Ajker Patrika

‘ট্রাম্প ঈশ্বর প্রেরিত’ বিজ্ঞাপনে ব্যয় বিপুল সরকারি অর্থ, সমালোচনা তুঙ্গে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
‘ট্রাম্প ঈশ্বর প্রেরিত’ বিজ্ঞাপনে ব্যয় বিপুল সরকারি অর্থ, সমালোচনা তুঙ্গে
প্রতিটি বিজ্ঞাপনের শেষাংশে পর্দার নিচে লেখা রয়েছে, ‘পেইড ফর বাই দ্য ইউএস গভর্নমেন্ট’ অর্থাৎ ‘মার্কিন সরকারের অর্থায়নে’। ছবি: সিএনএন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর নীতিগুলো প্রচারের জন্য বহু মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ১৩টি প্রচারণাধর্মী বিজ্ঞাপন তৈরি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এ দিকে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ে এসব বিজ্ঞাপনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট দুই দল থেকেই। তবে হোয়াইট হাউস এসব বিজ্ঞাপনকে জনসেবামূলক ঘোষণা হিসেবে সমর্থন করেছে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে জানা গেছে, বিজ্ঞাপনগুলোর মধ্যে তিনটি বিজ্ঞাপনে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং ইরান ও ভেনেজুয়েলায় পরিচালিত সামরিক অভিযান তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ‘গড মেড ট্রাম্প’ নামে একটি বিজ্ঞাপন এবং হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প আয়োজিত ইউএফসি (আলটিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ) লড়াইয়ের চিত্র তুলে ধরা একটি বিজ্ঞাপন।

সিএনএন ১২টি বিজ্ঞাপনের ভিডিও ক্লিপ পেয়েছে। এসব বিজ্ঞাপনের দৈর্ঘ্য ১৫ সেকেন্ড থেকে তিন মিনিট পর্যন্ত। এর মধ্যে দুটি ইতিমধ্যে প্রচারিত হয়েছে। বিজ্ঞাপনগুলো একটি ড্রপবক্স অ্যাকাউন্টে রয়েছে। সিএনএনকে ওই অ্যাকাউন্টটি দেওয়া হয়েছিল। বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য সরকারের কাছ থেকে চুক্তি পাওয়া প্রতিষ্ঠান এলএমডি (LMD) ওই অ্যাকাউন্টটি পরিচালনা করে। প্রতিটি বিজ্ঞাপনের শেষাংশে পর্দার নিচে লেখা রয়েছে, ‘পেইড ফর বাই দ্য ইউএস গভর্নমেন্ট’ অর্থাৎ ‘মার্কিন সরকারের অর্থায়নে’।

‘ফাইনাল ব্যাটল’ নামে আরেকটি বিজ্ঞাপন ওই ড্রপবক্স অ্যাকাউন্টে নেই। সেটিও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রচারিত হয়েছে। তিনটি বিজ্ঞাপন সিবিএস, সিএনএন, এমএস নাও, ফক্স নিউজ ও ফক্সসহ বিভিন্ন টেলিভিশন নেটওয়ার্কে দেখানো হয়েছে। তবে সব কটি বিজ্ঞাপন টেলিভিশনে নাকি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচার করা হবে, তা স্পষ্ট নয়।

শুক্রবার বিকেলে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস সিএনএনকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমালোচনা করা একটি সদ্য প্রকাশিত ভিডিও সংকলনের দিকে নির্দেশ করে।

প্রতিটি বিজ্ঞাপনের বিষয়বস্তু আলাদা হলেও অনেক বিজ্ঞাপনেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ছবি এবং বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর বিষয়ে ইতিবাচক মন্তব্যের অডিও ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ট্রাম্পকে ব্যক্তিগতভাবে সহায়তা করতে করদাতার অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে এমন সমালোচনা আরও জোরালো হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিজ্ঞাপনগুলোতে দেশাত্মবোধক নানা দৃশ্যও রয়েছে। এর মধ্যে সামরিক বাহিনীর স্নাতক সমাপনী অনুষ্ঠানে ক্যাপ ছুড়ে দেওয়ার দৃশ্য, মাউন্ট রাশমোরের ওপর আতশবাজি এবং সামরিক বিমানের উড্ডয়ন প্রদর্শনের দৃশ্য রয়েছে।

প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে খুব কমই দেখা যাওয়া ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পকেও অনেক বিজ্ঞাপনে দেখা গেছে। এসব বিজ্ঞাপনে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক ঘোষণার দৃশ্য, সীমান্তপ্রাচীর, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর সময় ট্রাম্পের এসকেলেটর থেকে নেমে আসার দৃশ্য এবং ট্রাম্পের ‘প্রেসিডেনশিয়াল ওয়াক অব ফেম’-এ সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে বোঝাতে অটোপেন দিয়ে স্বাক্ষর করা একটি রসিকতামূলক বাঁধানো ছবিও রয়েছে।

এর আগে সিএনএন জানিয়েছিল, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ভিডিও বিজ্ঞাপনগুলো তৈরির কাজে ট্রাম্প নিজেই সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। বিজ্ঞাপনগুলোতে কোন ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করা হবে, তা বাছাইয়েও তিনি সহায়তা করেছেন। বিজ্ঞাপনগুলো সম্পর্কে অবগত ট্রাম্পের দুজন উপদেষ্টা বলেছেন, হোয়াইট হাউসের ভিডিও দলই এগুলো তৈরি করছে। এই দলটি যোগাযোগ বিভাগের অধীন, যারা প্রশাসনের জনসাধারণের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছে। তবে অন্তত একটি বিজ্ঞাপন ট্রাম্পপন্থী একটি মিম গ্রুপ তৈরি করেছে।

এ পর্যন্ত যেসব বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়েছে, সেগুলো ব্যাপক নিন্দার জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যেই হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, তারা এ প্রচেষ্টা আরও জোরদার করার পরিকল্পনা করছে। প্রতিনিধি পরিষদের জুডিশিয়ারি কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য জেমি রাসকিন এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, এসব বিজ্ঞাপন ‘রাজনৈতিক প্রচারণার কাজে সরকারি সম্পত্তি অপরাধমূলকভাবে চুরি ও ব্যবহার’ করার মতো গুরুতর অপরাধ হতে পারে। আগামী বছর ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে কংগ্রেসে সমন জারি করার ক্ষমতা পাবেন তিনি।

কিছু রিপাবলিকানও এই বিজ্ঞাপন প্রচারণার সমালোচনা করেছেন।

উত্তর ক্যারোলাইনার সিনেটর থম টিলিস বলেন, ‘দেখুন, আপনি যদি আপনার সুপার পিএসি (পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি) বা অন্য কোনো প্রচারণা তহবিল থেকে অর্থ খরচ করে এই বার্তা দিতে চান, তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু এটি উপযুক্ত কোনো জনসেবামূলক ঘোষণা নয়। এটি নয়। আপনারা জানেন, করদাতার অর্থ এভাবে খরচ করা আমাদের উচিত নয়।’

টেক্সাসের সিনেটর জন কর্নিনও বলেছেন, এসব বিজ্ঞাপন করদাতার অর্থ ব্যবহারের উপযুক্ত উপায় নয়। অথচ এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো কোনো সুযোগই নেই।’

‘ইউএফসি ২৫০’ বিজ্ঞাপনে প্রতিষ্ঠানটি এবং হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প আয়োজিত জুনের লড়াইটি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছে। বিজ্ঞাপনে ইউএফসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডানা হোয়াইট, লড়াইয়ে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়েরা, অক্টাগনের ওপর আলোকিত ‘ক্ল’ এবং চ্যাম্পিয়নশিপ বেল্টকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

‘মাদুরো’ নামের বিজ্ঞাপনে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর একটি ভাষণের সঙ্গে ট্রাম্প ও তাঁর দলের সদস্যদের মার-আ-লাগোয় উপস্থিতির দৃশ্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ভেনেজুয়েলার ওই শাসককে আটক করার পরের দৃশ্যও এতে রয়েছে।

আর ‘মিলিটারি হাইপ’ বিজ্ঞাপনে যুদ্ধবিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বলে মনে হয় এমন ভিডিও দেখানো হয়েছে। এতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দিয়ে ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া ট্রাম্পের ভাষণের অংশও রয়েছে। এই যুদ্ধটি এখনো মার্কিন জনগণের মধ্যে চরমভাবে অজনপ্রিয়।

বিজ্ঞাপনে ট্রাম্পকে বলতে শোনা যায়, ‘এই শাসকগোষ্ঠী শিগগিরই বুঝতে পারবে, যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি ও সামর্থ্যকে কারও চ্যালেঞ্জ করা উচিত নয়।’ যুদ্ধ শুরুর সাত মাস পর এখনো তাঁর এই বক্তব্য বিজ্ঞাপনটিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।

কিছু বিজ্ঞাপনে সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্যও রয়েছে।

দুই মিনিটের ‘কিং অব দ্য জঙ্গল’ ভিডিওতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত কয়েকজনের ছবি দেখানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও জো বাইডেন, প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এবং ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম—সবাই ডেমোক্র্যাট। বিজ্ঞাপনটিতে বনে সিংহের শিকারের দৃশ্য এবং পানির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া একটি সাদা মাথার ঈগলের ভিডিও রয়েছে। ইন দিস মোমেন্ট ব্যান্ডের ‘ইন দ্য এয়ার টুনাইট’ গানের একটি কভারও বাজানো হয়েছে। এর সঙ্গে ২০০২ সালের ‘পুলহল জাঙ্কিজ’ চলচ্চিত্রে ক্রিস্টোফার ওয়াকেনের সিংহবিষয়ক বক্তৃতার অংশ জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

‘গড মেড ট্রাম্প’ নামের তিন মিনিটের একটি বিজ্ঞাপন রিপাবলিকানদের ডালাসে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনসংক্রান্ত সম্মেলনে প্রচার করা হয়েছিল। বিজ্ঞাপনটিতে ট্রাম্পকে অনেকটা মেসিয়াহ বা ত্রাণকর্তার মতো করে তুলে ধরা হয়েছে। এতে পল হার্ভির ‘গড মেড আ ফার্মার’ বক্তব্যের আদলে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এনপিআরের তথ্য অনুযায়ী, বিজ্ঞাপনটি তৈরি করেছে ‘ডিলি মিম টিম’। চলতি বছরের শুরুর দিকে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

বিজ্ঞাপনে ভয়েসওভারে বলা হয়, ‘ঈশ্বর এমন একজনকে চাইলেন যাঁর বাহু এতটাই শক্তিশালী যে তা দিয়ে ডিপ স্টেট গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়, আবার তা এতটাই কোমল যেমন কোমলতায় নিজের নাতি-নাতনিকে কোলে তুলে নেওয়া হয়। তাই ঈশ্বর ট্রাম্পকে সৃষ্টি করলেন।’

‘রেজিলিয়েন্স’ বিজ্ঞাপনে ট্রাম্পের জীবনের বিভিন্ন সময়ের ছবি ও ভিডিও দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিউইয়র্কে তাঁর রিয়েল এস্টেট ব্যবসার শুরুর সময়, ‘দ্য অপরাহ উইনফ্রে শো’-তে তাঁর উপস্থিতি, ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণা করার সময় ট্রাম্প টাওয়ারের এসকেলেটর দিয়ে তাঁর নিচে নেমে আসার দৃশ্য এবং পরে হোয়াইট হাউসে তাঁর সময়কাল। বিজ্ঞাপনের অডিওতে এক সাংবাদিক তাঁকে ‘পশ্চিমা সভ্যতার দেহরক্ষী’ হিসেবে উল্লেখ করেন। জর্জিয়ার ফুলটন কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়ে ২০২৩ সালে তোলা ট্রাম্পের মাগশট বা গ্রেপ্তারের পরের ছবিটিও বিজ্ঞাপনে গুরুত্ব দিয়ে দেখানো হয়েছে। এর সঙ্গে পেনসিলভানিয়ার বাটলারে ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টার ঘটনার ভিডিও রয়েছে।

রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন পর্যবেক্ষণকারী শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান অ্যাডইমপ্যাক্টের হিসাব অনুযায়ী, ইতিমধ্যে এসব বিজ্ঞাপনের পেছনে করদাতার অর্থ থেকে অন্তত আনুমানিক ৫৬ লাখ ডলার খরচ হয়েছে। তবে করদাতার অর্থে পরিচালিত এই বিজ্ঞাপন প্রচারণার প্রকৃত ব্যয় আরও বেশি। কিন্তু পুরো ব্যয় নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ রাজনৈতিক প্রচারণার বিজ্ঞাপনের তুলনায় জনসেবামূলক ঘোষণা প্রকাশের ক্ষেত্রে সরকারি তথ্য প্রকাশের নিয়ম ভিন্ন।

এই প্রচেষ্টার জন্য মোট ২ কোটি ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, এসব বিজ্ঞাপনের অর্থ আসছে কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি) থেকে।

নজরদারি সংগঠনগুলো বলেছে, এসব বিজ্ঞাপন সরকারি অর্থ বরাদ্দসংক্রান্ত আইন স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করছে। ওই আইনে প্রচারণামূলক বা দলীয় উদ্দেশ্যে ফেডারেল সরকারের অর্থ ব্যবহারে বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে বাইরের কোনো সংগঠন এসব বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে মামলা করার মতো আইনগত অধিকার বা ‘স্ট্যান্ডিং’ রাখে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

বিজ্ঞাপনগুলো নিয়ে দুই দলেরই সমালোচনা থাকলেও কংগ্রেস এখনো এগুলো বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বিভিন্ন সংগঠনের মতে, এ ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার সবচেয়ে সুস্পষ্ট সুযোগ কংগ্রেসেরই ছিল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত