Ajker Patrika

ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা

ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন যে কারণে সতর্ক

  • নমনীয় ভাষায় সংঘাত বন্ধের আহ্বান বেইজিংয়ের।
  • চীন-ইরান মৈত্রী পশ্চিমা জোটের মতো নয়।
  • ট্রাম্পের আসন্ন সফরের কারণেও হিসাবি পদক্ষেপ।
আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন যে কারণে সতর্ক

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্ব এড়িয়ে কার্যত ‘ধীরে চলো’ নীতিতে হাঁটছে ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত চীন। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় তেমন কোনো শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখায়নি দেশটি। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে নমনীয় ভাষায় সংঘাত বন্ধ করে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানিয়েছে চীন, যা অনেককেই অবাক করেছে।

প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, চীনের পরিকল্পনাটা আসলে কী? তারা কি তবে ইরানের পাশে থাকছে না? বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীন আসলে বেশ কয়েকটি বিষয়কে সামনে রেখে আপাতত নমনীয় অবস্থানে রয়েছে। বিবিসি অনলাইনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এর পেছনে রয়েছে নিজের স্বার্থরক্ষাসহ নানা কারণ।

প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ধাক্কাটা এখনো জোরেশোরে লাগেনি চীনের গায়ে। দেশটিতে আপাতত বেশ কয়েক মাসের তেলের মজুত রয়েছে। তারপর লাগলে চীন হয়তো রাশিয়ার কাছে সাহায্য চাইবে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি ইতিমধ্যেই ভোক্তাদের ব্যয় কমানো ও অভ্যন্তরীণ ঋণের মতো সমস্যায় চাপে আছে। চীনের এবারের যে বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা ১৯৯১ সালের পর সর্বনিম্ন। যদিও উন্নত প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য শিল্পে এর উন্নতি অব্যাহত আছে। রপ্তানি বাড়িয়ে অর্থনৈতিক সংকট কাটানোর একটা সুযোগ তাদের আছে বটে, কিন্তু এক বছর ধরে মার্কিন সরকারের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে সেদিকে পরিস্থিতি কিছুটা নাজুক। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জ্বালানি তেল প্রাপ্তি ও রপ্তানি পণ্য পরিবহনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ল। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, সংকট ততই বাড়বে, বিশেষত হরমুজ প্রণালি যদি বন্ধ থাকে।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ফিলিপ শেটলার জোন্স বিবিসিকে বলেন, দীর্ঘ সময়ের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও নিরাপত্তাহীনতা চীনের জন্য অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উদাহরণস্বরূপ, আফ্রিকার দেশগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উপকারভোগী। সেখানে যদি বিনিয়োগে ভাটা পড়ে এবং অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে তা চীনের অর্থনীতির জন্যও ক্ষতি বয়ে আনবে। তাই বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মতো চীনও এ যুদ্ধের কারণে শঙ্কায় ভুগছে।

‘আমি মনে করি, অন্য দেশগুলোর মতো চীনও যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা বোঝার চেষ্টা করছে। তারা হয়তো ভাবছে, যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চয়ই কোনো রকম পরিকল্পনা ছাড়াই এমনি এমনি যুদ্ধের ময়দানে নামেনি!’—বললেন কিংস কলেজ লন্ডনের চায়না লাও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক কেরি ব্রাউন।

চীনের ‘ধীরে চলো’ নীতির পেছনে অন্য নিয়ামকগুলো হলো ইরানের সঙ্গে তার যে সম্পর্ক, তা আসলে মূলত স্বার্থের বা কাজের। এরপর সামনেই আছে ট্রাম্পের চীন সফর, যেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় বিষয়ের ফয়সালা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বুঝেশুনে কথা বলছে।

চীন-তেহরান বন্ধুত্বের কী হলো

চীন ও ইরান ঐতিহ্যগতভাবে বেশ ভালো বন্ধু। বিশেষ করে পশ্চিমাদের চোখে। ইরানের সদ্য প্রয়াত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ সফরটা ছিল চীনেই, ১৯৮৯ সালে। ২০১৬ সালে সি চিন পিংয়ের ইরান সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি হয়। এর মধ্য দিয়ে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়ে। ইরানের তেলের বিনিময়ে চীন ২৫ বছরে ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধাস্ত্র বেচাকেনার কথাও শোনা যায়। যদিও চীন বরাবর তা অস্বীকার করে আসছে।

‘এত কিছুর পরও আমি মনে করি, দেশ দুটির সম্পর্ক আসলে কেবল স্বার্থ ও রাজনৈতিক সম্পর্ক। এই সম্পর্ক একটা নির্দিষ্ট অবস্থা পর্যন্ত কাজ করেছে। তা কোনো গভীর সম্পর্ক না। সত্যি বলতে, ইরানের সঙ্গে চীনের মাখামাখি থাকার বিশেষ কোনো আদর্শগত বা সাংস্কৃতিক কারণ নেই’—বলেন অধ্যাপক কেরি ব্রাউন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সার্বক্ষণিক তিক্ততাটা চীনের পক্ষে যায়, এটাও চীন-ইরান ভালো সম্পর্কের একটা কারণ। ব্রাউনের মতে, এটা প্রমাণ করে ইরানের সঙ্গে চীনের হৃদ্যতা বজায় রাখতে চাওয়ার পেছনে নেতিবাচক কারণই বেশি।

নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার পক্ষপাতী?

মিত্র ইরান ও ভেনেজুয়েলার ইস্যুতে চীন নমনীয় বিবৃতি দিয়েই দায় সেরেছে। পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, এটি প্রমাণ করে, নৈতিকভাবে পাশে থাকলেও চীন আসলে তার ক্ষমতার বাইরে গিয়ে সহায়তা করতে আগ্রহী নয়।

চীন আসলে নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে ‘একটি দায়িত্বশীল ভারসাম্য’ হিসেবে দাঁড় করাতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন ফিলিপ শেটলার। তিনি বলেন, চীন আসলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রকৃত পরাশক্তি নয়, যে কিনা বিশ্বজুড়ে মিত্রদের যেকোনো ধরনের সহায়তা করার ক্ষমতা রাখে।

ট্রাম্পের আসন্ন চীন সফর

এ মাসেই আরও পরে বহুল প্রতীক্ষিত চীন সফরে যাওয়ার কথা ট্রাম্পের। স্পষ্টতই চীন তাঁকে চটাতে চাইছে না। ইরান যুদ্ধ নিয়ে বক্তৃতা-বিবৃতিতে বেইজিং এ পর্যন্ত তাই সরাসরি ট্রাম্পের নিন্দা করেনি। তা ছাড়া এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি অজনপ্রিয় হবে। তেমন পরিস্থিতিতে চীনের সামনে নিজ অঞ্চলে এমনকি বৃহত্তর পরিসরে নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে—বলেন শেটলার জোন্স।

‘আমি মনে করি না, চীন যুক্তরাষ্ট্র-শাসিত বিশ্ব চায়। তবে তারা এমন বিশ্বও চায় না, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একটা অস্থিতিশীল নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকবে’—বলেন লাও ইনস্টিটিউটের পরিচালক কেরি ব্রাউন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে চীনা স্যাটেলাইট ইরানের নীরব ঢাল

ভারতকে চীনের মতো শক্তিশালী শত্রু হতে দেবে না যুক্তরাষ্ট্র

ইরান যুদ্ধে পালানটিরের ‘মেভেন’ যেন ১২ ঘণ্টায় ৯০০ আজরাইল

জর্ডানে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন রাডার ধ্বংস করেছে ইরান: সিএনএনের অনুসন্ধান

ইরানকে গোপনে মার্কিন সামরিক গতিবিধির তথ্য দিচ্ছে রাশিয়া

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত