Ajker Patrika

মার্কিন হামলা হলে এবার ইরানের প্রতিক্রিয়া কেন ভিন্ন হতে পারে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯: ৪৯
মার্কিন হামলা হলে এবার ইরানের প্রতিক্রিয়া কেন ভিন্ন হতে পারে
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতাভুক্ত এলাকায় বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন মোতায়েন করা হয়েছে। ছবি: বিবিসি

ইরানের উপকূলের কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতাভুক্ত এলাকায় সদলবলে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের আগমন মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এমন এক সময়ে এই মোতায়েন ঘটছে, যখন ইরান সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে সহিংস ও ব্যাপক গণবিক্ষোভ দমনের পর এক গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের সম্ভাবনা সাম্প্রতিক বছরগুলোর যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিবিসির এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব বর্তমানে দ্বিমুখী চাপের মুখে রয়েছে। একদিকে, দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভ ক্রমেই সরকারের অপসারণের দাবি তুলছে; অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের অবস্থান অস্পষ্ট রেখে উদ্বেগ বাড়াচ্ছেন—যার প্রভাব শুধু তেহরানেই নয়, পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য কোনো মার্কিন সামরিক হামলার জবাবে ইরানের প্রতিক্রিয়া আগের মতো হিসাবি ও সীমিত নাও হতে পারে।

বিগত বছরগুলোতে মার্কিন হামলার জবাবে ইরান সাধারণত বিলম্বিত ও সীমিত মাত্রায় পাল্টা আঘাতের পথ বেছে নিয়েছিল। ২০২৫ সালের ২১–২২ জুন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর ইরান পরদিন কাতারের আল-উদেইদ মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, হামলার আগাম সতর্কতার কারণে সে সময় অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয় এবং কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ওই জবাব ছিল বড় যুদ্ধ এড়িয়ে শক্ত অবস্থান জানানোর কৌশল।

একই ধরনের চিত্র দেখা যায় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে। বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার পাঁচ দিন পর ইরান ইরাকে অবস্থিত আইন আল-আসাদ মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। সেবারও এই হামলার আগাম সতর্কতা ছিল। ফলে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। তবে ওই ঘাঁটিতে উপস্থিত ছিলেন, এমন বহু মার্কিন সেনা পরে মস্তিষ্কে আঘাতজনিত সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন। তখনো ধারণা করা হয়েছিল, তেহরান উত্তেজনা কমানোতেই আগ্রহী।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। ১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইরান এখন সবচেয়ে গুরুতর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটিতে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা দমন করতে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক সহিংসতা চালায়। মানবাধিকার সংগঠন ও দেশটির ভেতরের চিকিৎসাকর্মীদের মতে, কয়েক হাজার মানুষ নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন, আহত বা আটক হয়েছেন আরও অনেকে। টানা ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রকৃত সংখ্যা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ইরানের সরকার এসব মৃত্যুর দায় অস্বীকার করে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ ও ইসরায়েলকে দায়ী করছে।

জানা গেছে, বর্তমানে ইরানে বিক্ষোভের তীব্রতা কিছুটা কমে এলেও পুরোপুরি থামেনি। সামাজিক ক্ষোভ রয়ে গেছে আর শাসকগোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব বিরল মাত্রায় পৌঁছেছে। জানুয়ারির ৮ ও ৯ তারিখে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের কাছে কয়েকটি শহরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল—যা সরকারকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করা হলেও অত্যন্ত বিস্ফোরক অবস্থায় রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ধরন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমিত মাত্রায় হামলা চালিয়ে ওয়াশিংটন যদি সামরিক সাফল্যের দাবি করে, তবে ইরান সরকার এই ইস্যুকে ব্যবহার করে নতুন করে দমন-পীড়ন চালাতে পারে। আবার বড় পরিসরের মার্কিন হামলা ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যার প্রভাব গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।

এ কারণেই তেহরানের ভাষ্য দিন দিন কঠোর হচ্ছে। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—হামলার মাত্রা যা-ই হোক, সেটিকে যুদ্ধ হিসেবে দেখা হবে। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোসহ ইসরায়েলও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

উভয় পক্ষই জানে, ভুল হিসাবের মূল্য ভয়াবহ হতে পারে। আগের মতো প্রতীকী ও বিলম্বিত জবাব ইরানের কাছে আর যথেষ্ট নাও মনে হতে পারে। কিন্তু দ্রুত প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে এমন সংঘাতে ঠেলে দিতে পারে, যার খেসারত দেবে লাখো সাধারণ মানুষ ও পুরো অঞ্চল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত