
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর সরকার এমআর (মিজেলস-রুবেলা) টিকাদানের বিশেষ কর্মসূচি শুরু করে। দেড় মাস ধরে কয়েক ধাপে পরিচালিত এই কর্মসূচির শেষ দফার টিকা প্রয়োগেরও দুই মাস পেরিয়ে গেছে। তবে অতিসংক্রামক এই রোগের সংক্রমণ ও মৃত্যু এখনো আশানুরূপভাবে কমেনি। এমন পরিস্থিতিতে বিশেষ এই টিকাদান কর্মসূচির কার্যকর আওতা (কভারেজ) নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
চলতি বছরের শুরুতে দেশে হামের সংক্রমণ দেখা দিলেও মার্চে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। ১৫ মার্চ থেকে সরকার হামের সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হিসাব সংরক্ষণ শুরু করে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় ৫ এপ্রিল বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। পরে ৮ এপ্রিল চার সিটি করপোরেশন এবং ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে তা সম্প্রসারণ করা হয়। ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪টি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৮০ হাজারের বেশি শিশু, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি (১০৩ শতাংশ)।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, টিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরও হামের সংক্রমণের শৃঙ্খল পুরোপুরি ভাঙেনি। অর্থাৎ কর্মসূচির দুই মাস পরও জনগোষ্ঠীতে ভাইরাসের সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে।
সাধারণত এমআর টিকা নেওয়ার ১৪ থেকে ২৮ দিনের মধ্যে শরীরে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি হয় বলে মত বিজ্ঞানীদের।
সরকারের জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপের (নাইট্যাগ) সাবেক সদস্য অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অন্তত ৯৫ শতাংশ কার্যকর টিকা কভারেজ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রচার-প্রচারণা, প্রস্তুতি ও লক্ষ্য নির্ধারণ—সব ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল। এ কারণেই সংক্রমণ প্রত্যাশিতভাবে কমছে না। লক্ষ্যমাত্রার ১০৩ শতাংশ টিকা কভারেজের দাবির হিসাবও সঠিক নয়।’
স্বাধ্য অধিদপ্তরের গতকাল রোববারের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত এক দিনে হামের উপসর্গে ভোগা ৯৩৮ জন এবং নিশ্চিত হামের ১১৩ রোগী শনাক্ত হয়েছে। উপসর্গে মারা গেছে ৪ জন। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৪৮ জন হাম উপসর্গের রোগী এবং ১৪ হাজার ৪৩১ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। আর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গে ৬৯৩ এবং হামে ৯৫ জনের।
সংক্রমণ কমছে দাবি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আগে প্রতিদিন হাম উপসর্গের রোগী হাজারের বেশি ছিল, বর্তমানে তা ৬০০ থেকে ৮০০-এর মধ্যে নেমে এসেছে। টিকাদান ক্যাম্পেইন শেষ হয়েছে ২০ মে। শেষ দিনে যারা টিকা পেয়েছে, তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে। আক্রান্ত অনেক শিশুর নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হয়। এসব জটিলতার কারণে কয়েক সপ্তাহ পরও মৃত্যু হতে পারে। সব মৃত্যুকে তাৎক্ষণিক হামের সংক্রমণের ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে ৬-১২ এপ্রিলকে প্রথম রোগতাত্ত্বিক সপ্তাহ ধরে বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই সপ্তাহে হামের উপসর্গযুক্ত রোগী ছিল ৭ হাজার ১১৯ জন, যা তৃতীয় সপ্তাহে বেড়ে ৮ হাজার ৪২২ জনে পৌঁছায়। পঞ্চম সপ্তাহে (৪-১০ মে) প্রাদুর্ভাব সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠে। ওই সপ্তাহে হাম উপসর্গ এবং হাম রোগী প্রায় দ্বিগুণ হয়। ওই সময়ে নিশ্চিত হামে মৃত্যু এবং হামের উপসর্গে মৃত্যু আগের সপ্তাহের তুলনায় আড়াই গুণের বেশি বেড়ে যায়।
অষ্টম রোগতাত্ত্বিক সপ্তাহে (২৫-৩১ মে) উপসর্গযুক্ত নতুন রোগী ছিল ৭ হাজার ১২৩ জন, নিশ্চিত হামের ৪২৭ জন। আর হামের উপসর্গে মৃত্যু ৫৩ জন এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৪ জন। ১৪তম সপ্তাহে (৬-১২ জুলাই) উপসর্গযুক্ত রোগী ছিল ৫ হাজার ৮৬২ জন, নিশ্চিত হামের ৮৬৮ জন। ওই সময়ে উপসর্গে মৃত্যু ১৯ জন এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু ১ জনের। ১৫তম সপ্তাহে (১৩-১৯ জুলাই) আবার উপসর্গযুক্ত রোগী ৬ হাজার ১৬৮ জন ও নিশ্চিত হামে ৯৩১ জন। একই সময়ে উপসর্গে আরও ২৯ জন এবং হামে ১ জনের মৃত্যু হয়।
এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, টিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার প্রায় দুই মাস পরও সংক্রমণ ও মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১০৩ শতাংশ টিকা কভারেজের দাবি করলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে। হামের সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে অন্তত ৯৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে কার্যকর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা (হার্ড ইমিউনিটি) তৈরি হওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তৃণমূল পর্যায়ে নিবিড় অনুসন্ধান, বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাবঞ্চিত শিশু শনাক্ত এবং কার্যকর মাইক্রোপ্ল্যানিংয়ের ঘাটতির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শিশুদের শরীরে টিকার কার্যকারিতা মূল্যায়নের বিষয়ে আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহম্মেদ জাকী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘টিকা নেওয়ার পর শিশুদের শরীরে কতটা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তা মূল্যায়নে গবেষণা শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ৩০টি উপজেলার শিশুদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এখন আরও পদ্ধতিগতভাবে নমুনা সংগ্রহ চলছে।’
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘শুধু টিকা দিলেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত শনাক্ত করা, আইসোলেশন নিশ্চিত করা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের ব্যবস্থাপনায় আনা এবং সমন্বিত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা কার্যকর করতে হয়। আমাদের ক্ষেত্রে এসব ব্যবস্থায় ঘাটতি ছিল।’
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘জরুরি পরিস্থিতিতে ২০২২ সালের জনশুমারির তথ্য ব্যবহার করে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়েছিল। বর্তমানে নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে অনুসন্ধানও চলছে।’
ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি ফর মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশনের (এনভিসি) চেয়ারপারসন এবং আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমানের মতে, ‘ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া যায় না। ফলে তারা এখনো সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। আবার পাঁচ বছরের বেশি বয়সী এমন কিছু শিশু রয়েছে, যারা অতীতে নিয়মিত টিকা পায়নি। অন্যদিকে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রার বাইরেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু রয়ে গেছে। তাই ১০৩ শতাংশ কভারেজের দাবি করলেই বাস্তব পরিস্থিতি প্রতিফলিত হয় না। পরিস্থিতি মূল্যায়নে নজরদারির তথ্যের পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীর তথ্যও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংক্রমণ দীর্ঘায়িত হওয়ার অন্য কারণ রয়েছে কি না, তা বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধান করা দরকার।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, চলতি বছর ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৩৭ জনের। এর মধ্যে চলতি মাসে ১৯ জন মারা গেছে। আর জানুয়ারিতে দুই, ফেব্রুয়ারিতে দুই, মে মাসে এক ও জুনে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
২ ঘণ্টা আগে
দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গরমে থাকা মানুষের জন্য বিপজ্জনক—এ কথা বহুদিন ধরেই জানা। তাপপ্রবাহে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত সময়ের তাপ-চিকিৎসা—বিশেষ করে সাউনা—হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, আলঝেইমার এমনকি বিষণ্নতার ঝুঁকিও কমাতে পারে।
২০ ঘণ্টা আগে
গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও ৪৭৩ জন। আজ রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
১ দিন আগে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গে মারা গেছে ৬৯৩ জন। একই সময়ে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ৯৫ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে তিনজন ঢাকা বিভাগের।
১ দিন আগে