Ajker Patrika

ভারতে খাবারের থালায় ‘সিংহম’-এর হানা—কে এই তুকারাম মুন্ধে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ভারতে খাবারের থালায় ‘সিংহম’-এর হানা—কে এই তুকারাম মুন্ধে
ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের কমিশনার তুকারাম হারিভাউ মুন্ধে। ছবি: সংগৃহীত

মুম্বাইয়ের কোনো বিখ্যাত রেস্তোরাঁ, বহুজাতিক ফাস্টফুড চেইন কিংবা রাস্তার পাশের ছোট খাবারের দোকান—কেউই এখন আর নিশ্চিন্ত নয়। যে কোনো সময় দরজায় হাজির হতে পারেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। তাঁর সঙ্গে থাকবে পরিদর্শক দল। তারপর খুলবে রান্নাঘরের দরজা, উঁকি দেওয়া হবে ফ্রিজে, গুদামে, খাবার সংরক্ষণের তাকগুলোতে।

পাওয়া যেতে পারে মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যপণ্য। কোথাও তেলাপোকা বা অন্যান্য পোকামাকড়ের উপদ্রব। কোথাও খাবার সংরক্ষণের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। আর গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়লে হতে পারে লাইসেন্স স্থগিত কিংবা প্রতিষ্ঠান বন্ধ।

এই কর্মকর্তা কোনো চলচ্চিত্রের নায়ক নন। তিনি ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের কমিশনার তুকারাম হারিভাউ মুন্ধে। কিন্তু তাঁর সাম্প্রতিক অভিযানের ধরন দেখে অনেক ভারতীয় তাঁকে বলছেন ‘সিংহম’। বলিউডের সিনেমায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন এক জনপ্রিয় পুলিশ চরিত্রের নাম এটি।

গত মে মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মুন্ধের নেতৃত্বে ভারতের মহারাষ্ট্রজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক অভিযান। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র কয়েক মাসে তাঁর অধীনে তিন হাজারের বেশি অভিযান ও পরিদর্শন চালানো হয়েছে। খাবারের বড় বড় আন্তর্জাতিক চেইন থেকে শুরু করে ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ, হোটেল, ক্রিকেট ক্লাব—কেউই এই নজরদারির বাইরে থাকেনি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মুন্ধের অভিযানে প্রতিষ্ঠানের নাম বা প্রভাব কোনো ঢাল হিসেবে কাজ করছে না।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘দ্য টাইমস’ মুন্ধেকে নিয়ে এক প্রতিবেদনে লিখেছে—রাস্তার খাবারের দোকান থেকে অভিজাত রেস্তোরাঁ—কেউই তাঁর অভিযানের বাইরে নয়। এমনকি কোথাও কোথাও তাঁর পরিদর্শনের খবর পেয়েই প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

ভারতের মতো বিশাল দেশে একজন খাদ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তার জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসা খুব স্বাভাবিক ঘটনা নয়। সরকারি কর্মকর্তাদের সাধারণত মানুষ চেনে না, তাঁদের কাজের খবরও খুব কমই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।

তুকারাম মুন্ধের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটেছে কয়েকটি কারণে। প্রথমত, তাঁর অভিযান দৃশ্যমান। মানুষ নিজের চোখে দেখছে, যেসব নামী রেস্তোরাঁয় তারা বছরের পর বছর খেয়ে এসেছে, সেখানেও স্বাস্থ্যবিধির গুরুতর লঙ্ঘন থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, তিনি তথ্য গোপন করার পরিবর্তে জনসম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, জন-অভিযোগ গ্রহণ এবং জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এই স্বচ্ছতার কারণেই সাধারণ মানুষ মনে করছে—সরকারি দপ্তরে বসে শুধু কাগজে-কলমে কাজ নয়, বাস্তবেই কিছু হচ্ছে। তৃতীয়ত, তাঁর মধ্যে মানুষ সেই বিরল জিনিসটি দেখতে পাচ্ছে, যার জন্য নাগরিকেরা প্রায়ই অপেক্ষা করে—ভয় বা প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার না করে ক্ষমতার সুব্যবহার।

আগস্টের শুরুতে পুনের একটি অনুষ্ঠানে মুন্ধে মঞ্চে উঠতেই উপস্থিত মানুষ দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিবাদন জানান। সেই ভিডিও দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর কঠোর অভিযানের কারণেই সাধারণ মানুষের মধ্যে এই অভূতপূর্ব সমর্থন তৈরি হয়েছে।

মুন্ধের অভিযান নিয়ে অবশ্য বিতর্কও আছে। ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, তাঁর অভিযান অত্যন্ত কঠোর এবং এতে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আবার কেউ কেউ আইনি চ্যালেঞ্জও করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, অভিযান কি সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সমানভাবে পরিচালিত হচ্ছে?

একটি ঘটনায় মুম্বাইয়ের আদালতের একজন বিচারক প্রশ্ন তুলেছিলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভিযান চালানো হলেও আদালতের ক্যানটিনগুলো কি পরীক্ষা করা হয়েছে? এরপর মুন্ধের দল দ্রুত সেখানেও অভিযান চালায় এবং লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।

এই ঘটনাটিই হয়তো মুন্ধের পদ্ধতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যকে সামনে এনেছে—অভিযোগ এলে সেটিকে এড়িয়ে যাওয়া নয়; বরং একই মানদণ্ডে সবাইকে পরীক্ষা করার চেষ্টা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত