Ajker Patrika

ইরাকের তেল বিক্রির টাকা ২৩ বছর ধরে যাচ্ছে মার্কিন ফেডারেল ব্যাংকে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরাকের তেল বিক্রির টাকা ২৩ বছর ধরে যাচ্ছে মার্কিন ফেডারেল ব্যাংকে
ছবি: সংগৃহীত

ইরাকে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো থেকে আজ বুধবার শেষ মার্কিন সেনারা সরে যাওয়ার কথা। ইরান এবং ইরানের মিত্রদের কাছে এই ঘটনা এক ধরনের বিজয়। কারণ, ইরাকে তাদের গভীর প্রভাব রয়েছে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আগ্রাসন চালানোর পর দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে কয়েক লাখ ইরাকি এবং মাত্র প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসনের পর থেকেই দেশটির তেল বিক্রি থেকে পাওয়া ডলারের ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। এর ফলে বাগদাদের ওপর ওয়াশিংটন অসাধারণ মাত্রার প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। এর প্রভাব ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে সম্পর্কিত বৃহত্তর আঞ্চলিক সমীকরণেও পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ইরাকের তেল রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ করে

এর মূল ভিত্তি হলো নিউইয়র্কে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের মাধ্যমে ইরাকের তেল থেকে পাওয়া অর্থ পরিচালনা করা। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন প্রোভিশনাল অথরিটি (সিপিএ) ইরাকের জন্য ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর ইরাক (ডিএফআই) নামে একটি তহবিল গঠন করে। এই তহবিল রাখা হয় নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে। এর উদ্দেশ্য ছিল ইরাকের তেল বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ সংগ্রহ করা এবং তা পুনর্গঠন ও উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা।

এই তহবিলের আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল সাদ্দাম হোসেনের শাসনামল-সংক্রান্ত মামলা, ঋণদাতাদের দাবি এবং অন্যান্য আইনি দাবির হাত থেকে ইরাকের তেল রাজস্ব সুরক্ষা দেওয়া। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। এরপর থেকে প্রতিটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট সেই নির্বাহী আদেশ নবায়ন করে আসছেন।

পরে ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর ইরাক নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে থাকা ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (সিবিআই) একটি হিসাবে পরিণত হয়। আজও সেই ব্যবস্থাই বহাল রয়েছে।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরাকের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কী ধরনের প্রভাব তৈরি হয়

ইরাকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজস্বের উৎস হলো তেল। দেশটির রাষ্ট্রীয় বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে তেল থেকে। ফলে ইরাকের তেল রাজস্ব ও ডলার প্রবাহের ওপর প্রভাব রাখার মাধ্যমে ওয়াশিংটন দেশটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

২০২০ সালে ইরাকি সরকার যখন ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল, তখন ওয়াশিংটন ইরাককে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে থাকা অর্থে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। শেষ পর্যন্ত বাগদাদ সেই অবস্থান থেকে পিছিয়ে আসে।

অধিকৃত ইরাকের প্রথম দিকের বছরগুলোর তুলনায় এখন ইরাক তার নিজস্ব আর্থিক বিষয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তারপরও এই আর্থিক সংযোগটি দেখিয়ে দেয় যে, ইরাক তার সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করলেও দেশটির অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এখনও রয়ে গেছে।

এত দীর্ঘ সময় ধরে কেন এই ব্যবস্থা টিকে আছে কেন

ইরাকি সরকারি কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেছেন, এই ব্যবস্থা ইরাকের আর্থিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করেছে। তাদের মতে, এই ব্যবস্থার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে।

প্রথমত, এটি ইরাকের তেল রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর আন্তর্জাতিক আস্থা বাড়ায়। দ্বিতীয়ত, এটি ইরাককে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলার সংগ্রহে তুলনামূলক সহজ প্রবেশাধিকার দেয়। তৃতীয়ত, এটি ঋণদাতাদের দাবি, মামলা-মোকদ্দমা এবং বিভিন্ন ধরনের আর্থিক ধাক্কা থেকে ইরাকের তেল রাজস্বকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।

এদিকে দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদের হারও বেড়েছে। ৩০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ফলন ৫ দশমিক ৬ শতাংশেরও বেশি হয়েছে। ইরাকি কর্মকর্তাদের মতে, নিউইয়র্ক ফেডের সঙ্গে এই আর্থিক ব্যবস্থা ইরাকের মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে এবং দেশটির অর্থনীতির ওপর আস্থা ধরে রাখতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে এটি ইরাকের নিজস্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকেও সহায়তা করে।

এই ব্যবস্থা ইরাকি সরকারকে ইরান-ঘনিষ্ঠ কিছু গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগের সুযোগ দেয়। এসব গোষ্ঠী ইরাকের ডলারের প্রবেশাধিকার আরও শিথিল করার দাবি করে আসছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ইরানি অর্থ পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে ইরাকের কয়েকটি ব্যাংক ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

এই ব্যবস্থা ইরাকের ওপর কী প্রভাব ফেলেছে?

মার্কিন ডলারের সরবরাহের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে ইরাকে একটি সমান্তরাল বা অনানুষ্ঠানিক ডলার বাজার তৈরি হয়েছে। এর ফলে ইরাকি কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত সরকারি বিনিময় হার এবং কালোবাজারে প্রচলিত ডলারের দামের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

এই দামের পার্থক্য মূলত আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে লেনদেন করার ঝুঁকির অতিরিক্ত মূল্য বা ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’ হিসেবে কাজ করে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে ইরানের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি অনুসরণ করছেন। এই পরিস্থিতিতে ইরাক প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের মাঝখানে পড়ে যাচ্ছে। কারণ, ইরান ইরাককে তার অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ‘ফুসফুস’ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প যে যুদ্ধ শুরু করেন, তা বাগদাদের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করেছে।

বর্তমানে ইরাকের তেল রাজস্ব ব্যবস্থাপনার অবস্থা কী?

ইরাকের তেল বিক্রি থেকে পাওয়া রাজস্ব এখনও নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের হেফাজতে রয়েছে। ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঐতিহাসিকভাবে ডলার সরবরাহের প্রধান ব্যবস্থা হিসেবে ডলার নিলাম, যার আনুষ্ঠানিক নাম ফরেন কারেন্সি উইন্ডো ব্যবহার করে এসেছে। এই ব্যবস্থায় বেসরকারি ব্যাংক ও মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদিন ইরাকি দিনার ব্যবহার করে মার্কিন ডলার কেনার জন্য দরপত্র বা বিড করতে পারত।

তবে ইরাক ২০২৫ সালের শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ডলার নিলাম ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য চাপ ছিল। এই পরিবর্তন ছিল ইরাকের ডলার সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে একটি বৃহত্তর অভিযানের অংশ। মূল লক্ষ্য ছিল ডলার পাচার করে নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত পক্ষগুলোর কাছে, বিশেষ করে ইরানের কাছে, অর্থ পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত