Ajker Patrika

বাস্তব পরিস্থিতি বুঝিয়ে যুদ্ধ থামানোর বার্তা দিতেই গোপনে মস্কোয় গিয়েছিলেন সিআইএ প্রধান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
বাস্তব পরিস্থিতি বুঝিয়ে যুদ্ধ থামানোর বার্তা দিতেই গোপনে মস্কোয় গিয়েছিলেন সিআইএ প্রধান
সিআইএ–এর প্রধান জন র‍্যাটক্লিফ। ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতেই যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ–এর পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ গোপনে মস্কো সফর করেছেন। রাশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি ও অর্থনীতির অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার আগেই ইউক্রেনের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে মস্কোকে রাজি করানোই ছিল তাঁর সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছেন বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা।

মস্কোতে র‍্যাটক্লিফ সরাসরি বৈঠক করেন রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবির প্রধান আলেকজান্ডার ভি. বোর্তনিকভের সঙ্গে। বৈঠকে তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি কঠোর ও হতাশাজনক মূল্যায়ন তুলে ধরেন। তবে র‍্যাটক্লিফ রাশিয়াকে কোনো হুমকি দেননি। তিনি বলেননি, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাঁর মূল্যায়ন উপেক্ষা করে যুদ্ধ চালিয়ে গেলে রাশিয়াকে কী ধরনের পরিণতি ভোগ করতে হবে।

রাশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়ন

সিআইএ–এর বিশ্লেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন করে আসছেন, পুতিনের উপদেষ্টারা যুদ্ধের প্রকৃত গতিপথ এবং রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে তাঁকে সঠিক ও সৎ তথ্য দিচ্ছেন কি না। সিআইএ–এর সঙ্গে রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর যোগাযোগের পুরোনো চ্যানেল রয়েছে। এফএসবি ছাড়াও রাশিয়ার বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা এসভিআর-এর সঙ্গে সিআইএ–এর যোগাযোগ রয়েছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বোর্তনিকভের সঙ্গে র‍্যাটক্লিফের গোয়েন্দা যোগাযোগের চ্যানেলটি এমন একটি আলাদা পথে পরিচালিত হচ্ছে, যার পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও পুতিনের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার সঙ্গে পৃথক যোগাযোগ তৈরি করেছেন।

কিছু মার্কিন কর্মকর্তা আশা করছেন, পুতিন নিজেও যেহেতু সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা, তাই সিআইএ পরিচালকের সরাসরি দেওয়া বার্তাকে তিনি সাধারণ কূটনৈতিক যোগাযোগের তুলনায় বেশি জরুরি ও বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।

রাশিয়ার বিজয় অনিবার্য, এমন ধারণা বদলাচ্ছে

গত বছরের বড় একটি সময়জুড়ে ট্রাম্প এবং তাঁর কয়েকজন শীর্ষ উপদেষ্টার মধ্যে এমন ধারণা ছিল যে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের বিজয় প্রায় অনিবার্য। এর পেছনে রাশিয়ার বড় জনসংখ্যা এবং দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে রাশিয়া ব্যাপক সেনা হারিয়েছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের অগ্রগতিও থেমে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে র‍্যাটক্লিফ বোর্তনিকভকে বলেন, রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা যখন এতটাই কঠিন হয়ে উঠেছে, তখন মস্কোর এখন যুদ্ধ শেষ করার জন্য গুরুতর আলোচনায় বসার সময় এসেছে। তবে র‍্যাটক্লিফের এই সফর যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া বা ইউক্রেনের বিষয়ে তাদের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে কি না, তার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

থেমে থাকা শান্তি আলোচনা আবার চালুর চেষ্টা

র‍্যাটক্লিফের মস্কো সফর ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে থেমে যাওয়া শান্তি আলোচনাকে আবার সক্রিয় করার সর্বশেষ প্রচেষ্টা। ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে ইউক্রেন পূর্বাঞ্চলে নিজেদের লড়াই ছেড়ে দিতে প্রস্তুত নয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা কমে গেলেও ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অবস্থান ধরে রেখেছে।

ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে দেওয়া সামরিক সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ইউক্রেনকে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে একই সময়ে সিআইএ ইউক্রেনের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ গোয়েন্দা সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। এই সহযোগিতা এক দশকেরও বেশি সময় আগে শুরু হয়েছিল।

ড্রোন যুদ্ধে ইউক্রেনের সক্ষমতা

বোর্তনিকভকে র‍্যাটক্লিফ যে ব্যক্তিগত বার্তা দিয়েছেন, তাতে তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্যেরও প্রতিফলন ছিল। গত মাসে র‍্যাটক্লিফ প্রকাশ্যে রাশিয়ার সেনা নিহত হওয়ার সংখ্যা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে মস্কোর অগ্রগতির অক্ষমতা নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, ইউক্রেনের সম্মুখসারিতে থাকা একজন রুশ সেনার গড় আয়ু ৩৫ মিনিটেরও কম।

র‍্যাটক্লিফ আরও বলেছিলেন, তিনি সিআইএ–এর পরিচালক হওয়ার পর ১৮ মাসে রাশিয়া ইউক্রেনের মোট ভূখণ্ডের মাত্র প্রায় ১ শতাংশ দখল করতে পেরেছে। তাঁর মতে, এর একটি বড় কারণ হলো ড্রোন প্রযুক্তিতে ইউক্রেনের ‘দক্ষতা’ বা ‘মাস্টারি।’ মস্কোতে বোর্তনিকভের সঙ্গে বৈঠকের আগে র‍্যাটক্লিফ ইউক্রেনের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেন। তিনি তাঁদের আশ্বস্ত করেন যে রাশিয়ার অবস্থান সম্পর্কে জানতেই তিনি মস্কো যাচ্ছেন, ইউক্রেনের পক্ষ থেকে কোনো ছাড় দেওয়ার জন্য নয়।

শীতের মাসগুলোতে শান্তির সুযোগ দেখছে ইউরোপ

ইউরোপীয় কূটনীতিকদের ধারণা, আসন্ন শীতের মাসগুলোতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর পেছনে দুটি বিষয়কে তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। প্রথমত, দোনবাসে রাশিয়ার বড় ধরনের সামরিক অভিযান অনেকটাই থেমে গেছে। দ্বিতীয়ত, ইউক্রেন ড্রোন যুদ্ধের মাধ্যমে রাশিয়ার ওপর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

কয়েকজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ দিচ্ছেন, যাতে রাশিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তির জন্য আলোচনা করা মার্কিন কর্মকর্তাদের দলে একজন জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাকেও যুক্ত করা হয়। তাঁদের মতে, এমন একজন কর্মকর্তা রাশিয়ার কাছে র‍্যাটক্লিফের মতো কঠোর ও সরাসরি বার্তা পৌঁছে দিতে পারবেন। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারকে রাশিয়ার প্রতি অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ বলে মনে করেন। বিপরীতে, দীর্ঘদিনের রাশিয়াবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত র‍্যাটক্লিফকে তাঁরা তুলনামূলকভাবে বেশি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখছেন।

ট্রাম্পের ‘গোপন বার্তাবাহক’ হিসেবে র‍্যাটক্লিফ

ট্রাম্প এর আগেও র‍্যাটক্লিফকে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করেছেন। জানুয়ারিতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর র‍্যাটক্লিফ হন প্রথম মন্ত্রিসভা-পর্যায়ের মার্কিন কর্মকর্তা, যিনি ভেনেজুয়েলা সফর করেন।

এরপর মে মাসে তিনি কিউবা সফর করেন। সেখানে তিনি কিউবার নেতাদের দেশটির অর্থনীতির ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি কঠোর মূল্যায়ন দেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তেল অবরোধের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই কিউবাকে ব্যাপক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনার আহ্বান জানান।

রাশিয়া-মার্কিন গোয়েন্দা প্রধানদের সরাসরি যোগাযোগ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার গোয়েন্দা প্রধানদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ খুব বেশি হয়নি। ২০২১ সালের নভেম্বরে, তৎকালীন বাইডেন প্রশাসনের সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম জে. বার্নস মস্কো গিয়ে বোর্তনিকভ এবং রাশিয়ার আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে বার্নস পুতিনকে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসন শুরু না করার জন্য সতর্ক করেছিলেন।

এর এক বছর পর, ২০২২ সালের নভেম্বরে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় বার্নসের সঙ্গে রাশিয়ার বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা এসভিআরের প্রধান সের্গেই নারিশকিনের সরাসরি বৈঠক হয়। সেসময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রুশ যোগাযোগের এমন কিছু তথ্য আটক করেছিল, যাতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণ ঠেকাতে রাশিয়া একটি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা বিবেচনা করতে পারে।

বার্নস নারিশকিনকে সতর্ক করে বলেছিলেন, রাশিয়া যদি এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তাকে গুরুতর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। তুরস্ক চেয়েছিল, আঙ্কারার সেই বৈঠক ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে উত্তেজনা কমাতে নিয়মিত ও দীর্ঘস্থায়ী সরাসরি যোগাযোগের সূচনা করুক। কিন্তু বৈঠকের পর রাশিয়ার পক্ষ সেটি প্রকাশ্যে জানিয়ে দেওয়ায় সিআইএ ক্ষুব্ধ হয়। বার্নস ও নারিশকিন এরপর আর দ্বিতীয়বার সরাসরি মুখোমুখি বৈঠক করেননি। তবে তাঁরা মাঝে মাঝে ফোনে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছিলেন।

র‍্যাটক্লিফ-বোর্তনিকভের প্রথম মুখোমুখি বৈঠক

ট্রাম্প গত বছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর র‍্যাটক্লিফ ও বোর্তনিকভ একটি বন্দিবিনিময় চুক্তির বিস্তারিত নিয়ে কাজ করেছিলেন। তবে এ সপ্তাহের মস্কো সফরই ছিল তাঁদের প্রথম মুখোমুখি বৈঠক। এই বৈঠকে র‍্যাটক্লিফের মূল বার্তা ছিল স্পষ্ট—রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই মস্কোর উচিত ইউক্রেনের সঙ্গে গুরুতর শান্তি আলোচনায় বসা।

তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত