Ajker Patrika

ভারতে ডিটেনশন সেন্টারে যাওয়ার ভয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে ভিড় করছেন কথিত অভিবাসীরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৯ মে ২০২৬, ১৯: ২৮
ভারতে ডিটেনশন সেন্টারে যাওয়ার ভয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে ভিড় করছেন কথিত অভিবাসীরা
বহু মানুষ এখন এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। একদিকে ভারত ছাড়ার চাপ, অন্যদিকে নাগরিকত্বের আনুষ্ঠানিক প্রমাণ ছাড়া তাঁদের গ্রহণ করবে না বাংলাদেশ সরকার—এমন দোটানায় পড়েছেন তাঁরা। ছবি: এএফপি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্য সরকার নথিপত্রবিহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে দেশটিতে বড় ধরনের অভিযান চালাতে পারে—এমন আশঙ্কায় শত শত মানুষ বাংলাদেশ সীমান্তে জড়ো হয়েছেন। রাজ্যের হাকিমপুর সীমান্তচৌকিতে দুই দিন ধরে সন্তান ও পরিবার নিয়ে অপেক্ষা করছেন বহু মানুষ। তাঁদের শঙ্কা—ভারতে থাকলে আটক করে ডিটেনশন সেন্টারে নেওয়া হবে। তাই অনেকে যেকোনো মূল্যে বাংলাদেশে ঢুকতে চান।

চলতি মাসের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কট্টর হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসে। এরপরই তারা নথিপত্রবিহীন অভিবাসীদের প্রথমে ‘শনাক্ত’ করে, পরে বাদ ও বহিষ্কার বা ফেরত পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। এর পর থেকে সীমান্ত এলাকায় কড়াকড়ি শুরু হয়। ফলে নথিপত্রবিহীন অভিবাসীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, আইনি সুরক্ষার অভাব ও জোরপূর্বক বিতাড়িত হওয়ার ভয়েই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে, বহু মানুষ এখন একধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। একদিকে ভারত ছাড়ার জন্য প্রশাসনিক চাপ, অন্যদিকে নাগরিকত্বের আনুষ্ঠানিক প্রমাণ ছাড়া তাঁদের গ্রহণ করবে না বাংলাদেশ সরকার—এমন দোটানায় পড়েছেন তাঁরা। এই পরিস্থিতিতে অনেক পরিবারই রাতের অন্ধকারে সীমান্তে নদী পার হয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছেন। তবে এভাবে নদী পার হয়ে বাংলাদেশে ঢোকার সঠিক সংখ্যা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গত সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গ সরকার নথিপত্রবিহীন অভিবাসীদের (যার মধ্যে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা উভয়ই রয়েছে বলে অভিযোগ ভারতের) আটকে রাখার জন্য একটি আটক কেন্দ্র বানানোর নির্দেশ দিয়েছে। এই পদক্ষেপের পর রাজ্যের প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

এমনই একজন ৪৫ বছর বয়সী হাসিনা বিবি। তিনি ছয় বছর আগে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। এর পর থেকে কলকাতার একটি নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করতেন। হাসিনা বিবি বলেন, ‘আমাদের তাড়াতাড়ি চলে যেতে বলা হয়েছে, তা না হলে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে। কাজের সন্ধানে এই শহরে এসেছিলাম, এখন বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাই। কিন্তু জানি না সেখানে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে।’

কলকাতা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত বাংলাদেশের দিনাজপুরের হাকিমপুর সীমান্ত (বাংলাদেশের দিনাজপুর, হাকিমপুর) দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা সম্ভব—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কলকাতা ও এর আশপাশের এলাকা থেকে শত শত মানুষ এখানে এসে জড়ো হতে শুরু করেছেন।

বাংলাদেশ-ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বেশ কিছু জায়গা এখনো উন্মুক্ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক সংকট ও পারিবারিক সম্পর্কের কারণে এসব সীমান্ত হয়ে অনেক মানুষ ভারতে প্রবেশ করে থাকেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের মতো সীমান্ত রাজ্যগুলোতে এই নথিপত্রবিহীন অভিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ হিসেবে কাজ করছেন। তবে মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, গত কয়েক মাসে আইনি প্রক্রিয়া না মেনে কেবল জাতিগত প্রোফাইলিংয়ের (মুসলমান) ভিত্তিতে আসাম থেকে শত শত মানুষকে জোরপূর্বক সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

উত্তর ২৪ পরগনা জেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে একটি আটক কেন্দ্র পাহারা দিচ্ছে পুলিশ। সেখানে নথিপত্রহীন ও অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের অভিযোগে আটক অভিবাসীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আগে যাচাইয়ের জন্য রাখা হয়েছে। ছবি: এএফপি
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে একটি আটক কেন্দ্র পাহারা দিচ্ছে পুলিশ। সেখানে নথিপত্রহীন ও অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের অভিযোগে আটক অভিবাসীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আগে যাচাইয়ের জন্য রাখা হয়েছে। ছবি: এএফপি

আসামের এই পরিস্থিতির কারণেই পশ্চিমবঙ্গে আতঙ্ক আরও প্রকট রূপ নিয়েছে। সীমান্তে দায়িত্বরত পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সুব্রত সাহা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, গত মঙ্গলবার থেকে মানুষ হাকিমপুর সীমান্তে দল বেঁধে আসতে শুরু করেছেন। এখানে অস্থায়ী আশ্রয়ে জড়ো হওয়া মানুষদের প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের জন্য আটক কেন্দ্রে নেওয়া হবে। এরপর বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) কাছে হস্তান্তর করে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

তবে অভিবাসন নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের এই সমস্যা নতুন নয়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগের পর থেকেই এই অঞ্চলে অভিবাসনের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ফিরে আসার এই চেষ্টা অনেকের সামনেই পরিচয় ও অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে।

২০ বছর বয়সী যুবক আব্দুল শেখ বলেন, ‘আমার মা-বাবা দুই দশক আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছিলেন। আমার জন্ম কলকাতায়, কিন্তু আমার কাছে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের কোনো বৈধ নথিপত্র নেই। বাবা-মা মারা গেছেন, এখন আমাকে দেশ ছাড়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমি জানি না, সেখানে গিয়ে কীভাবে প্রমাণ করব যে আমি একজন বাংলাদেশি।’

তিন বছর আগে বাবার চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন রাজমিস্ত্রি আরিফুল সরদার। তিনি বলেন, ‘আমরা অসহায়, সরকারি আদেশের কারণেই আমরা ফিরে যাচ্ছি।’

সীমান্তরক্ষীরা সতর্ক করেছেন, সম্প্রতি সীমান্ত পারাপারের সংখ্যা বেড়েছে। অনেকেই রাতের অন্ধকারে কাছাকাছি নদী দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছেন। বিএসএফের একজন কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, নদী পার হওয়া কঠিন নয়। রাতের অন্ধকারে নদী পার হওয়া ঠেকাতে সীমান্ত পাহারা দেওয়া এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত