনি।

২০২৩ সালের পর অনেক এশিয়া-প্যাসিফিক আঞ্চলিক সদর দপ্তর চীনে তাদের কার্যক্রম সংকুচিত করায় বিদেশি কর্মীর চাহিদাও কমেছে। একই সঙ্গে ভিসা, সামাজিক বিমা ও অন্যান্য প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়োগদাতাদের বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

তবে বিদেশিদের জন্য চীনের দৈনন্দিন জীবন কিছুটা সহজ করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে আলিপে ও উইচ্যাট পের মতো প্ল্যাটফর্মে আন্তর্জাতিক ব্যাংক কার্ড ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে এবং নিবন্ধন ও পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। তারপরও পাসপোর্টভিত্তিক পরিচয় যাচাইয়ের কারণে বিভিন্ন ডিজিটাল সেবায় বিদেশিরা ছোটখাটো সমস্যায় পড়েন।

সব বিদেশির অভিজ্ঞতা অবশ্য এক নয়। ব্রিটিশ-স্প্যানিশ নাগরিক মার্কোস সাবিও লিংকডইনের মাধ্যমে বেইজিংয়ে সফটওয়্যার খাতে চাকরি পান এবং তাঁর প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগ পুরো ভিসা প্রক্রিয়া সামলায়। চীনা, ইংরেজি, স্প্যানিশ ও কিছু রুশ ভাষা জানায় নিজের দক্ষতাকে তিনি চীনে বিশেষভাবে মূল্যবান মনে করেন।

বিদেশিদের জন্য চীনের আকর্ষণও পুরোপুরি কমে যায়নি। ২০২৫ সালের ইন্টারন্যাশনস জরিপে ৪৬টি গন্তব্যের মধ্যে চীন ষষ্ঠ অবস্থানে ছিল। ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত অর্থনীতি ও দৈনন্দিন সুবিধার ক্ষেত্রে বিদেশিরা তুলনামূলক সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তবে ভাষাগত বাধা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থায় মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।

মালয়েশিয়ার নাগরিক জেনস লির অভিজ্ঞতাও দেখা যায়, চীনের বিশাল বাজার ও দ্রুতগতির অর্থনীতি বিদেশিদের কাছে এখনো আকর্ষণীয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সত্ত্বেও তাঁর মতে, চীনের অর্থনৈতিক গতিশীলতা ও দ্রুতগতির কর্মপরিবেশ পেশাগত শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত