Ajker Patrika

ইরানে আগ্রাসন: যুদ্ধ বন্ধ হলেও মূল্য দিতে হবে বিশ্বকে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরানে আগ্রাসন: যুদ্ধ বন্ধ হলেও মূল্য 
দিতে হবে বিশ্বকে
ছবি: এএফপি

ইরান যুদ্ধ নিয়ে দৃশ্যত রণে ভঙ্গ দিতে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তাঁর সম্ভাব্য এই প্রস্থান বাকি দুনিয়ার জন্য কোনো স্বস্তির খবর বয়ে আনছে না, বরং বিশ্বকে এক অনিশ্চিত গর্তে ফেলে যাচ্ছে। মার্কিন মিত্ররা যারা শুরু থেকে এই যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, ট্রাম্প এখন উল্টো তাদের ওপরই দায় চাপাচ্ছেন। তাঁর কথার সুর এমন—আগুনের আঁচ এখন বাকিদেরই নিজ দায়িত্বে সামলাতে হবে।

ট্রাম্পের এমন মনোভাবের প্রমাণ মেলে তাঁর সাম্প্রতিক এক পোস্টে। গত মঙ্গলবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, ‘নিজেদের তেল নিজেরাই সংগ্রহ করুন।’ এর আগে সিএনএনের খবরে বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত না করেই মার্কিন প্রশাসন তাদের ‘মিশন সফল’ ঘোষণা করতে যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই কথিত ‘মিশন সাকসেসফুল’ তকমা আসলে দায় এড়ানোর মোড়কমাত্র।

হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে বসে ট্রাম্প এরই মধ্যে ঘোষণা করেছেন, আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে এই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে কী ঘটবে, তার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না।’ কিন্তু বাস্তবতা হলো, পারস্য উপসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ পানিপথ এখন কার্যত ইরানের হাতের মুঠোয়। এই রুটে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে ইরান বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করে ফেলেছে। ট্রাম্প যদি এই অবস্থাতেই পিছু হটেন, তবে তা হবে ইরানের জন্য এক বিশাল কৌশলগত বিজয়।

হোয়াইট হাউস এখন নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে রীতিমতো অদ্ভুত সব দাবি করছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নাকি ইরানে ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ ঘটিয়ে ফেলেছে। অথচ সবাই জানে বাস্তবতা ভিন্ন। ট্রাম্প প্রশাসনের এই অবাস্তব দাবি আসলে ট্রাম্পের ওপর থেকে চাপ কমানোর একটি চেষ্টামাত্র।

ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরানের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনা চলছে। যদিও এমন দাবি উড়িয়ে দিয়েছে তেহরান। কোনো টেবিল বৈঠক বা কূটনৈতিক অগ্রগতির প্রমাণ ছাড়াই ট্রাম্প এসব বলে যাচ্ছেন। যদি ইরানকে হরমুজ প্রণালির শতভাগ কর্তৃত্ব দিয়ে ট্রাম্প সরে যান, তবে আন্তর্জাতিক মহলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মান বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে না। ইরান তখন এই রুট দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের চেষ্টা করবে এবং সেই অর্থ দিয়ে নিজেদের ধ্বংস হওয়া সামরিক শক্তি আর পারমাণবিক কর্মসূচি আবারও চাঙা করবে।

সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প যেকোনো হারকেও জয় হিসেবে প্রচার করতে পটু। কিন্তু হরমুজ প্রণালি জোর করে মুক্ত করতে গেলে মার্কিন সেনাদের মরতে হবে। এই ভয় তাঁকে তাড়া করছে। তাই বিশৃঙ্খলা পেছনে ফেলে চলে যাওয়াই তাঁর কাছে সহজ পথ মনে হচ্ছে। এটি হয়তো তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে প্রযোজ্য, কিন্তু বাকি বিশ্বকে বিপদে ফেলে দিচ্ছে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক রোজমেরি কেলানিক সিএনএন ইন্টারন্যাশনালকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও এটি মার্কিন ভোক্তাদের তেলের দাম থেকে রক্ষা করতে পারবে না। কারণ, তেলের দাম বিশ্ববাজারের আলোকে নির্ধারিত হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের সবাই এই সংকটে আক্রান্ত হবে। এই অর্থনৈতিক ধাক্কা বিশ্বজুড়ে এমন এক মন্দা ডেকে আনবে, যার আঁচ থেকে খোদ আমেরিকার মানুষও বাঁচবে না।

ইউরোপীয় মিত্রদের জন্য ট্রাম্পের এই নীতি বড় এক বিশ্বাসঘাতকতা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তো মিত্রদের ভূমিকাকে ‘হতাশাজনক’ বলে ধুয়ে দিয়েছেন। তিনি ভয় দেখিয়েছেন, যুদ্ধ শেষে ট্রাম্প ইউরোপের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতিগুলো ‘পুনর্বিবেচনা’ করবেন। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকার সেই সুরক্ষা ছাতা এখন ফুটো হয়ে গেছে।

ইউরোপীয় নেতারা দেখছেন, ট্রাম্পের বন্ধুত্ব এখন শর্তসাপেক্ষ। যেমন ব্রিটিশরা শুরুতে নিজেদের বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি বলে ট্রাম্প লন্ডনের সঙ্গে ‘বিশেষ সম্পর্ক’ চুকিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। ইউরোপ এখন জ্বালানি আর মুদ্রাস্ফীতির চাপে দিশেহারা। কিছু দেশ তো তেল-ডিজেল রেশনিং করার কথাও ভাবছে। এ ছাড়া ইরানে অস্থিরতা বাড়লে দেশটি ছেড়ে আসা শরণার্থীদের ঢল আছড়ে পড়বে ইউরোপের দরজায়।

ইউরোপ আসলে এই যুদ্ধে কোনোভাবেই জড়াতে চায় না। জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস গত মাসেই ক্ষোভ ঝেড়ে বলেছিলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে হাতে গোনা কয়েকটা ইউরোপীয় ফ্রিগেট থেকে কী আশা করেন, যা শক্তিশালী মার্কিন নৌবাহিনী করতে পারছে না? এটি আমাদের যুদ্ধ নয়; আমরা এটি শুরু করিনি।’

ইউরোপের এই অনীহা বা প্রতিবাদ কোনো কাজে আসছে না। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের আসল চেহারাটা এখানেই ফুটে উঠছে। এশিয়া থেকে ইউরোপ বা আফ্রিকা—কোটি কোটি মানুষ ট্রাম্পকে ভোট দেননি, তাঁর কোনো সিদ্ধান্তে তাঁদের মতামত নেওয়া হয়নি। অথচ সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারের একজন মানুষের জেদ আর সিদ্ধান্তের চরম মূল্য এখন পুরো পৃথিবীর মানুষকে মেটাতে হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

প্রাথমিকেও চালু হচ্ছে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাস

বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতিতে আমরা কষ্ট পেয়েছি: ইরানি রাষ্ট্রদূত

২০২৬ সালের ঈদুল আজহা কবে, যা জানা গেল

কিশোরগঞ্জে যুবদল নেতার হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

‘ওকে লাথি মেরে বের করে দিন’—নেতানিয়াহুর ছেলেকে যুদ্ধে পাঠাতে বললেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত