Ajker Patrika

প্রাণিজগতে শুধু মানবশিশুর জন্মদান কেন কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
প্রাণিজগতে শুধু মানবশিশুর জন্মদান কেন কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে
ছবি: নিও সায়েন্টিস্ট

মানুষের সন্তান জন্ম দেওয়া কেন এত কঠিন—এই প্রশ্নটি ঘিরেই আধুনিক বিবর্তনবিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের এক গভীর বিতর্ক গড়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা আরও এক ধাপ এগিয়ে বলছে, ভবিষ্যতে স্বাভাবিক প্রসব প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। এ ক্ষেত্রে সিজারিয়ান অপারেশনই হয়ে উঠতে পারে একমাত্র ভরসা। কিন্তু বিষয়টি কি সত্যিই এত সরল? নতুন গবেষণা ও পাল্টা বিশ্লেষণ বলছে—গল্পটা অনেক বেশি জটিল।

এই বিষয়ে ‘নিও সায়েন্টিস্ট’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের সন্তান জন্ম দেওয়া যে কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার নারী প্রসবজনিত জটিলতায় মারা যান, অনেকেই আজীবনের জন্য নানা শারীরিক সমস্যায় ভোগেন।

জার্মানির সেনকেনবার্গ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্যালিওঅ্যানথ্রোপোলজিস্ট নিকোল ওয়েব বলেন, ‘২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যুহার এত বেশি থাকা বিস্ময়কর।’ অথচ সন্তান জন্মই তো মানবজাতির টিকে থাকার মূল শর্ত। বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বৈপরীত্য ব্যাখ্যা করাই এখন গবেষকদের বড় চ্যালেঞ্জ।

এই ব্যাখ্যার কেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরেই ছিল তথাকথিত ‘অবস্টেট্রিক্যাল ডিলেমা’ বা প্রসবসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব। ধারণাটি জনপ্রিয় হয় ১৯৬০ সালে নৃতত্ত্ববিদ শেরউড ওয়াশবার্নের লেখার মাধ্যমে। তিনি মত দিয়েছিলেন—মানুষের পূর্বপুরুষেরা দুই পায়ে হাঁটতে শেখার পর আরও দক্ষভাবে হাঁটার সুবিধার জন্য তাদের পেলভিস বা শ্রোণী কাঠামো (মানবদেহের উদর ও ঊরুর মধ্যবর্তী কঙ্কাল কাঠামো) তুলনামূলকভাবে সরু হতে থাকে। একই সময়ে বড় মস্তিষ্কের দিকে মানুষের বিবর্তন হওয়ায় নবজাতকের মাথার আকারও বড় হতে থাকে। ফলে সরু জন্মনালি দিয়ে বড় মাথার শিশুকে বের করতে গিয়ে তৈরি হয় এক ভয়াবহ দ্বন্দ্ব।

ওয়াশবার্নের মতে, বিবর্তন এই সমস্যার সমাধান করেছে তুলনামূলক অপরিণত অবস্থায় শিশুর জন্ম ঘটিয়ে। কিন্তু এর ফল হয়েছে ভয়ংকর। এর ফলে মানুষের শিশুরা জন্মের পর দীর্ঘদিন অসহায় থাকে, আর মায়েদেরও প্রয়োজন হয় বাড়তি সহায়তার।

তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় এই ‘ডিলেমা’ নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়া, মেক্সিকো ও পোল্যান্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে একদল গবেষক দাবি করেন—১৯২৬ সালের তুলনায় বর্তমান নারীদের গড় পেলভিস প্রায় ৪.২ সেন্টিমিটার সরু হয়েছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে নারীদের পেলভিস এত বেশি সরু হওয়ার বিষয়ে গবেষকেরা মত দিয়েছেন, আধুনিক চিকিৎসা—বিশেষ করে সিজারিয়ান অপারেশন প্রাকৃতিকভাবে সন্তান জন্ম দেওয়ার চাপ কমিয়ে দিয়েছে। আগে সরু জন্মনালি মা ও শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারত, এখন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেই ঝুঁকি এড়ানো যাচ্ছে। ফলে সরু পেলভিসের জিনও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে যাচ্ছে।

তবে এই দাবিও সর্বজনগ্রাহ্য নয়। অনেকে বলছেন, এত অল্প সময়ে—মাত্র কয়েক দশকে এমন বড় বিবর্তনীয় পরিবর্তন ঘটার কথা নয়। কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আনা ওয়ারেনারের মতে, পেলভিসের আকার মাপার পদ্ধতিতেই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, পেলভিসের গঠন শুধু হাঁটা আর প্রসবের দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নয়; পেলভিক ফ্লোরের স্বাস্থ্য, অভ্যন্তরীণ অঙ্গের অবস্থা এবং গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের ভার বহনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

এই বিতর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে খাদ্যাভ্যাস। লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজের গবেষক জোনাথন ওয়েলস মনে করেন, প্রায় ১২ হাজার বছর আগে কৃষিভিত্তিক সমাজে রূপান্তর মানব প্রসবের ইতিহাসে বড় বাঁক এনেছে। কৃষিভিত্তিক খাদ্যতালিকা একদিকে শৈশবের শারীরিক বৃদ্ধি সীমিত করেছে, অন্যদিকে গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের আকার বাড়িয়েছে। ফল হয়েছে—ছোট জন্মনালি, কিন্তু বড় শিশু। এতে প্রসব আরও কঠিন হয়েছে।

আজকের দিনে অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার, অপুষ্টি ও স্থূলতা—সব মিলিয়ে নতুন ধরনের এক ‘আধুনিক অবস্টেট্রিক্যাল ডিলেমা’ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন ওয়েলস। বিশেষ করে নিম্নআয়ের দেশগুলোতে সস্তা কিন্তু পুষ্টিহীন খাবার প্রসবজনিত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

তবু অধিকাংশ গবেষকই একমত—ভবিষ্যতে সব জন্মই যে সিজারিয়ানে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে, এমন সম্ভাবনা খুবই কম।

সব মিলিয়ে বলা যায়, মানব সন্তানের জন্ম কেন এত কঠিন—এর কোনো একক উত্তর নেই। এটি বিবর্তন, সংস্কৃতি, চিকিৎসা ও খাদ্যাভ্যাসের জটিল মেলবন্ধনের ফল। এই জটিলতা বোঝা শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল মেটায় না; বরং নারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দেয়—প্রসব জটিল হলে তা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং হাজার হাজার বছরের বিবর্তনীয় ইতিহাসেরই প্রতিফলন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

মাথায় গুলিবিদ্ধ জুলাই যোদ্ধা আশরাফুল মারা গেছেন

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ভারত-আওয়ামী লীগ বিদ্বেষ তীব্র হয়: সাবেক সেনাপ্রধানের জবানবন্দি

ঢাকা–১৮ আসনে নির্বাচন না করার ঘোষণা মাহমুদুর রহমান মান্নার

আইসিসি-পিসিবির সঙ্গে জরুরি মিটিংয়ে হঠাৎ লাহোরে বিসিবি সভাপতি

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: শেষ সময়ে এমপিওর তোড়জোড়

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত