Ajker Patrika

সবাই পুরুষ জেনেও উড়োজাহাজে সিজেপি নেতাদের ধরতে কেন নারী পুলিশ পাঠানো হলো

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১৭: ১৭
সবাই পুরুষ জেনেও উড়োজাহাজে সিজেপি নেতাদের ধরতে কেন নারী পুলিশ পাঠানো হলো
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

ভারতের রাজধানী দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আজ শনিবার এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রস্তাবিত ‘যন্তর মন্তর ২.০’ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইট অবতরণের পরপরই ভেতরে ঢুকে দলের শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করে দিল্লি পুলিশ। তবে সবাইকে চমকে দিয়ে এই বিশেষ অভিযানে পুলিশের একটি বড় নারী দলকে উড়োজাহাজে পাঠায় স্থানীয় প্রশাসন।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যোগ দিতে দিল্লিতে আসছিলেন সিজেপি নেতারা। তবে কর্মসূচিটির কোনো অনুমতি না থাকলেও তা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণায় শহরজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলে মোদি সরকার।

পুলিশ সদস্যরা বিমানে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই উইন্ডো সিটে বসে থাকা সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে মোবাইলে ভিডিও ধারণ শুরু করেন। তাঁর পাশে মাঝের আসনে বসেছিলেন সৌরভ দাস এবং অন্য পাশে আশুতোষ রাঙ্কা। পুলিশ দেখেই তাঁরা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ও ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগান দিতে শুরু করেন।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, অন্তত এক ডজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা তাঁদের ঘিরে রেখেছেন। বিমানেই এভাবে কেন আটক করা হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অভিজিৎ দীপকে। তিনি বলেন, ‘আপনারা দেখছেন, দেশ কোন দিকে যাচ্ছে। বিমান থেকে সরাসরি আমাদের গ্রেপ্তার করতে এসেছে পুলিশ। ইন্দিরা গান্ধীর আমলেও এমন ঘটনা ঘটেনি। এটা স্রেফ একনায়কতন্ত্র।’ তিনি পুলিশকে উদ্দেশ করে আরও বলেন, ‘আমি এখানে গ্রেপ্তার হতেই এসেছি, আমাকে গ্রেপ্তার করুন।’ এ সময় নারী পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত সংযতভাবে দীপকে ও তাঁর সঙ্গীদের শান্ত থাকার এবং সহযোগিতার অনুরোধ জানান। পরে তাঁদের আলাদা আলাদা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়।

কেন নারী পুলিশ সদস্য পাঠাল দিল্লি পুলিশ

উড়োজাহাজের ভেতরে পুরুষ কর্মকর্তাদের বদলে নারী সদস্য পাঠানোর পদক্ষেপকে পুলিশের অত্যন্ত কৌশলগত একটি চাল হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছে ইন্ডিয়া টুডে।

প্রথমত, সংকীর্ণ স্থানে সংঘর্ষ এড়ানো। বিমানের ভেতরের চলাচলের পথ বা আইল অত্যন্ত সংকীর্ণ। পুরুষ পুলিশ সদস্যরা গেলে হাতাহাতি বা সামান্য বাগ্‌বিতণ্ডাও দ্রুত বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারত। ধাক্কাধাক্কি বা বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতেই নারী পুলিশ সদস্যদের সামনে রাখা হয়।

দ্বিতীয়ত, জুলাইয়ের বিতর্কের নেতিবাচক ভাবমূর্তি কাটানো। গত ২০ জুলাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা সংসদ ভবনের দিকে যাওয়ার সময় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই ঘটনার পর সিজেপির অভিযোগ ছিল—পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তারা আন্দোলনকারী তরুণী ও কিশোরীদের বেধড়ক মারধর করেছেন এবং কাপড় ছিঁড়ে ফেলেছেন।

তৃতীয়ত, জেন-জিদের সহানুভূতি ঠেকানো। সিজেপির সমর্থকগোষ্ঠীর সিংহভাগই তরুণ ও জেন-জি প্রজন্মের। তাই পুরুষ পুলিশ দিয়ে তাঁদের ওপর বলপ্রয়োগের নেতিবাচক ছবি ছড়াক, তা চায়নি প্রশাসন। নারী সদস্যদের দিয়ে অভিযান চালানোয় আন্দোলনকারীদের সেই প্রচারণার ধার অনেকটাই কমে গেছে।

দিনের শুরুতে সিজেপির আইনি সেলের প্রধান রত্না সিং এবং জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকেও নিজ নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয়। রত্না সিং দাবি করেন, তিনি গাড়িতে ওঠার পরপরই পুলিশের বেশ কয়েকটি গাড়ি তাঁকে ঘিরে ফেলে। সব মিলিয়ে দিল্লিজুড়ে ইতিমধ্যে ২ হাজারের বেশি মানুষকে প্রতিরোধমূলক হিসেবে আটক করা হয়েছে।

এদিকে সিজেপির কর্মসূচি ঘিরে গোটা দিল্লি রাতারাতি একটি সুরক্ষিত দুর্গে পরিণত হয়েছে। পুরো রাজধানীতে মেট্রোরেল ও ট্রেন চলাচলে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। দিল্লির অন্তত ৪৫টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও প্রস্থান গেট বন্ধ করা হয়েছে এবং নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে পৌঁছানোর কথা থাকা ২৫০টিরও বেশি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে।

গত শুক্রবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যাতায়াত ব্যবস্থা ও ট্রেন বন্ধে সরকারের বিরুদ্ধে নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, সিজেপির এই বিক্ষোভে যোগ দিতে এসে আটক হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং কেরালার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।

এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্রীয় দিল্লির সাউথ অ্যাভিনিউ থেকে বেশ কয়েকজন দলীয় সংসদ সদস্যসহ আটক করা হয়। পুলিশের বাধার মুখে তিনি একটি বাস স্ট্যান্ডেই ধরনায় বসে পড়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ডেরেক ও’ব্রায়েন ও দোলা সেনসহ অন্য এমপিদের সঙ্গে তাঁকে একটি পুলিশ বাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

বর্তমানে সেন্ট্রাল সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (সিএপিএফ) ২৩ হাজারের বেশি সদস্য রাজধানীজুড়ে মোতায়েন রয়েছে। এর আগে সিজেপির জুলাই মাসের আন্দোলন কিংবা ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের চেয়েও এবার বেশি নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন রাখা হয়েছে। বিক্ষোভ শুরু হওয়ার আগেই আগাম আটকের কারণে এবার শহরে বড় ধরনের সহিংসতা এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে দাবি দিল্লি পুলিশের।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত