
দীর্ঘদিন ধরে ধেয়ে আসা জনসংখ্যাগত বিপর্যয় এখন সরাসরি আঘাত হানতে শুরু করেছে চীনের অর্থনীতি ও বাজারে। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান মার্টিন ক্যাপিটালের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও রড ডি. মার্টিন সম্প্রতি দাবি করেছেন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিটি এমন এক বিপজ্জনক বিন্দু অতিক্রম করেছে, যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, চীনের এই জনসংখ্যার সংকট এখন ‘গাণিতিকভাবে অপরিবর্তনশীল’ এবং এটি সময়ের ব্যবধানে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ভোক্তা বাজার এবং বিশ্বমঞ্চে পরাশক্তি হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করে দেবে।
চীনের সরকারি তথ্য বলছে, প্রায় ১৪০ কোটি (১.৪ বিলিয়ন) জনসংখ্যার সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছানোর পর ইতিমধ্যেই দেশটির জনসংখ্যা সংকুচিত বা কমতে শুরু করেছে। এখন প্রতি বছর জন্মের চেয়ে মৃত্যুর হার বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জন্মহার কমে যাওয়ার গতি ছিল ভয়াবহ। ২০১০-এর মাঝামাঝিতেও চীনে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশু জন্মাত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে এক কোটিরও নিচে। এটি গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ইতিহাসে সর্বনিম্ন জন্মহার।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, জনসংখ্যা হ্রাসের এই গতি ভবিষ্যতে আরও ত্বরান্বিত হবে। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্টস-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ হিসাব বজায় থাকলেও ২১০০ সালের মধ্যে চীনের জনসংখ্যা বর্তমানের তুলনায় প্রায় অর্ধেক হয়ে যেতে পারে।
রড ডি. মার্টিন এই পরিস্থিতিকে সাময়িক কোনো সমস্যা হিসেবে দেখছেন না। তাঁর মতে, এটি একটি স্থায়ী কাঠামোগত ভাঙন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা এক নোটে তিনি বলেন, ‘চীনের জনসংখ্যাগত এই ধস এখন গাণিতিকভাবে অপরিবর্তনশীল। কারণ, দেশটিতে সন্তান জন্মদানের বয়সী পর্যাপ্ত নারীই আর অবশিষ্ট নেই।’ ইউরোপ বা জাপানের মতো দেশে জনসংখ্যা হ্রাসের প্রক্রিয়াটি ছিল ধীর গতির, কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের গতি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ বলে মনে করছেন তিনি।
মার্টিনের এই গাণিতিক তত্ত্বের মূলে রয়েছে ১৯৮০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বেইজিংয়ের কঠোরভাবে চাপিয়ে দেওয়া ‘এক সন্তান নীতি’। জনসংখ্যাবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন, এই নীতি উর্বরতার হারকে নামিয়ে দিয়েছে। তরুণ প্রজন্মকে সংকুচিত করেছে এবং লিঙ্গ নির্বাচনে গর্ভপাতের কারণে নারী-পুরুষের অনুপাতে বিশাল বৈষম্য তৈরি করেছে। পুত্রসন্তানের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে লাখ লাখ কন্যাসন্তান পৃথিবীতে আসতেই পারেনি। এই কৃত্রিম বৈষম্যই এখন সরাসরি আঘাত হানছে চীনের শ্রমবাজার, বিয়ে এবং নতুন পরিবার গঠনের ক্ষেত্রে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্টিন লিখেছেন, বর্তমানে যাঁদের সন্তান জন্মদানের বয়স, তারা নিজেরাই সেই ‘এক সন্তান নীতি’র সময় জন্ম নেওয়া সংকুচিত প্রজন্ম। প্রতিটি প্রজন্ম তার আগের প্রজন্মের ঘাটতিকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আপনি এমন নারীদের ওপর ভর্তুকি বা প্রণোদনা দিতে পারবেন না, যাদের জন্মই হয়নি।
বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে চীনকে এখন পূর্ব এশিয়ার ‘আলট্রা-লো ফার্টিলিটি’ বা অতি-নিম্ন জন্মহারের দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টার ও জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে চীনের জনসংখ্যা কমে মাত্র ৬৩ কোটি ৩০ লাখে নামতে পারে। আর মার্টিনের মতো অতি-শঙ্কাবাদী বিশ্লেষকদের মতে, এই শতাব্দীর শেষে চীনের জনসংখ্যা মাত্র ৩০ কোটিতে ঠেকবে—যা এর সর্বোচ্চ চূড়ার চেয়ে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কম।
বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় চিন্তার বিষয় হলো, এই জনসংখ্যা হ্রাস চীনের প্রবৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ বাজারকে গ্রাস করবে। একসময়ের তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এবং কম নির্ভরশীল জনসংখ্যার ওপর ভর করে চীন সস্তা উৎপাদন ও অবকাঠামোগত বিপ্লব ঘটিয়েছিল। সেই সোনালি দিন বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ এখন শেষ।
চীনে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ইতিমধ্যেই সর্বোচ্চ চূড়া পার করে এখন ক্রমাগত কমছে। বিপরীতে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, কর্মক্ষম মানুষের তুলনায় নির্ভরশীল মানুষের অনুপাত চীনে ঊর্ধ্বমুখী।
এর সামষ্টিক অর্থনৈতিক ফলাফলকে মার্টিন সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে—‘একটি সংকুচিত কর্মীবাহিনী, ধসে পড়া করদাতার সংখ্যা, অবসরপ্রাপ্তদের বোঝা এবং একটি ফাঁকা হয়ে যাওয়া ভোক্তা বাজার। এটি কেবল একটি জনসংখ্যাগত সংকট নয়, এটি আসলে চীনের পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্নের সমাধি।’
এদিকে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইজিং জন্মনিয়ন্ত্রণের সব বিধি-নিষেধ তুলে নিয়েছে, বড় পরিবার গঠনে উৎসাহিত করছে এবং বাবা-মাকে নানাবিধ সহায়তা দিচ্ছে। সি চিনপিংয়ের সরকার দম্পতিদের নগদ অর্থ বোনাস, আবাসন ও শিক্ষা উপবৃত্তি, মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি এবং এমনকি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ওপর থেকে কর ছাড়ের সুবিধা বাতিল করার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।
কিন্তু এত সব সরকারি প্রচারণাও তরুণদের মন গলাতে পারেনি। চীনের শহুরে তরুণদের ওপর করা জরিপ বলছে—অতিরিক্ত আবাসন খরচ, শিক্ষা খাতে তীব্র প্রতিযোগিতা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং ডে-কেয়ারের অভাবে তারা বিয়ে ও সন্তান নিতে ভয় পাচ্ছে। ফলে এটি এখন আর কোনো নীতিগত বাধা নয়, বরং চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর ভেতরেই এই অনীহা গেঁথে গেছে, যা সহজে সমাধান করা অসম্ভব।
চীনের এই জনসংখ্যাগত মোড় পরিবর্তন বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ওলটপালট ঘটাবে।
প্রথমত, প্রবৃদ্ধির সীমা। সংকুচিত কর্মীবাহিনীর কারণে চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধি একটি নির্দিষ্ট সীমায় আটকে যাবে, ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো চীনের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ইতিমধ্যেই কমিয়ে দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ভোগ্যপণ্যের বাজার ধস। নতুন পরিবার গঠন ও জন্মহার কমলে আবাসন খাত, শিক্ষা এবং সাধারণ ভোগ্যপণ্যের বাজারে বড় ধাক্কা লাগবে।
তৃতীয়ত, সাপ্লাই চেইন স্থানান্তর। শ্রমিকের অভাব ও মজুরি বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের বড় বড় কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদন কারখানা চীন থেকে সরিয়ে ভারত, ভিয়েতনাম, মেক্সিকো এবং আফ্রিকার মতো তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশগুলোতে নিয়ে যাচ্ছে।
চতুর্থত, ভূরাজনীতি। সামরিক ও প্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টেক্কা দেওয়া চীনের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ, একটি বয়োবৃদ্ধ ও অর্থনৈতিকভাবে চাপে থাকা দেশের পক্ষে বিশাল প্রতিরক্ষা ব্যয় ধরে রাখা এবং আমেরিকার সঙ্গে ব্যবধান ঘোচানোর মতো প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। রড মার্টিনের ভাষায়—‘জনমিতিই হলো নিয়তি’।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের মিডল্যান্ড শহরে এক বন্দুকধারীর এলোপাতাড়ি গুলিতে অন্তত একজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা গোলাগুলির পর সন্দেহভাজন হামলাকারীও নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ...
৫ ঘণ্টা আগে
চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান একটি চূড়ান্ত চুক্তির ‘একেবারে কাছাকাছি’ পৌঁছাতে পেরেছে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। আজ শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে...
৬ ঘণ্টা আগে
বলিউড সুপারস্টার সালমান খানের পানভেল ফার্মহাউসের প্রতিবেশী কেতন কাক্করের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা মানহানিকর বক্তব্য অবিলম্বে মুছে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন বোম্বে হাইকোর্ট। গতকাল বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সম্পত্তি নিয়ে একটি পুরোনো মামলার শুনানিতে আদালত এই রায়...
৯ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর এক কূটনীতিক এবং এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে কোনো টোল ছাড়াই খুলে দেওয়া হবে....
১৩ ঘণ্টা আগে