Ajker Patrika

রাশিয়া-আফগানিস্তান সামরিক চুক্তি, তালেবান যোদ্ধারা কি এবার ইউক্রেন যাবেন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৯ মে ২০২৬, ১৯: ০০
রাশিয়া-আফগানিস্তান সামরিক চুক্তি, তালেবান যোদ্ধারা কি এবার ইউক্রেন যাবেন
২০২৫ সালের অক্টোবরে মস্কোতে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি। ছবি: এএফপি

সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাশিয়ার সঙ্গে আফগানিস্তানের একটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে কট্টরপন্থী ইসলামি গোষ্ঠীটির সঙ্গে মস্কোর সম্পর্ক আরও গভীর হলো। একই সঙ্গে বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পর এই চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থানকে আরও পাকাপোক্ত করল রাশিয়া।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দি ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত বুধবার (২৭ মে) মস্কোয় অনুষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ফোরাম’ চলাকালে সামরিক চুক্তিটি চূড়ান্ত ও অনুমোদিত হয়। সম্মেলনে আফগানিস্তানের পক্ষে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও শীর্ষ নেতা মোহাম্মদ ইয়াকুব উপস্থিত ছিলেন।

২০২৫ সালের জুলাই মাসে রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবানকে আফগানিস্তানের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এটিই ছিল কোনো উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে তালেবান কর্মকর্তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ। এখন পর্যন্ত বিশ্বের অন্য কোনো দেশ তালেবান সরকারকে এই ধরনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি।

ইউক্রেন যুদ্ধে তালেবান যোদ্ধাদের যোগ দেওয়ার আশঙ্কা কতটুকু

রাশিয়া বা আফগানিস্তান—কোনো পক্ষই এই সামরিক প্রযুক্তিগত চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি প্রকাশ করেনি। তবে এই চুক্তির পর আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার মতো তালেবানও কি ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে লড়াই করতে তাদের অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের পাঠাতে শুরু করবে?

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুনে পিয়ংইয়ং ও মস্কোর মধ্যে সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর উত্তর কোরিয়া ইউরোপের এই যুদ্ধক্ষেত্রে হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছিল।

সম্মেলনে তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা মোহাম্মদ ওমরের ছেলে মোহাম্মদ ইয়াকুব বলেন, ‘আফগানিস্তান ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘ ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে এবং আমরা এই সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।’ তিনি মস্কোর সঙ্গে এই সহযোগিতাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বর্ণনা করেন।

প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শীর্ষ সহযোগী ও রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান সের্গেই শোইগু তালেবান নেতাকে স্বাগত জানান এবং এই সুযোগে তালেবানের ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর জারি করা নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, পশ্চিমা দেশগুলোর উচিত আফগানিস্তানের অবরুদ্ধ অর্থ বা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া এবং বিগত ২০ বছরের আগ্রাসনের সম্পূর্ণ দায় নিয়ে দেশটির পুনর্গঠনে এগিয়ে আসা।’

বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির গভীরতা কতটা, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে, উত্তর কোরিয়ার মতো তালেবানও ইউক্রেনে সেনা পাঠাবে।

নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংকট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ফেলো আলেক্সি জাখারভ দি ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, অস্ত্র বা সেনা—কোনো দিক থেকেই রাশিয়ার পক্ষে তালেবানের কাছ থেকে বড় কোনো সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা কম। চুক্তির বিস্তারিত তথ্য না থাকায় রাশিয়া আসলে আফগানিস্তানের কাছ থেকে কী সুবিধা পাবে, তা বলা কঠিন।

আলেক্সি জাখারভ উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে মস্কোর সম্পর্কের পার্থক্যের কথা উল্লেখ করে জানান, পিয়ংইয়ং উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সহায়তার বিনিময়ে রাশিয়াকে সেনা এবং গোলাবারুদ সরবরাহ করেছিল, কিন্তু তালেবানের বর্তমান ভঙ্গুর পরিস্থিতির কারণে এই ধরনের কোনো চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

জাখারভ আরও বলেন, তালেবান বর্তমানে আফগানিস্তানের উত্তরের প্রদেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের দক্ষিণ সীমান্ত রক্ষা করা নিয়ে সংকটে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সামরিক সরঞ্জাম মেরামত বা রাশিয়ার কাছ থেকে কিছু পুরোনো অস্ত্র পাওয়া তাদের জন্য বেশ সময়োপযোগী হবে। তবে রাশিয়া কখনোই তাদের উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহ করার ঝুঁকি নেবে না।

অনেকের ধারণা, ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়ে রাশিয়ার মূল লক্ষ্য হলো তালেবান যেন আফগানিস্তানের উত্তর প্রদেশগুলো এবং মধ্য এশিয়ার সঙ্গে থাকা তাদের দীর্ঘ ও অরক্ষিত সীমান্ত পাহারা দিতে নিজেদের শক্তি ব্যবহার করে। কারণ, মধ্য এশিয়াকে রাশিয়া তাদের নিজস্ব ‘ব্যাকইয়ার্ড’ বা কৌশলগত অঞ্চল বলে মনে করে।

সম্প্রতি আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের যোদ্ধাদের উপস্থিতি নিয়েও রাশিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের (এফএসবি) পরিচালক আলেক্সান্ডার বোর্টনিকভ জানিয়েছেন, আইএসের আঞ্চলিক শাখা ‘আইএস-খোরসান’ এখন তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান ও কাজাখস্তানের নাগরিকদের নিয়ে দল ভারী করছে এবং রাশিয়ায় থাকা অভিবাসী শ্রমিকদের মাধ্যমে গোপনে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করছে।

তবে এই একটি বিষয়ে রাশিয়ার সঙ্গে তালেবানের মতবিরোধ রয়েছে। তালেবানের প্রধান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেছেন, আফগানিস্তান থেকে আইএসকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আফগানিস্তান নিয়ে কোনো দেশেরই উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী আইএসের বিরুদ্ধে সফলভাবে লড়াই করেছে এবং আফগান মাটিতে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে কার্যক্রম চালাতে দেওয়া হচ্ছে না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত