Ajker Patrika

গাজায় সরকার ভেঙে দিল হামাস, অস্ত্র ছাড়বে না

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৯: ২২
গাজায় সরকার ভেঙে দিল হামাস, অস্ত্র ছাড়বে না
ছবি: এএফপি

গাজায় নিজেদের কার্যত (ডি-ফ্যাক্টো) সরকার ভেঙে দিয়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব একদল ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তুতির ঘোষণা দিয়েছে হামাস। গতকাল সোমবার সংগঠনটি জানায়, এটি যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা শাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে ইসরায়েল হামাসের এই ঘোষণাকে ‘স্টান্ট’ বা নাটক বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম আওসাত আল আশরাকের খবরে বলা হয়েছে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গাজার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় তদারকি করা হামাসের প্রশাসনিক কাঠামো বিলুপ্ত করার এই সিদ্ধান্তটি যুদ্ধ-পরবর্তী বেসামরিক শাসিত গাজা গঠনের পরিকল্পনার অংশ। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের সঙ্গে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।

হামাস জানিয়েছে, তদারকি সংস্থাটি বিলুপ্ত হলেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং সেখানে তাদের নিয়োগ দেওয়া কর্মকর্তারা বহাল থাকবেন। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পর গাজার যেসব এলাকা এখনো হামাসের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেখানে নিরাপত্তা ও পুলিশি কার্যক্রমও তাদের তত্ত্বাবধানেই চলবে।

এদিকে ট্রাম্পের নিয়োগপ্রাপ্ত বোর্ড অব পিস এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য গঠিত হয়েছে। তারা জানিয়েছে—হামাসের ঘোষণাকে নোট করেছে। তবে বোর্ডের বক্তব্য, ‘চূড়ান্ত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমরা প্রতিশ্রুতির চেয়ে কর্মকাণ্ডকেই গুরুত্ব দেব, যাতে গাজার জনগণের জরুরি চাহিদাগুলো পূরণ করা যায়।’

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেন, টেকনোক্র্যাট সরকারকে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার হামাসের ‘আপাত আগ্রহ’ আসলে তাদের নিজস্ব নিরস্ত্রীকরণ এড়ানোর কৌশল। তাঁর ভাষ্য, ‘যতক্ষণ হামাস তাদের অস্ত্র ধরে রাখবে, ততক্ষণ যেকোনো বেসামরিক সরকারই কার্যত হামাসের নির্দেশনায় পরিচালিত হবে।’ তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়নের ব্যাপারে ইসরায়েল অনড় রয়েছে এবং এর অন্যতম শর্ত হলো হামাসের অস্ত্র সমর্পণ।

অন্যদিকে হামাস অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে এবং পরিকল্পনার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাস্তবায়ন করেনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর গাজা থেকে প্রত্যাহার করার কথা ছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া সর্বশেষ গাজা যুদ্ধের আড়াই বছরেরও বেশি সময় পরও ছোট এই উপকূলীয় ভূখণ্ড ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে আছে।

হামাস স্পষ্ট জানিয়েছে, গাজায় ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা অস্ত্র সমর্পণ করবে না। গাজার চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ইসরায়েলের সর্বশেষ হামলায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েল বলেছে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে গাজায় তাদের সামরিক অভিযান কেবল জঙ্গি হুমকি প্রতিরোধের লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়েছে।

গতকাল সোমবার গাজা সিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে হামাস সরকারের মিডিয়া অফিসের পরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতা জানান, ‘গভর্নমেন্ট ইমার্জেন্সি কমিটি’ নামে পরিচিত তদারকি সংস্থার প্রধান পদত্যাগ করেছেন এবং সংস্থাটিও আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটি সম্মত ব্যবস্থাগুলো বাস্তবায়নে আমাদের আন্তরিকতার প্রমাণ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে সহজ করার লক্ষ্যে নেওয়া একটি পদক্ষেপ।’

ট্রাম্প-সমর্থিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, হামাসকে গাজার প্রশাসনিক তদারকির দায়িত্ব গাজার প্রশাসনের জন্য জাতীয় কমিটির কাছে হস্তান্তর করতে হবে। এই কমিটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত। কমিটির প্রধান আলি শাআথ বলেছেন, প্রয়োজনীয় সম্পদ এবং কার্যক্রম পরিচালনার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হলেই তাঁর ১৫ সদস্যের কমিটি গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণে প্রস্তুত। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘কমিশনের সফলতার মৌলিক শর্ত হলো একটি কর্তৃপক্ষ, একটি আইন, একটি সুস্পষ্ট রেফারেন্স কাঠামো এবং সেই কর্তৃপক্ষের অধীন একটি মাত্র অস্ত্র থাকা।’

এদিকে, বর্তমানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজার ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। নেতানিয়াহুর ভাষায়, এসব এলাকা একটি ‘বাফার জোন’, যার উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে হামাসের হামলা প্রতিরোধ করা। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ইসরায়েল গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না। ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান ও স্থল হামলায় গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষের প্রায় সবাই বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশই বর্তমানে হামাস-শাসিত সরু উপকূলীয় ভূখণ্ডে তাঁবু কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বসবাস করছেন।

গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার গাজা সিটির তেল আল-হাওয়া এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্টে ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক দম্পতি নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ওই হামলায় হামাসের সশস্ত্র কমান্ডার ফাদি আশুর দাঘমাশকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল এবং তিনি নিহত হয়েছেন।

এ ছাড়া, আরও দুটি পৃথক হামলায়, যার একটি ছিল বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয় হিসেবে ব্যবহৃত একটি তাঁবুতে এবং অন্যটি দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনিসে একটি গাড়িতে, তিনজন নিহত এবং অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। তবে ওই দুটি হামলার বিষয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত