Ajker Patrika

বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করল ডব্লিউএইচও, সতর্কতা জারি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১: ৩২
বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করল ডব্লিউএইচও, সতর্কতা জারি

নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নওগাঁ জেলায় এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে গতকাল শুক্রবার একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে। রাজশাহী বিভাগে এই নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর সীমান্ত এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে স্বস্তির খবর হলো, সংস্থাটির মতে, এই রোগ বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে মহামারির আকার ধারণ করার ঝুঁকি ‘নিম্ন’ পর্যায়ে রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিবৃতি অনুযায়ী, ওই মৃত রোগী নওগাঁ জেলার ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী এক নারী। গত ২১ জানুয়ারি থেকে তাঁর শরীরে তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা এবং শ্বাসকষ্টের মতো প্রাথমিক উপসর্গ দেখা দেয়। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ২৭ জানুয়ারি স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা হয়। ২৮ জানুয়ারি তাঁর গলা থেকে শ্লেষ্মা এবং রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। ২৯ জানুয়ারি পরীক্ষার ফলাফলে তাঁর শরীরে নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। দুর্ভাগ্যবশত এর কিছুদিন পরেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু ঘটে।

ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, ৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ‘ইন্টারন্যাশনাল হেলথ রেগুলেশনস ন্যাশনাল ফোকাল পয়েন্ট’ (আইএইচআর এনএফপি) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার বিষয়ে অবহিত করে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আক্রান্ত ওই নারীর সাম্প্রতিক কোনো ভ্রমণের ইতিহাস ছিল না। তবে তিনি অসুস্থ হওয়ার কিছুদিন আগে কাঁচা খেজুরের রস পান করেছিলেন। নিপাহ ভাইরাসের প্রধান বাহক হলো ‘টেরোপাস’ প্রজাতির ফলাহারি বাদুড়। শীতকালে বাদুড় যখন খেজুরের রস সংগ্রহের হাঁড়ি থেকে রস খাওয়ার চেষ্টা করে, তখন তাদের লালা বা মলমূত্রের মাধ্যমে হাঁড়ির রসে ভাইরাস মিশে যায়। সেই কাঁচা রস মানুষ পান করলে সরাসরি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

বাংলাদেশে ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ৩৪৮ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, তাঁদের প্রায় অর্ধেকই সংক্রমিত হয়েছেন কাঁচা খেজুরের রস পান করার মাধ্যমে। অন্যদের ক্ষেত্রে আক্রান্ত মানুষের সরাসরি সংস্পর্শে আসার ফলে ভাইরাস ছড়িয়েছে।

গত সপ্তাহে ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও দুজনের শরীরে নিপাহ ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকায় বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ তাদের বিমানবন্দরে আগত যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা চালু করেছে।

এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে নিপাহ ভাইরাসের বৈশ্বিক ঝুঁকি এখনো কম। আমরা এখন পর্যন্ত কোনো দেশ বা অঞ্চলের ওপর ভ্রমণ বা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করছি না।

নিপাহ ভাইরাস একটি ‘জুনোটিক’ ভাইরাস, যা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এর চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, এই ভাইরাসে মৃত্যুর হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক—প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ।

সংস্থাটির প্রধান তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ নজরদারি এবং পরীক্ষা বৃদ্ধি করেছে। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং জনসাধারণকে সুরক্ষার উপায় সম্পর্কে অবহিত করা হচ্ছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষ নির্দেশনা:

নিপাহ ভাইরাস থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:

১. কাঁচা খেজুরের রস পান পরিহার: কোনো অবস্থাতেই কাঁচা খেজুরের রস পান করা যাবে না। রস অন্তত ৭০-৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফুটিয়ে পান করলে ঝুঁকি থাকে না।

২. পাখির খাওয়া ফল বর্জন: বাদুড় বা অন্য পাখির খাওয়া আংশিক ফল বা গাছ থেকে পড়া ফল খাওয়া যাবে না।

৩. রোগীর সংস্পর্শে সতর্কতা: নিপাহ আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন রোগীর সেবা করার সময় মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে এবং কাজ শেষে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।

৪. উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা: তীব্র জ্বর ও প্রলাপ বকার মতো মানসিক অস্থিরতা দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।

বাংলাদেশে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত এই ভাইরাসের মৌসুম চলে। তাই এই সময়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছে সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত