Ajker Patrika

চীনের গুয়াংজিতে বন্যায় নিহত ৩৯, ধেয়ে আসছে সুপার টাইফুন ‘বাভি’

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
চীনের গুয়াংজিতে বন্যায় নিহত ৩৯, ধেয়ে আসছে সুপার টাইফুন ‘বাভি’
বন্যার পানি কিছুটা কমলেও চারপাশের ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট এখনো পুরু ঘন কাদায় ডুবে আছে। ছবি: এএফপি

চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংজি ঝুয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে টাইফুন মেসাকের প্রভাবে সৃষ্ট বন্যা ও বাঁধ ধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত ৯ জন। স্থানীয় প্রশাসন ও চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

বন্যাকবলিত এলাকাগুলো থেকে পানি কিছুটা কমতে শুরু করায় সেনা সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা এখন ধ্বংসস্তূপ ও কাদা পরিষ্কারের কাজ শুরু করেছেন। তবে এই বিপর্যয় কাটতে না কাটতেই চীনের পূর্ব উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে ১ হাজার কিলোমিটার ব্যাসের বিশাল এক দানবীয় সুপার টাইফুন ‘বাভি’, যা মধ্য ও উত্তর চীনে নতুন করে দুর্যোগের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া ও এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুয়াংজির নাননিং ও হেংঝৌ শহরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই বন্যার সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটেছে গত সোমবার সকালে লিউজান জলাধারের একটি মাঝারি আকৃতির বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর। ওই বাঁধ ধসের পর সৃষ্ট আকস্মিক জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়ে এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং এখনো ৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার এএফপির প্রতিনিধিরা সরাসরি বন্যাকবলিত এলাকায় গিয়ে দেখেন, লিউজান গ্রামে প্রবেশ ও জানমালের সুরক্ষার জন্য পুলিশ একটি বিশেষ চেকপোস্ট বসিয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কেবল লিউজান নয়, গানতাং শহরের কাছে অবস্থিত আরেকটি ছোট জলাধারের বাঁধও এই পানির তোড়ে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।

গানতাং এলাকার হুয়াং নামের এক বাসিন্দা ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘ইতিহাসে কখনো এখানে এত বড় বিপর্যয় ঘটেনি, তাই শুরুতে আমরা পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা ধারণাই করতে পারিনি। আমাদের প্রশাসন থেকে কোনো আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। যদি আমরা একটু আগে জানতে পারতাম, তবে আমাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম হতো।’

বর্তমানে গানতাং শহরের রাস্তাগুলোতে বন্যাকবলিত মানুষের ঘরবাড়ির আসবাবপত্র ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের স্তূপ জমে আছে। বাসিন্দারা কাদা ও ময়লা পানি পরিষ্কার করতে হিমশিম খাচ্ছেন। ওই এলাকার ৫২ বছর বয়সী বি ইউনচুন নামের এক ব্যক্তি বন্যার পানিতে পায়ে আঘাত পেয়েছেন। ইউচুন বলেন, ‘আমার জীবনে এই প্রথম দেখলাম বন্যার পানি কোনো বাড়ির দোতলা পর্যন্ত উঠে গেছে।’

হেংঝৌ শহরের লিউজান গ্রামে বন্যার পানি কিছুটা কমলেও চারপাশের ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট প্রায় এক হাত পুরু ঘন কাদায় ডুবে রয়েছে। অনেক বাসিন্দাকে কাদার ভেতর থেকে নিজেদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র উদ্ধার করতে ছোট এক্সকাভেটর বা মাটি কাটার যন্ত্র ব্যবহার করতে দেখা গেছে। বাঁধের পানি এখনো তীব্র গতিতে নদীর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নদীর ওপারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মানুষদের কাছে বড় ড্রোন ব্যবহার করে জরুরি খাদ্যসামগ্রী ও ওষুধপত্র পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

লিউজানের পাশেই অবস্থিত দুতিয়ান গ্রামের ৬০০ বাসিন্দাকে নিরাপদে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও পুরো গ্রামটি এখন বহির্জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। দুতিয়ানের বেশ কিছু বাড়ি জলোচ্ছ্বাসের সরাসরি আঘাতে গুঁড়িয়ে গেছে। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধারকাজ ও বাঁধ মেরামতের জন্য ২ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি নিয়মিত সেনা এবং ৫ হাজার ৫০০ জনের একটি মিলিশিয়া বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

তবে গুয়াংজির এই বন্যা শুধু মানুষের জীবনকেই বিপর্যস্ত করেনি। বন্যাকবলিত চিড়িয়াখানা ও খামার থেকে শত শত বন্যপ্রাণী ও বিষাক্ত সাপ লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। গুইগাং চিড়িয়াখানার সীমানা প্রাচীর ও খাঁচা ভেঙে বন্যার পানিতে ভেসে গেছে শূকর ও জেব্রাসহ অন্তত ১০০টি বিদেশি বন্যপ্রাণী। বন্যপ্রাণীগুলোকে খুঁজে পেতে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জনসাধারণের কাছে জরুরি সাহায্য চেয়েছে।

এর আগে গত মঙ্গলবার হেইংঝৌ শহরের একটি বিশেষ খামার বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়ার পর সেখান থেকে প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০টি বিষাক্ত সাপ চারপাশের লোকালয়ে ও পানিতে ছড়িয়ে পড়ে, যা উদ্ধারকর্মীদের জন্য নতুন আতঙ্ক তৈরি করেছে।

এদিকে এই চরম বিপর্যয়ের মধ্যেই ধেয়ে আসা সুপার টাইফুন ‘বাভি’র প্রাক্কলনে গতকাল বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের আবহাওয়া দপ্তর দেশজুড়ে ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ (দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কবার্তা) জারি করেছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য অঞ্চলের স্কুলগুলোর ক্লাস স্থগিত এবং সাধারণ মানুষকে ঘরে থেকে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আবহাওয়াবিদেরা জানিয়েছেন, টাইফুনটি আগামী শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ তাইওয়ান হয়ে চীনের ফুজিয়ান এবং চিজিয়াং প্রদেশের উপকূলে আঘাত হানতে পারে। এর প্রভাবে আগামী তিন দিন চীনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ৩০০ থেকে ৫০০ মিলিমিটার পর্যন্ত রেকর্ড পরিমাণ ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত