Ajker Patrika

ভারতের অতি-ধনীদের ‘প্ল্যান বি’: বিদেশে নাগরিকত্ব-বসবাসের হিড়িক কেন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ভারতের অতি-ধনীদের ‘প্ল্যান বি’: বিদেশে নাগরিকত্ব-বসবাসের হিড়িক কেন
প্রতীকী ছবি

ভারতের অতি-ধনীদের (আল্ট্রা–রিচ) কাছে বিদেশে চলে যাওয়া এখন আর শুধু ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা সন্তানদের বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর বিষয় নয়। ক্রমেই আরও বেশি সংখ্যক অতি-উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি বা আল্ট্রা-হাই-নেট-ওয়ার্থ ইন্ডিভিজুয়াল (ইউএইচএনআই) দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ ব্যবস্থাপনার কৌশলের অংশ হিসেবে বিদেশে বসবাসের অধিকার ও নাগরিকত্বের দিকে নজর দিচ্ছেন। কারও কাছে এটি উত্তরাধিকার পরিকল্পনার বিষয়, কারও কাছে অবসরের বিকল্প, আবার কেউ এটিকে অন্য একটি দেশে প্রস্তুত রাখা ‘প্ল্যান বি’ হিসেবে দেখছেন।

বিনিয়োগভিত্তিক অভিবাসন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মাই আরসিবিআই ডট কম (MyRCBI.com) জানিয়েছে, ভারতের ধনী পরিবারগুলোর মধ্যে এই প্রবণতা ক্রমেই গতি পাচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, পরিবর্তনশীল করব্যবস্থা এবং কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা এই পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রাখছে। ধনী পরিবারগুলোর কাছে বিশ্বজুড়ে চলাচলের সক্ষমতাকেই এখন ক্রমবর্ধমানভাবে একটি সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

কেন ভারতের ধনীরা ‘প্ল্যান বি’ খুঁজছেন

আরসিবিআই ডট কম-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ধনঞ্জয়সিং চূড়াসামা বলেন, বিনিয়োগভিত্তিক অভিবাসনের পেছনে এখন আর শুধু বিদেশে পড়াশোনা কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্য কাজ করছে না। তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগভিত্তিক অভিবাসন এখন আর শুধু শিক্ষা বা ব্যবসা সম্প্রসারণের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে না। বর্তমানে অনেক পরিবার এটিকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে, যা তাদের চলাচলের ক্ষেত্রে আরও স্বাধীনতা, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আন্তর্জাতিক সুযোগের প্রবেশাধিকার এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, পরিস্থিতি অপ্রত্যাশিতভাবে বদলে গেলে একটি বাস্তবসম্মত প্ল্যান বি নিশ্চিত করে।’

সম্ভাব্য আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন ১০০ কোটি রুপির বেশি মূল্যমানের ব্যবসা পরিচালনাকারী উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বহু কোটি রুপি বেতন পাওয়া জ্যেষ্ঠ করপোরেট নির্বাহীরা।

কিছু পরিবারের উদ্দেশ্য আরও সরল। তারা সন্তানদের জীবন আরও সহজ করতে চান। বিদেশে বসবাসের অধিকার থাকলে শিক্ষা, ভবিষ্যতে চাকরি এবং স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত অনেক সহজ হতে পারে। অন্যরা আরও কয়েক বছর পরের কথা ভেবে অন্য কোনো দেশকে অবসরের আবাসস্থল হিসেবে বিবেচনা করছেন।

ব্যবসার মালিকদের ক্ষেত্রে, ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা ব্যবসায়িক পরিবেশ বদলে গেলে দ্রুত অন্য দেশে চলে যাওয়ার সক্ষমতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হতে পারে।

পছন্দের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র, পর্তুগাল ও গ্রিস

আরসিবিআই ডট কম-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্র, পর্তুগাল, গ্রিস, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের বিনিয়োগভিত্তিক অভিবাসন কর্মসূচি নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কোন দেশের প্রতি আকর্ষণ বেশি হবে, তা পরিবারভেদে ভিন্ন। স্থায়ী বসবাসের অধিকার, নাগরিকত্ব অথবা দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের অনুমতি ভ্রমণের ক্ষেত্রে আরও বেশি নমনীয়তা এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার দিতে পারে। ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর জন্য এ ধরনের কর্মসূচি বিদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং বৃহত্তর সম্পদ পরিকল্পনাতেও সহায়তা করতে পারে।

বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগভিত্তিক অভিবাসন শিল্পের মূল্য ইতোমধ্যেই কয়েক বিলিয়ন ডলার এবং এটি ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। শুধু ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই ৮৬টি দেশের নাগরিকরা ৪৭টি বিনিয়োগভিত্তিক অভিবাসন কর্মসূচির আওতায় আবেদন করেছেন, আরসিবিআই -এর উদ্ধৃত শিল্পখাতের হিসাব অনুযায়ী।

ভারত হয়ে উঠছে বড় উৎসবাজার

চূড়াসামার মতে, ভারত এখন বিনিয়োগভিত্তিক অভিবাসনের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় উৎসবাজারগুলোর একটি। এ ক্ষেত্রে ভারতের পাশাপাশি চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কও গুরুত্বপূর্ণ উৎসবাজার। যুক্তরাষ্ট্রের ইবি–৫ ইমিগ্র্যান্ট ইনভেস্টর প্রোগ্রামের আওতায় বিশ্বজুড়ে জমা পড়া আবেদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও ভারতীয় পরিবারগুলোর। চূড়াসামার মতে, বিনিয়োগভিত্তিক অভিবাসনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিধিবিধানের পরিবর্তন এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধিও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে ইবি–৫ কর্মসূচিতে এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

মুম্বাই-দিল্লির সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে গুজরাট

ভারতে বিনিয়োগভিত্তিক অভিবাসনের বাজার এখনো তুলনামূলকভাবে নতুন। তবে আগামী দুই থেকে তিন বছরে এর চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মুম্বাই ও দিল্লি ছিল এই চাহিদার প্রাথমিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে। এখন গুজরাটও একটি বড় বাজার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং মহারাষ্ট্রের পর দ্রুত এগিয়ে আসছে। এর পেছনে বিস্ময়ের খুব বেশি কারণ নেই। গুজরাটে বিপুলসংখ্যক উদ্যোক্তা রয়েছেন, যাদের ব্যবসা ক্রমেই ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিস্তৃত হচ্ছে।

ব্যবসা যখন বৈশ্বিক হচ্ছে, তখন এসব ব্যবসার মালিকও তাদের পরিবারের বসবাসের স্থান, সন্তানদের শিক্ষার গন্তব্য এবং সম্পদের কাঠামো নিয়ে বৈশ্বিকভাবে ভাবছেন। পুঁজিরও এখন পাসপোর্টের মতোই বেশ কিছু বিকল্প দরকার, কারণ মানবসভ্যতা এখনও অনিশ্চয়তা আবিষ্কার করা বন্ধ করেনি।

চূড়াসামা বলেন, ‘ভারতীয় ব্যবসাগুলো যখন বৈশ্বিক পরিসরে সম্প্রসারিত হচ্ছে, তখন বিনিয়োগভিত্তিক অভিবাসন একটি বিশেষায়িত সেবা থেকে ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হচ্ছে। আমরা আশা করছি, ভারতীয় অতি-উচ্চ সম্পদশালী পরিবারগুলোর মধ্যে এর চাহিদা আরও বাড়বে, কারণ তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও বেশি চলাচলের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং সুযোগ খুঁজছে।’

অর্থাৎ, ভারতের অতি-ধনীদের কাছে দ্বিতীয় কোনো দেশের বসবাসের অধিকার বা নাগরিকত্ব এখন ক্রমেই ভারত ছেড়ে যাওয়ার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এটি হয়ে উঠছে কোথায় জীবনের পরবর্তী অধ্যায় শুরু করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত