Ajker Patrika

সংকট মোকাবিলা: বিকল্প উৎস থেকে সাত লাখ টন তেল আনা হবে

  • এপ্রিল মাসের চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা রয়েছে
  • অন্তত সাত বিদেশি কোম্পানি তেল সরবরাহ করতে চাইছে
  • বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত ধাপ পার হয়ে আসবে এ তেল
ফয়সাল আতিক, ঢাকা
সংকট মোকাবিলা: বিকল্প উৎস থেকে সাত লাখ টন তেল আনা হবে
ছবি: সংগৃহীত

ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ হামলা শুরুর এক মাসের মাথায় বিশ্বের বহু দেশে জ্বালানির সংকট চরমে উঠেছে। দেশে দাম না বাড়লেও চাহিদামতো জ্বালানি তেল পাওয়া নিয়ে ভোক্তারা ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে সরকার বলেছে, চলতি এপ্রিল মাসের চাহিদা পূরণের মতো ব্যবস্থা বাংলাদেশের রয়েছে। এ ছাড়া বিকল্প উৎস থেকে মোট ৭ লাখ টন জ্বালানি তেল আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এ জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে হবে, যা কিছুটা সময়সাপেক্ষ।

পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি ও বিপণনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, গত এক মাসে অন্তত সাতটি বিদেশি কোম্পানি জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। এসব কোম্পানির প্রস্তাবে অন্তত ৭ লাখ টন পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রয়েছে। প্রস্তাবগুলো আমদানিপ্রক্রিয়ার কিছু ধাপ পার হলেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত এলসি খোলার পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের যে মজুত রয়েছে এবং পাইপলাইনে যে পরিমাণ তেল আসার পথে রয়েছে, তাতে এপ্রিল মাসে কোনো সরবরাহ সংকট হবে না। এরপরও যুদ্ধ শুরুর পর মন্ত্রণালয় তেল আমদানির ক্ষেত্রে বেশ ইতিবাচক মনোভাবে রয়েছে। যারাই আমদানির আগ্রহ দেখিয়েছে সবাইকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অন্তত সাতটি কোম্পানিকে এ পর্যন্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রস্তাবে প্রায় ৭ লাখ টন জ্বালানি রয়েছে।

জ্বালানিবিষয়ক স্থাপনা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ কাতারসহ কয়েকটি কর্তৃপক্ষ ‘ফোর্স মেজার’ ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণা সংশ্লিষ্ট দেশ বা পক্ষকে বিশেষ পরিস্থিতিতে চুক্তি রক্ষা করার আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেয়। বাংলাদেশের মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক কিছু সরবরাহ চুক্তি এই ‘ফোর্স মেজার’-এর আওতায় পড়ে আটকে গেছে। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এ জন্যই বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিপিসির তথ্যে দেখা যায়, সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় আন্তর্জাতিক দামে এক্সন-মবিল কাজাখস্তানের কাছ থেকে ১ লাখ টন ডিজেল (সালফার ১০ পিপিএম) কেনার প্রস্তাব সরকার গত বুধবার অনুমোদন দিয়েছে। আবির ট্রেড অ্যান্ড গ্লোবাল মার্কেটস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব অনুযায়ী ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল কেনার প্রস্তাবও গত মঙ্গলবার অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা কমিটি। আবির ট্রেড একটি বিদেশি কোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট, যারা মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া বা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তেল সরবরাহ করতে চায়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি আর্চার এনার্জি তাদের স্থানীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে ৬০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। ওমানভিত্তিক ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল মোট ১ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করতে চায়।

সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় গত ১২ মার্চ সরকার প্রথম যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এঅ্যান্ডএ এনার্জি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক পেট্রোগ্যাসের ২ লাখ ২৫ হাজার টন তেল কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। তবে সে তেল দেশে এখনো আসেনি। এর মধ্যে পেট্রোগ্যাস ২৫ হাজার টন অকটেন বিক্রির জন্য বিপিসিকে ৩০ মার্চ জামানত বা পিজি (পারফরম্যান্স গ্যারান্টি) দিয়েছে। বাকি চালানের জন্য কোম্পানি দুটি এখনো সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো জামানত দেয়নি।

গত ২৬ মার্চ নেদারল্যান্ডসের এপি এনার্জি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের কাছ থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ১ লাখ টন ডিজেল কেনার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চীনের হংকংভিত্তিক সুপারস্টার ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ লিমিটেডের কাছ থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ২ লাখ টন ডিজেল কেনার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

দেশে প্রতিবছর কমবেশি ৬০ লাখ টন জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয়, যার ৬৩ শতাংশই ডিজেল। সরকার এই চাহিদা পূরণের জন্য তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীদের সঙ্গে বছরে দুবার (জানুয়ারি-জুন, জুলাই-ডিসেম্বর) চুক্তি করে। তবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এসব চুক্তির বেশ কিছু চালান দেশে পৌঁছানোর সূচিতে গড়বড় হয়েছে।

বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে আসবে তেল

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ‘তেল আমদানির জন্য নতুন করে সাতটি কোম্পানিকে অনুমোদন দেওয়া হলেও যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেকে সামনে এগোতে পারবে কি না সন্দেহ রয়েছে। শুধু একজন সরবরাহকারী পারফরমেন্স গ্যারান্টির অর্থ জমা দিয়েছে। অন্যরা পিজি জমা দেওয়ার পরই কিছুটা নিশ্চিত হতে পারব।’

বিপিসির বাণিজ্য বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, বিদেশ থেকে জ্বালানি কেনার জন্য কয়েকটি ধাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কোম্পানিগুলোকে প্রথমে নোটিস অব অ্যাওয়ার্ড (এনওএ) দিতে হয়। এর পরের ধাপে কোম্পানিগুলো ক্রেতা দেশকে পারফরমেন্স গ্যারান্টি (জামানত) জমা দেয়। পরের ধাপে তাদের সঙ্গে ক্রেতা দেশের সেলস অ্যান্ড পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (এসপিএ) হয়। এরপর বিক্রেতা কোম্পানি প্রোফরমা ইনভয়েস (পিআই) জমা দেওয়ার পরই শুধু এলসি খোলার অনুমোদন পায়।

জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, গত ২ মার্চ থেকে বাংলাদেশের জন্য ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ নরডিক পোলাক্স সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় একটি বন্দরে আটকে আছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জাহাজটি আসতে পারছে না।

যুগ্ম সচিব মনির হোসেন জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশমুখী যে ছয়টি জাহাজ আটকা পড়েছে তার মাত্র একটি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলবাহী। বাকি জাহাজগুলো এলএনজি বহন করছে।

‘এপ্রিল পুরোপুরি নিরাপদ’: দেশে জ্বালানি তেলের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ীই তেলবাহী জাহাজ আসছে। ফলে চলতি এপ্রিল মাসে তেলের জোগান পুরোপুরি নিরাপদ বলে জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। গতকাল সচিবালয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‌‘আমি হিসাব করে দেখেছি, আমাদের পর্যাপ্ত মজুত আছে। কোনো সংকট নেই। ডিজেলের ক্ষেত্রেও কোনো সমস্যা নেই। আমরা মাসভিত্তিক পরিকল্পনা অনুযায়ী আমদানি করছি। এপ্রিল মাস পুরোপুরি নিরাপদ।’

যুগ্ম সচিব জানান দেশে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল মিলিয়ে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৮৭৫ টন জ্বালানি তেলের মজুত আছে। এর মধ্যে ডিজেল ১ লাখ ২২ হাজার ৬৬০ টন, অকটেন ৯ হাজার ২১ টন এবং পেট্রল ১২ হাজার ১৯৪ টন। এর সঙ্গে যুক্ত হবে ‘সাপ্লাই লাইনে’ থাকা আরও কয়েকটি জাহাজের তেল।

কৃষকদের ডিজেলপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘জেলা প্রশাসন ও কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের তালিকা অনুযায়ী ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে। কোনো কৃষক যাতে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি রয়েছে।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ৩ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে অভিযান চালিয়ে ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৮ লিটার জ্বালানি উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ডিজেল ২ লাখ ৭১ হাজার ৩৭৪ লিটার, অকটেন ৩০ হাজার ৯৬০ লিটার এবং পেট্রল ৭০ হাজার ৫৪ লিটার। জরিমানা করা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৪৩৫ টাকা। কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ২৪ জনকে। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় ২৫ হাজার ৫৩৭ লিটার জ্বালানি উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ লিটার অকটেন ও ৩৯৫ লিটার পেট্রল। বাকি পুরোটাই ডিজেল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

অন্তর্বর্তী সরকারের ২০ অধ্যাদেশ আটকে দেওয়ার সুপারিশ বিশেষ কমিটির

কুমিল্লায় ২ সাংবাদিককে হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিলেন এসি ল্যান্ড

রাত ৮টার পর দেশের সব দোকান-শপিং মল বন্ধ থাকবে, সিদ্ধান্ত মালিক সমিতির

অফিস সকাল ৯টা থেকে ৪টা, সন্ধ্যা ছয়টায় বন্ধ মার্কেট

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হলেন সাইয়েদ বিন আব্দুল্লাহ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত