Ajker Patrika

ওবামার নামে ইসরায়েলি লবির কোটি ডলারের বিজ্ঞাপন, মিশিগানে বিভক্ত ডেমোক্র্যাট শিবির

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ২০: ৩৭
ওবামার নামে ইসরায়েলি লবির কোটি ডলারের বিজ্ঞাপন, মিশিগানে বিভক্ত ডেমোক্র্যাট শিবির
বারাক ওবামা। ছবি: পিএ আর্কাইভ

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য মিশিগানের আসন্ন ডেমোক্রেটিক সিনেট প্রাইমারি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও বিতর্ক এখন তুঙ্গে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার একটি পুরোনো প্রশংসামূলক বক্তব্যকে হাতিয়ার করে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন মধ্যপন্থী প্রার্থী হ্যালি স্টিভেন্সের সমর্থকেরা, যা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে প্রগতিশীল শিবিরের প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের অনুসারীরা।

সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা এই আসনে আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকেই সমর্থন দেননি। তবে স্টিভেন্সের পক্ষে নির্বাচনী বিজ্ঞাপনে ওবামার উপস্থিতি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই লড়াইয়ে একদিকে রয়েছেন তুলনামূলক মধ্যপন্থী ও দলের নীতিনির্ধারকদের পছন্দের প্রার্থী হ্যালি স্টিভেন্স এবং অন্যদিকে ডেট্রয়েটের সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও প্রগতিশীল শিবিরের অন্যতম মুখ আবদুল এল-সায়েদ। আগামী ৪ আগস্টের এই প্রাইমারি নির্বাচনের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

AdImpact-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে মিশিগানে যেকোনো রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের চেয়ে হ্যালি স্টিভেন্সের পক্ষের একটি বিজ্ঞাপন সবচেয়ে বেশিবার (প্রায় ৪,০০০ বার) প্রচারিত হয়েছে। প্রায় ৫০ লাখ ডলার খরচ করে তৈরি করা এই বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ‘অটো রেসকিউ টাস্ক ফোর্স’-এর চিফ অব স্টাফ হিসেবে স্টিভেন্সের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করছেন।

তবে এই প্রশংসাটি ছিল ২০১৮ সালের একটি দলীয় সমাবেশের পুরোনো ফুটেজ। এটিকে বর্তমান নির্বাচনের বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহার করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আবদুল এল-সায়েদের সমর্থকেরা।

ডেট্রয়েট সিটি কাউন্সিলের সদস্য এবং এল-সায়েদের সমর্থক ডেনজেল ম্যাকক্যাম্পবেল বলেন, ‘অনেক ভোটার আমাদের বলছেন, তাঁরা ভাবছেন ওবামা হয়তো এই নির্বাচনে সরাসরি হ্যালিকে সমর্থন দিয়েছেন। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ শুধু এই বিজ্ঞাপনের ওপর ভিত্তি করেই তাদের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।’

অন্যদিকে স্টিভেন্সের সমর্থক এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির ব্ল্যাক ককাসের চেয়ারম্যান কিথ উইলিয়ামস এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘তারা কিসের অভিযোগ করছে? এটা তো কোনো মিথ্যা কথা নয়। ওবামা এই কথাটি সত্যিই বলেছিলেন। তাই কৃতিত্ব যেখানে প্রাপ্য, সেখানে দেওয়া উচিত।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিশিগানে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক ভোটারদের প্রায় এক-চতুর্থাংশই কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান। ওবামার ইমেজকে কাজে লাগিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের নিজের পক্ষে টানার এই কৌশলকে ‘অত্যন্ত চতুর কৌশল’ হিসেবে দেখছেন অভিজ্ঞ ডেমোক্র্যাট স্ট্র্যাটেজিস্ট ডেভিড অ্যাক্সেলরড।

কোটি ডলারের তহবিলের পেছনে ইসরায়েলি লবি

এই নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো দুই প্রার্থীর নির্বাচনী তহবিলের আকাশছোঁয়া ব্যবধান। হ্যালি স্টিভেন্সের পক্ষে বিভিন্ন বহিরাগত রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি বা সুপার প্যাক এ পর্যন্ত ৫ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করেছে।

এর বিপরীতে করপোরেট পিএসি থেকে কোনো প্রকার অনুদান না নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া আবদুল এল-সায়েদের পক্ষে বহিরাগত প্রচারণায় খরচ হয়েছে মাত্র ১০ লাখ ডলারের মতো।

স্টিভেন্সের পক্ষে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করছে ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপ ‘আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি’ (AIPAC)-এর সুপার প্যাক ‘ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট’ (ইউডিপি)। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে চলমান বিভাজনের মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন নির্বাচনটিকে আরও বেশি আদর্শিক রূপ দিয়েছে।

এল-সায়েদ সরাসরি এই অর্থায়নের সমালোচনা করে বলেন, ‘তারা আমার বিরুদ্ধে এত টাকা খরচ করছে কারণ তারা মনে করে আমি মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কের জন্য সবচেয়ে “বিপজ্জনক” প্রার্থী। হয়তো আমি চাই না যে আমাদের করের টাকা অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে অপচয় হোক।’

নির্বাচনী প্রচারণায় হ্যালি স্টিভেন্স ২০০৮ সালের মন্দার সময় মিশিগানের ঐতিহ্যবাহী গাড়ি শিল্প ও লাখ লাখ শ্রমিকের চাকরি বাঁচানোর ক্ষেত্রে তাঁর চিফ অব স্টাফ হিসেবে ভূমিকার কথা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন।

তবে স্টিভেন্সের এই অতীত সত্ত্বেও মিশিগানের অন্যতম প্রভাবশালী শ্রমিক ইউনিয়ন ‘ইউনাইটেড অটো ওয়ার্কার্স’ গত জুনে আবদুল এল-সায়েদকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন দিয়েছে। ইউনিয়নটির দাবি, এল-সায়েদ ওয়াশিংটনে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার আদায়ের জন্য আপসহীন লড়াই করতে পারবেন।

শুধু তাই নয়, স্টিভেন্সের সমর্থক একটি সুপার প্যাক তাদের বিজ্ঞাপনে অননুমোদিতভাবে শ্রমিক ইউনিয়নের লোগো ব্যবহার করায় ইউনিয়নটি তাদের আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে।

এই প্রাইমারি নির্বাচনে যিনিই জয়ী হবেন, তাঁকে মূল নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির হেভিওয়েট প্রার্থী ও সাবেক প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য মাইক রজার্সের মুখোমুখি হতে হবে। ডেমোক্র্যাটদের জন্য সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মিশিগানের এই আসনটিতে জয়লাভ করা প্রায় বাধ্যতামূলক।

মিশিগানের ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রবীণ নেতা কিথ উইলিয়ামসের মতে, মিশিগান কোনো নিউইয়র্ক নয় যে এখানে সহজেই বামপন্থী বা কট্টর প্রগতিশীল এজেন্ডা দিয়ে জয় পাওয়া যাবে। এটি একটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ রাজ্য, এখানে মূল নির্বাচনে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি।

ফলে আদর্শিক মেরুকরণ নাকি দলের মধ্যপন্থী বাস্তববাদিতা—আগামী ৪ আগস্ট মিশিগানের ডেমোক্র্যাট ভোটাররা কোন পথে হাঁটেন, সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো মার্কিন রাজনীতি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত