Ajker Patrika

যুক্তরাষ্ট্রের এফ–৩৫ পেতে রাশিয়ার এস–৪০০ বেচে দিচ্ছে তুরস্ক, সম্ভাব্য ক্রেতা কারা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
যুক্তরাষ্ট্রের এফ–৩৫ পেতে রাশিয়ার এস–৪০০ বেচে দিচ্ছে তুরস্ক, সম্ভাব্য ক্রেতা কারা
যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার বিনিময়ে রাশিয়ার তৈরি এস–৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেচে দিচ্ছে তুরস্ক। ছবি: সংগৃহীত

রাতারাতি বদলে যেতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। দীর্ঘ সাত বছর ধরে চলা তুরস্কের এস-৪০০ নাটকের সবশেষ অধ্যায়ে জানা যাচ্ছে, আঙ্কারা নাকি তাদের অব্যবহৃত দূরপাল্লার এই কৌশলগত এয়ার ডিফেন্স মিসাইল সিস্টেম পারস্য উপসাগরের একটি দেশের কাছে বিক্রি করার জন্য আলোচনা চালাচ্ছে।

আলোচনার এই খবর এমন এক সময়ে এল, যার কিছুদিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিতর্কিত এই রুশ অস্ত্র কেনার দায়ে তুরস্কের ওপর যেসব নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল, তা তিনি তুলে নিতে রাজি আছেন এবং তুরস্ককে আবারও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে ফিরিয়ে নেওয়া হতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো—উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) অন্তর্ভুক্ত ছয়টি আরব দেশের মধ্যে ঠিক কোন দেশ এই রুশ ব্যবস্থাটি কিনতে আসলেই আগ্রহী বা রাজি হবে?

গত শুক্রবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ নিশ্চিত করেছেন, তুরস্কের হাতে থাকা এস-৪০০ ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে আঙ্কারার আলাপ-আলোচনা চলছে। তুরস্কের হুররিয়াত পত্রিকার এক প্রতিবেদনের পর পেসকভ এই নিশ্চয়তা দেন। বিষয়টিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে উল্লেখ করে হুররিয়াত জানিয়েছিল—২০১৯ সালে কেনার পর থেকে আজ পর্যন্ত কখনো সার্ভিসে না আনা এই এস-৪০০ ব্যবস্থাটি উপসাগরীয় কোনো দেশের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার ব্যাপারে আঙ্কারা হয়তো খুব দ্রুত, এমনকি শুক্রবারের মধ্যেই একটি প্রকাশ্য ঘোষণা দিতে পারে। এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে ‘অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়’ আখ্যা দিয়ে পেসকভ আরও বলেন, ‘আমরা এই বিষয়ে তুর্কি পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি এবং আমাদের এই যোগাযোগ বজায় থাকবে।’

অবশ্য তুরস্কের এই এস-৪০০ অন্য কোনো দেশের কাছে হস্তান্তর করতে গেলে রাশিয়ার স্পষ্ট অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। ওয়াশিংটন শুরু থেকেই অনড় অবস্থানে রয়েছে যে—২০২০ সালের শেষের দিকে ‘কাউন্টারিং আমেরিকাস অ্যাডভারসারিজ থ্রু স্যাঙ্কশনস অ্যাক্টের’ (সিএএটিএসএ) আওতায় আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা বা তুরস্ককে এফ-৩৫ কর্মসূচিতে ফিরিয়ে নিয়ে সেই স্টিলথ ফাইটার কেনার অনুমতি দেওয়ার আগে, আঙ্কারাকে অবশ্যই তাদের মাটি থেকে এই রুশ মিসাইল সিস্টেম এবং এর সব ধরনের যন্ত্রপাতি পুরোপুরি সরিয়ে ফেলতে হবে।

নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার আগে তৈরি হওয়া ছয়টি এফ-৩৫এ বিমানের জন্য তুরস্ক আগেই অর্থ পরিশোধ করে রেখেছিল। এস-৪০০ সংকটের সন্তোষজনক সমাধানের পর, প্রায় এক দশক বাদে, তারা অবশেষে সেই বিমানগুলো হাতে পাওয়ার আশা করছে। ২০১৯ সালের আগে তারা ১০০টি এফ-৩৫এ বিমান চেয়েছিল। তবে এখন তারা আরও কম, মাত্র ৪০টি বিমান চাইছে। কারণ, তুরস্ক এখন নিজস্ব প্রযুক্তির ‘টিএফ কান’ ফাইটার জেট তৈরি করছে এবং যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে ৪.৫ প্রজন্মের ‘ইউরোফাইটার টাইফুন’ কেনার জন্য বড়সড় অর্ডার দিয়ে রেখেছে।

হুররিয়াত সুনির্দিষ্টভাবে কোনো জিসিসি দেশের নাম উল্লেখ না করলেও, গত বুধবার তুরস্কের অক্সিজেন (Oksijen) পত্রিকার এক প্রতিবেদনে দেশটির প্রেসিডেন্সির ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে—সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে এই সিস্টেমটি হস্তান্তরের বিষয়টি এখন এজেন্ডায় রয়েছে। বিশেষ করে, সাবেক তুর্কি এস-৪০০ ব্যবস্থাটি দুবাইতে মোতায়েন করে আমিরাত তাদের বিশ্বমানের, বহুস্তর বিশিষ্ট এবং বৈচিত্র্যময় আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

মনে রাখা দরকার, চলতি বছরের শুরুর দিকে আঞ্চলিক যুদ্ধ চলাকালীন সংযুক্ত আরব আমিরাত সবচেয়ে ভয়াবহ ইরানি বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছিল এবং গত ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পরও তারা একের পর এক হামলার মুখোমুখি হয়েছে। অক্সিজেনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনও এস-৪০০-এর শূন্যস্থান পূরণ করতে তুরস্কের কাছে এমআইএম-১০৪ প্যাট্রিয়ট বিক্রির পক্ষপাতী। তুরস্কও সম্প্রতি প্যাট্রিয়ট বা ফ্রাঙ্কো-ইতালীয় স্যাম্প/টি সিস্টেম কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। উল্লেখ্য, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে প্যাট্রিয়ট দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল যদি তারা রুশ এস-৪০০-এর ডেলিভারি বাতিল করে, কিন্তু আঙ্কারা তখন তা প্রত্যাখ্যান করেছিল।

সংযুক্ত আরব আমিরাত এর আগে ২০০০-এর দশকে রাশিয়ার কাছ থেকে প্যান্টসির-এস ১ সিস্টেম অর্ডার করেছিল, তবে সেগুলো মূলত নির্দিষ্ট কোনো পয়েন্ট বা লক্ষ্যবস্তু রক্ষার জন্য উপযুক্ত; কৌশলগত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে তৈরি এস-৪০০-এর মতো দূরপাল্লার নয়। অন্যদিকে, সৌদি আরবও খুব সম্প্রতি ২০২১ সাল থেকে বেশ গোপনে প্যান্টসির-এস ১ সংগ্রহ শুরু করেছে বলে জানা গেছে, যা সম্ভবত সেই সময়ে ইয়েমেনের হুতিদের ড্রোন হামলা মোকাবিলায় একটি সাশ্রয়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে নেওয়া হয়েছিল।

মজার ব্যাপার হলো, সৌদি আরব ও কাতার—উভয় দেশই ২০১০-এর দশকের শেষের দিকে এস-৪০০ কেনার কথা বিবেচনা করলেও শেষ পর্যন্ত তা আর কেনেনি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো রিয়াদও শেষ পর্যন্ত আমেরিকার কৌশলগত টার্মিনাল হাই অল্টিট্যুড এরিয়া ডিফেন্স বা থাড সিস্টেমকেই বেছে নেয়। কাতারের কাছে প্যাট্রিয়ট সিস্টেম থাকলেও কোনো থাড ব্যবস্থা নেই এবং ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলার সামনে তারা বেশ অরক্ষিত প্রমাণিত হয়েছে। তা ছাড়া, গত ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল এয়ার-লঞ্চড ব্যালিস্টিক মিসাইল দিয়ে দোহার মাটিতে হামাসের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিশানা করেছিল। কাতারের সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক রয়েছে এবং কাতারের মাটিতে তুরস্কের একটি সামরিক ঘাঁটিও আছে, তবে দোহা এই এস-৪০০ কিনতে আদৌ আগ্রহী কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সৌদি আরবের এই সিস্টেম কেনার ব্যাপারে সরাসরি কোনো আলোচনা না থাকলেও, চলতি দশকের শুরু থেকে রিয়াদ ও আঙ্কারার মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে—যার মধ্যে সৌদি আরব কর্তৃক তুরস্কের তৈরি নিজস্ব ড্রোনে বড় বিনিয়োগ অন্যতম। সংযুক্ত আরব আমিরাত যেখানে ২০২০ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অর্ডার করা ৫০টি এফ-৩৫-এর আলোচনা স্থগিত করে দিয়েছিল, সেখানে সৌদি আরব বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৪৮টি পর্যন্ত এফ-৩৫ পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে এস-৪০০ কেনা এবং তা সার্ভিসে যুক্ত করা রিয়াদের সামরিক সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে তুরস্কের মতোই জটিলতায় ফেলে দিতে পারে, তাও আবার ঠিক একই অস্ত্রের কারণে। তা সত্ত্বেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে রিয়াদ হয়তো দ্রুত এই এস-৪০০ ডেলিভারি এবং সেই সঙ্গে আঙ্কারার কেনা ১২০টি মিসাইলকে স্বাগত জানাতেই পারে, যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ইরানি হামলা মোকাবিলায় একটি সাময়িক অন্তর্বর্তীকালীন সমাধান হিসেবে কাজ করবে।

কারণ, ইরানের পক্ষ থেকে আবারও হামলার আশঙ্কা কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রিয়াদ বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ‘চেওনগুন-২’ বা ‘কেএম-স্যাম’ নামের মাঝারি পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ডেলিভারির অপেক্ষায় রয়েছে এবং সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের পর তাদের হাতে থাকা উচ্চ প্রযুক্তির মার্কিন ইন্টারসেপ্টরগুলোর মজুদ নতুন করে পূরণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ফলে, সাবেক তুর্কি এস-৪০০ মোতায়েন করলে তা নতুন সিস্টেম আসা এবং ফুরিয়ে যাওয়া ইন্টারসেপ্টর রিফিল হওয়া পর্যন্ত একটি কৌশলগত সাময়িক প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে। এরপর রিয়াদ চাইলে এফ-৩৫ প্রাপ্তি যাতে কোনো জটিলতায় না পড়ে, সেজন্য এই রুশ সিস্টেমটিকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় বা স্ক্র্যাপ করে দিতে পারে।

জিসিসির বাকি দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্বীপ রাষ্ট্র বাহরাইন, কুয়েত ও ওমান। প্রথম দুটি দেশও গত ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর থেকে বারবার ইরানি হামলার শিকার হয়েছে এবং শীর্ষ তিন জিসিসি দেশের তুলনায় তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেকটাই সীমিত। তবে ওমানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিতভাবেই পুরো জিসিসি অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল, যার সবচেয়ে আধুনিক ব্যবস্থাটি হলো মাঝারি পাল্লার ‘নাসামস-২।’ মাস্কাটের তুলনামূলক নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি এবং ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, যুদ্ধের সময় তেহরানের হামলা থেকে তারাও রেহাই পায়নি।

তা ছাড়া, যুদ্ধের আগে ওমান তাদের কিছুটা ব্যবহৃত ইউরোফাইটার টাইফুন বিমানগুলো তুরস্কের কাছে বিক্রি করার বিষয়ে আলোচনা করছিল, যাতে আঙ্কারা দ্রুত এই জেটগুলো সংগ্রহ করতে পারে। তাই তুরস্কের এস-৪০০ কেনা ওমানের ভূমিভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নাটকীয়ভাবে উন্নত করতে পারে। যদিও আবারও বলা দরকার, ওমান যে এতে আগ্রহী বা এই নিয়ে কোনো সক্রিয় আলোচনা চলছে, এমন কোনো ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত নেই।

তুর্কি সংবাদমাধ্যমের এই প্রতিবেদনগুলো যদি শেষ পর্যন্ত সত্যি প্রমাণিত হয়, তবে এই অঞ্চলের সামগ্রিক আকাশ প্রতিরক্ষার চিত্রটাই বদলে যাবে। একদিকে এস-৪০০ দুবাইকে ইরানি মিসাইল ও ড্রোন থেকে সুরক্ষা দেবে, অন্যদিকে তুরস্কও পেয়ে যাবে তাদের বহুল প্রতীক্ষিত পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ ফাইটার এবং সম্ভবত ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিরক্ষার দীর্ঘদিনের ঘাটতি মেটাতে মার্কিন প্যাট্রিয়ট সিস্টেম।

তথ্যসূত্র: ফোর্বস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত