Ajker Patrika

হরমুজে মার্কিন ড্রোন কুপোকাত: ইরানের নতুন অস্ত্র আরাশ-ই-কামাঙ্গীর’ সম্পর্কে যা জানা যায়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৯ মে ২০২৬, ১৮: ৫১
হরমুজে মার্কিন ড্রোন কুপোকাত: ইরানের নতুন অস্ত্র আরাশ-ই-কামাঙ্গীর’ সম্পর্কে যা জানা যায়
পারস্য উপকথায় আরাশ নামের তিরন্দাজের কথা আছে। ছবি: এক্স

চলতি সপ্তাহের শুরুতে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, এই অভিযানে প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হয়েছে সম্পূর্ণ স্থানীয় প্রযুক্তিতে তৈরি নতুন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘আরাশ-ই-কামাঙ্গীর’।

তবে ইরান এই দাবি করলেও এখন পর্যন্ত মার্কিন সামরিক বাহিনী বা অন্য কোনো স্বাধীন আন্তর্জাতিক সূত্র থেকে ড্রোন ভূপাতিত হওয়া কিংবা নতুন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহারের এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।

ইরানের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের আকাশসীমা ও সামুদ্রিক সীমানা রক্ষার এক অভিযানে কিশ দ্বীপের কাছাকাছি হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে একেকটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের মূল্য ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ৩ কোটি মার্কিন ডলার।

ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সামরিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, একটি গোপন ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে, যা ইরানের পক্ষ থেকে শত্রুদের প্রতি একটি স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট বার্তা।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি তেহরানের এই দাবি সত্য হয়, তবে এটি হবে পারস্য পুরাণের কিংবদন্তি তিরন্দাজ ‘আরাশ’-এর নামানুসারে রাখা এই আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রথম সফল যুদ্ধকালীন ব্যবহার। একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত করবে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা ও সংঘাতের মধ্যেও তেহরান মার্কিন বা ইসরায়েলি হামলা প্রতিহত করার মতো সামরিক সক্ষমতা বজায় রেখেছে।

ইরানের দাবি কতটা বাস্তবসম্মত

নিরাপত্তা ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই দাবিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। অতীতেও ইরানের সামরিক বাহিনী এমন অনেক প্রযুক্তিগত অগ্রগতির দাবি করেছে, যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা একই সঙ্গে মনে করেন, এই দাবির পেছনে যে সামরিক কৌশল রয়েছে, তা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।

লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা গবেষণা বিভাগের সিনিয়র লেকচারার মার্ক হিলবর্ন আল জাজিরাকে বলেন, ইরান নিজস্ব প্রযুক্তিতে বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরিতে বেশ স্বনির্ভর হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের মতো তারাও আধুনিক যুদ্ধের অর্থনৈতিক সমীকরণ বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে চতুরতার পরিচয় দিচ্ছে।

হিলবর্ন আরও যোগ করেন, তুলনামূলক সস্তা ও সহজ প্রযুক্তির ব্যবস্থাগুলো দিয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও জটিল সামরিক সরঞ্জামকে (যেমন মার্কিন ড্রোন) সহজেই ঝুঁকিতে ফেলা সম্ভব।

ইরানের রাজধানী তেহরানে সাদাবাদ প্যালেস কমপ্লেক্সে স্থাপিত কিংবদন্তি তিরন্দাজ আরাশের ভাস্কর্য। ছবি: এক্স
ইরানের রাজধানী তেহরানে সাদাবাদ প্যালেস কমপ্লেক্সে স্থাপিত কিংবদন্তি তিরন্দাজ আরাশের ভাস্কর্য। ছবি: এক্স

কী এই ‘আরাশ-ই-কামাঙ্গীর’

ফারসি লোকগাথা অনুযায়ী, ‘আরাশ’ ছিলেন এমন এক বীর, যিনি তির ছুড়ে ইরান ও মধ্য এশিয়ার সীমানা নির্ধারণ করেছিলেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই নতুন ইন্টারসেপ্টর ব্যবস্থাটি হয়তো রাতারাতি তৈরি কোনো জাদুকরী অস্ত্র নয়, বরং ইরানের মোবাইল (সহজে স্থানান্তরযোগ্য) ও স্বল্প ব্যয়ের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থারই একটি ধারাবাহিক উন্নয়ন।

প্রথাগত বিমান-বিধ্বংসী ব্যবস্থাগুলো সাধারণত বড় রাডার স্টেশন ও ফিক্সড লঞ্চ প্যাডের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় প্রতিপক্ষের নজরদারিতে সহজেই ধরা পড়ে যায়। কিন্তু ছোট ও মোবাইল ব্যবস্থাগুলো দ্রুত লুকিয়ে ফেলা, স্থানান্তর করা এবং ধ্বংস হলে সহজে প্রতিস্থাপন করা যায়।

নিউইয়র্কভিত্তিক স্ট্র্যাটেজিক ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্ম হরাইজন এনগেজের নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যালেক্স আলমেদা বলেন, ‘আমার ধারণা, এটি ইরানের স্বল্পপাল্লার বা লয়টারিং সারফেস-টু-এয়ার (এসএএম) অস্ত্রের একটি উন্নত সংস্করণ। এটি প্রথাগত রাডারের ওপর নির্ভর না করে সম্ভবত ইলেকট্রো-অপটিক্যাল বা হিট-সিকিং (তাপ অনুসন্ধানকারী) প্রযুক্তির সাহায্যে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে। এটি মূলত একটি ’‘পপ-আপ’’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, যা দ্রুত স্থাপন ও উৎক্ষেপণ করা যায়।’

এমকিউ-৯ রিপারের মতো ড্রোনগুলো মূলত দীর্ঘ সময় ধরে আকাশে থেকে নজরদারি চালানোর জন্য ডিজাইন করা হয়। গতি অত্যন্ত ধীর হওয়ায় এগুলো এ ধরনের মোবাইল প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

প্যারিসের সায়েন্সেস পো ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রাজিউস্কি আল জাজিরাকে বলেন, ইরানের দীর্ঘ ও মাঝারি পাল্লার শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। তবে এই মোবাইল ব্যবস্থাগুলোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এদের দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায়।

প্রকাশিত ভিডিওর দিকে ইঙ্গিত করে নিকোল গ্রাজিউস্কি বলেন, ‘ভিডিও দেখে মনে হচ্ছে, ড্রোনটি তুলনামূলক কম উচ্চতায় উড়ছিল, ফলে এটিকে ভূপাতিত করা সহজ। তবে এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইরানের এখনো শক্তিশালী প্রতিরক্ষামূলক প্রতিরোধক্ষমতা রয়েছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত