Ajker Patrika

যুদ্ধের আড়ালে টিকটকে মার্কিন তরুণ সেনাদের ‘ডার্ক হিউমার’

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
যুদ্ধের আড়ালে টিকটকে মার্কিন তরুণ সেনাদের ‘ডার্ক হিউমার’
ছবি: দ্য গার্ডিয়ানের সৌজন্যে

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের আবহে মার্কিন তরুণ সেনাদের এক নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে। যেখানে প্রথাগত গাম্ভীর্যের বদলে জায়গা করে নিয়েছে বিদ্রূপ, ‘ডার্ক হিউমার’ এবং অনিশ্চয়তার ব্যক্তিগত বয়ান। অনেক নতুন সেনা যুদ্ধের মাঝপথে বা যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া নিয়ে নিজেরাই কৌতুক করছেন।

টিকটকে ‘মিলিটারি-টক’ (#MilitaryTok) হ্যাশট্যাগটি এখন ব্যাপক জনপ্রিয়। ন্যাশনাল গার্ডের এক নারী সদস্য সেখানে লিখেছেন, ‘যুদ্ধের মধ্যে সেনাবাহিনীতে যোগ দিচ্ছি। কারণ আমি একজন #youngho (শর্টকাটে সুযোগ সন্ধানকারী)।’ অন্য একজন লিখেছেন, তিনি ‘YOLO’ (তুমি একবারই বাঁচো) কথাটিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছেন।

অনেকে ২০০৫ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের নাটক ‘জারহেড’-এর সংলাপ ব্যবহার করে নিজেদের ‘নির্বোধ’ বলে ঠাট্টা করছেন, যাঁরা কেবল আবাসন ভাতার জন্য চুক্তিতে সই করেছেন।

তবে হাসি-তামাশার বাইরেও অনেকে তাঁদের আবেগঘন মুহূর্ত শেয়ার করছেন। সেনাবাহিনীর এক সদস্য লিখেছেন, সামনেই তাঁর ‘ডেপ্লয়মেন্ট’ বা যুদ্ধক্ষেত্রে যাত্রা, আর এ সময়ে তিনি কেবল তাঁর শিশুসন্তানের কথা ভাবছেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে প্রথম মার্কিন ড্রোন হামলার পর এক নারী সেনা তাঁর মায়ের উৎকণ্ঠার কথা জানিয়ে লেখেন, ‘খবর দেখার সময় মায়ের মনের ভেতর ভয়ের সাইরেন বাজছিল, কারণ তিনি জানেন তাঁর মেয়ে সেনাবাহিনীতে আছে।’

মার্চের এই সহিংস সময়ে ‘দ্য ভিলেজ পিপল’-এর ডিসকো গান ‘ইন দ্য নেভি’ টিকটকে ভাইরাল হয়েছে। গানের একটি অংশ—‘সাবমেরিনে আমি কী করব?’ এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেক সেনা নাচছেন বা অভিনয় করছেন, যা সম্ভবত তাঁদের অভ্যন্তরীণ দ্বিধাকেই প্রকাশ করছে। ৫৫ হাজারেরও বেশি লাইক পাওয়া একটি ভিডিওতে এক মেরিন সদস্যকে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখা গেছে, যার ক্যাপশন ছিল, ‘যখন তারা আমাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর কথা বলে।’

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (ডিওডি) বুঝতে পেরেছে, জাঁকজমকপূর্ণ বিজ্ঞাপনের চেয়ে টিকটক ইনফ্লুয়েন্সারদের পোস্ট তরুণদের বেশি আকৃষ্ট করে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে। সেনারা অনেক সময় এমন কিছু শেয়ার করেন, যা সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কৌশলের সঙ্গে মেলে না।

যদিও ২০২২ সালে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল, তবে ২০২৫ সালের মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের রিক্রুটমেন্ট লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। মজার বিষয় হলো, এই জোয়ারে পুরুষদের চেয়ে নারীরা এগিয়ে (নারীদের রিক্রুটমেন্ট বেড়েছে ১৮ শতাংশ, পুরুষদের ৮ শতাংশ)। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সেনাবাহিনীর প্রতি তরুণদের ইতিবাচক মনোভাব ৪৬ শতাংশ থেকে কমে ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, জেনারেশন জেডের ৩৪ শতাংশই ইরান যুদ্ধের ঘোরবিরোধী।

সেনাবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী, কর্মকর্তারা অনলাইনে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, তবে তা ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে উল্লেখ করতে হয়। কিন্তু টিকটকের এই ব্যক্তিগত বয়ান অনেক সময় ‘অপারেশন সিকিউরিটি’ বা সামরিক গোপনীয়তা ভঙ্গের ঝুঁকি তৈরি করছে। যেমন সান ডিয়েগোর এক স্ট্রিপার এবং ইনফ্লুয়েন্সার ‘চার্ম ডেজ’ ভাইরাল হয়েছেন এই দাবি করে, তাঁর ক্লাবে আসা সেনারা বিষণ্ন এবং তারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো আনন্দ করতে এসেছে।

পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লিসা এলেন সিলভেস্ট্রি বলেন, ‘টিকটক একটি স্বীকারোক্তির জায়গা হয়ে উঠেছে। সেনারা এখানে নিজেদের মানবিক দিকগুলো প্রকাশ করছে, যা হয়তো সেনাবাহিনী পছন্দ করবে না। কারণ তালিকাভুক্ত হওয়ার মুহূর্ত থেকেই তাঁদের ব্যক্তিগত সত্তা বিসর্জন দিয়ে আদেশ মানার কথা বলা হয়।’

মার্চের শুরুতে টিকটকে তিন সেনার একটি নাচের ভিডিওর নিচে ক্যাপশন ছিল—‘আমেরিকা চিন্তা করো না, আমরা আসছি রক্ষা করতে।’ সেখানে একজন নাগরিকের মন্তব্য ছিল—‘যদি নাচের লড়াইও হয়, তবুও আমাদের কপালে দুঃখ আছে।’ এই মন্তব্যটিই মূলত বর্তমান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনগণের হতাশা ও নিরাশাবাদকে ফুটিয়ে তুলেছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত