Ajker Patrika

আলোচনায় ‘অখণ্ড কংগ্রেস’, মমতা–পাওয়ারসহ দলত্যাগীদের ফেরার গুঞ্জন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আলোচনায় ‘অখণ্ড কংগ্রেস’, মমতা–পাওয়ারসহ দলত্যাগীদের ফেরার গুঞ্জন
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শারদ পাওয়ারের মতো সাবেক কংগ্রেস নেতারা দলে ফিরতে পারেন এমন গুঞ্জন দেখা যাচ্ছে ভারতের রাজনীতিতে। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির (এনসিপি-এসপি) নেতা শারদ পাওয়ারের সম্ভাব্য রাজনৈতিক অবস্থান। এই দুই নেতার কংগ্রেসে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র জল্পনা, যদিও দলীয় পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নাকচ ও সমর্থন—দুই ধরনের অবস্থানই দেখা যাচ্ছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের সংগঠন বিষয়ক সাধারণ সম্পাদক কেসি ভেনুগোপাল গতকাল বৃহস্পতিবার এই ধরনের তৃণমূল–কংগ্রেস একীভূত হওয়ার আলোচনাকে ‘ভিত্তিহীন গুজব’ বলে উড়িয়ে দেন। তবে একই সময়ে মহারাষ্ট্রের সিনিয়র কংগ্রেস নেতা নানা পাটোলে এমন মন্তব্য করেন, যা রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

নানা পাটোল দাবি করেন, ‘সমমনোভাবাপন্ন’ দলগুলো কংগ্রেসের সঙ্গে একীভূত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘শারদ পাওয়ার এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে আছেন।’ পাটোলে স্পষ্ট করেন, এটি কোনো জোট নয়, বরং সরাসরি একীভূতকরণের বিষয়।

নানা পাটোলে বলেন, এনসিপি-এসপির পক্ষ থেকে আগেই শারদ পাওয়ার একীভূতকরণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা এখনো বিভিন্ন কারণে বিলম্বিত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এনসিপির পক্ষ থেকে, পাওয়ার সাহেবের পক্ষ থেকে আগেই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কিছু কারণে তা বিলম্বিত হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভোট বিভাজন রোধের জন্য ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী আদর্শের দলগুলোর এক হওয়া জরুরি। তাঁর কথায়, ‘দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি... ভোট বিভাজন রোধ করতে... যে সব দল ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী আদর্শে বিশ্বাসী, তাদের এক হওয়া উচিত।’

পাটোলে দাবি করেন, এই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই জাতীয় স্তরে শুরু হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ‘তৃণমূল কংগ্রেস হোক বা পাওয়ার সাহেব—সবাই এখন কংগ্রেসের সঙ্গে একীভূত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন।’

রাউতের একীভূতকরণের আহ্বান

কয়েক দিন আগেই শিবসেনা (ইউবিটি) নেতা সঞ্জয় রাউত একই ধরনের মন্তব্য করেন। তিনি শারদ পাওয়ারকে আহ্বান জানান, কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গড়ে ওঠা ছোট দলগুলোকে আবার কংগ্রেসে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে। রাউত বলেন, ‘কংগ্রেসকে শক্তিশালী হতে হবে, এবং যেসব নেতারা কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে গিয়ে ছোট দল গঠন করেছেন, তাদের পরিস্থিতি বুঝতে হবে।’

এই প্রস্তাবকে ‘ভালো প্রস্তাব’ হিসেবে উল্লেখ করে এনসিপি-এসপি নেত্রী এবং শারদ পাওয়ারের কন্যা সুপ্রিয়া সুলে বলেন, সময়ই বলে দেবে ভবিষ্যতে কী হয়। তিনি ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বলেন, ‘আগে বৃষ্টি হোক, তারপর দেখা যাবে ছাতা নেব, না রেইনকোট।’

গেহলটের আহ্বান

এই রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা ও রাজস্থানের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট। তিনি ছোট দলগুলোকে আবার কংগ্রেসে ফিরে আসার আহ্বান জানান এবং রাহুল গান্ধীকে তাদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘সঞ্জয় রাউত যা বলেছেন, তাতে যুক্তি আছে। সময় এসেছে। যে সব দল কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আঞ্চলিক দল হয়েছে, তাদের আবার ফিরে আসা উচিত এবং তাঁরা আন্তরিকভাবে রাহুল গান্ধীকে নেতা হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত।’

গেহলট আরও বলেন, ‘দেশজুড়ে একটি বার্তা থাকা উচিত যে ইন্ডিয়া জোটের নেতা রাহুল গান্ধী। এই বার্তাটি পরিষ্কার হওয়া দরকার। মানুষ তখনই আপনাকে সফল করবে। তারা দেখে একদিকে নরেন্দ্র মোদীজি, আর অন্যদিকে রাহুল গান্ধীজি। যদি স্পষ্টভাবে বলা যায় যে সব দল মিলিতভাবে রাহুল গান্ধীকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করেছে, তাহলে দেশের ভোটের ধারা বদলে যাবে।’

অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

শারদ পাওয়ার এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—দুজনেই একসময় কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজস্ব আঞ্চলিক দল গঠন করেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছাড়ার পর তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। অন্যদিকে, শারদ পাওয়ার ১৯৯৯ সালে এনসিপি গঠন করেন পিএ সাংমা এবং তারিক আনোয়ারকে সঙ্গে নিয়ে। তিনি কংগ্রেস থেকে সোনিয়া গান্ধীর ‘বিদেশি বংশোদ্ভূত’ বিতর্ককে কেন্দ্র করে দলত্যাগের পর এই সিদ্ধান্ত নেন। পরে তারিক আনোয়ার আবার কংগ্রেসে ফিরে আসেন এবং বর্তমানে তিনি সাংসদ।

শারদ পাওয়ারের এনসিপি পরে বড় সংকটের মুখে পড়ে, যেমনটি বর্তমানে তৃণমূলের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। ২০২৩ সালে তাঁর ভাতিজা অজিত পাওয়ার বিদ্রোহ করে দলের বড় অংশ নিজের দিকে টেনে নেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের সমর্থনে দলের নাম ও প্রতীক নিজের দলে নিয়ে নেন। পরে তিনি মহারাষ্ট্রে ও জাতীয় স্তরে বিজেপি ও শিবসেনার সঙ্গে জোট গঠন করেন।

কংগ্রেসের অবস্থান

তৃণমূল ও কংগ্রেসের শীর্ষ পর্যায়ের দুই দফা বৈঠকের পর এই জল্পনা আরও তীব্র হয়। গত মঙ্গলবার তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর বৈঠক হয়। এরপর বুধবার তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সূত্র অনুযায়ী, প্রায় দেড় ঘণ্টার ওই বৈঠকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, তৃণমূল একটি শক্তিশালী বিরোধী জোট চায় এবং রাহুল গান্ধীর নেতৃত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত। তবে কংগ্রেস স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে যে কোনো একীভূতকরণের প্রস্তাব প্রথমে তৃণমূলের পক্ষ থেকেই আসতে হবে। দলটি কোনো চাপিয়ে দেওয়া একীভূতকরণে আগ্রহী নয়। রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন প্রশ্ন একটাই—এই গুঞ্জন কি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ভারতের বিরোধী রাজনীতির মানচিত্রে নতুন কোনো বড় পুনর্গঠনের সূচনা ঘটবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত