Ajker Patrika

সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে, শিক্ষায় আমূল সংস্কারের পথে চীন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে, শিক্ষায় আমূল সংস্কারের পথে চীন
চীনে এখন প্রয়োজন ও সক্ষমতার ভিত্তিতে সব শিক্ষার্থীই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে। ছবি: সিনহুয়া

জনসংখ্যা হ্রাস, পরিবর্তনশীল শ্রমবাজার এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে চীন। নতুন এই নির্দেশিকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একঘেয়ে বা একই ধরনের কাঠামোর বাইরে গিয়ে নিজস্ব বিশেষায়িত ভূমিকা ও স্বকীয়তা গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি এবং দেশটির মন্ত্রিপরিষদ—স্টেট কাউন্সিল যৌথভাবে উচ্চশিক্ষা সংস্কারের এই নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অবশ্যই ‘শিক্ষার্থীদের বয়সী জনসংখ্যার পরিবর্তনশীল প্রবণতার’ সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।

বেইজিংয়ের নতুন এই নির্দেশনায় চীনের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্পষ্ট কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে তাদের মূল কাজ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে:

উচ্চমানের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়: জাতীয় কৌশলগত গবেষণা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে চীনের স্বনির্ভরতা অর্জনে ভূমিকা রাখবে।

প্রায়োগিক বিশ্ববিদ্যালয়: আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে মেধার ঘাটতি কমানোর দিকে নজর দেবে।

কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়: আধুনিক শিল্প ব্যবস্থার উপযোগী দক্ষ কারিগর ও কারিগরি জনশক্তি তৈরি করবে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, বাস্তব অবদান ও বিশেষ সুবিধার ওপর ভিত্তি করে আলাদা আর্থিক সুবিধা ও প্রণোদনা কাঠামোর ব্যবস্থা করা হবে।

সংবাদ সংস্থাগুলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাংহাইয়ের টংজি ইউনিভার্সিটির শিক্ষা মূল্যায়ন গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ফ্যান শিউদি বলেন, ‘অতীতে চীনের প্রায় সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানই সেরা মানের সর্বজনীন গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। তবে সব শিক্ষার্থীর একাডেমিক দক্ষতা সমান নয় এবং প্রত্যেকের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা আলাদা।’

তিনি আরও বলেন, ‘অতীতে উচ্চশিক্ষা যেখানে সীমিত সংখ্যক মানুষের জন্য ছিল, এখন সেখানে সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষা কাঠামোকে পরিবর্তিত জনসংখ্যার গতিপ্রকৃতির সঙ্গে মেলাতেই হবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একটি একক ধাঁচে চালনা করার যে চেষ্টা ছিল, তা বন্ধ করে বৈচিত্র্যময় মেধা তৈরি করা এখন সরকারের শীর্ষ অগ্রাধিকারের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

প্রভাবশালী এই সংস্কারের নেপথ্যে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে চীনের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন। বিভিন্ন জাতীয় আদমশুমারির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চীনে প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত কমছে।

বেইজিং নর্মাল ইউনিভার্সিটির গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে চীনে মোট শিক্ষার্থীদের বয়সী (বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া) জনসংখ্যা ছিল ৩২ কোটি ৮০ লাখ। ২০৩৫ সালের মধ্যে এটি কমে ২৫ কোটিতে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণদের বয়সীদের সংখ্যা ২০৩২ সালের পর থেকে দ্রুত কমতে শুরু করবে।

অথচ গত এক দশকে চীনে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশটিতে মোট ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৮৭ লাখে, যার ফলে মোট ভর্তির হার ৬১ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে—যা ২০১২ সালের ৩০ শতাংশের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এত বিশাল আকারের একটি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা কেবল একটি একক মডেলে চলতে পারে না। নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদা বৈশিষ্ট্য অর্জনে উৎসাহ দিতে হবে।

টংজি ইউনিভার্সিটি ও ফুদান ইউনিভার্সিটির কয়েকজন সিনিয়র নীতি-গবেষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন, চীনে জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে, কড়া প্রতিযোগিতা ও কঠিন শ্রমবাজারের কারণে জনশক্তি ব্যবহারের ধরন বদলাতে বাধ্য হচ্ছে এবং শিল্প আধুনিকায়ন নতুন দক্ষতার দাবি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নির্দেশিকাটির প্রধান উদ্দেশ্য হলো—শিক্ষার্থী সংকট প্রবল হওয়া, বাজেট কমে যাওয়া এবং গ্র্যাজুয়েটদের বেকারত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার পর বাধ্য হয়ে পরিবর্তন আনার চেয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এখনই স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজেদের ঢেলে সাজানোর সরকারি নীতিগত সুযোগ নিশ্চিত করা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত