Ajker Patrika

হামের পরিস্থিতি

‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের, দ্বিমত সরকারে

  • দুই মাসের কম সময়ে হাম ও উপসর্গে মৃত্যু ৪০০ ছাড়াল।
  • জরুরি অবস্থা ঘোষণায় ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয় দ্রুততর হয়।
  • ওষুধ, টিকা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ সহজ হয়।
মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা
আপডেট : ১১ মে ২০২৬, ০৩: ০৮
‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের, দ্বিমত সরকারে
ফাইল ছবি

হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দুই মাসের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে গেল। রোগটির প্রকোপ ঠেকাতে টিকাদান কর্মসূচি চললেও আক্রান্ত আর মৃত্যুর সংখ্যা কমার কোনো লক্ষণ এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। এই অবস্থায় হামের প্রাদুর্ভাবকে ‘স্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা বা মহামারি হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত জরুরি পদক্ষেপের তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন জনস্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ববিদেরা। তবে এর সঙ্গে একমত নয় সরকার। তাদের দাবি, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণেই আছে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘মহামারি ঘোষণার প্রয়োজন নেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। টিকাদান কর্মসূচির আওতায় চলে এসেছে ৯৬ শতাংশ শিশু। বাকিটা চলমান। সংক্রমণ বেশি, এমন এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা জোরদার করা হয়েছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চার শিশু হামে এবং সাত শিশু হাম উপসর্গে মারা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে নিশ্চিতভাবে ৬৫ শিশু ও উপসর্গ নিয়ে ৩৪৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৪০৯ জনে। এ সময় ৪৯ হাজার শিশু উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রায় ৩৫ হাজার শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গত মাসে জানিয়েছিল, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। আর ওই মাসের শেষ দিকে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে ৬১ জেলায় সংক্রমণের কথা বলা হয়। সর্বশেষ গত শনিবার রাজধানীতে এক গোলটেবিল আলোচনায় দেশের ৬৪ জেলাতেই হামের সংক্রমণ বিদ্যমান বলে দাবি করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা।

এই পরিস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক প্রাদুর্ভাব নয়, বরং একটি জাতীয় পর্যায়ের মহামারিসদৃশ পরিস্থিতি বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, হামের সংক্রমণ গত কয়েক বছরের গড় প্রবণতা ছাড়িয়ে গেছে এবং মহামারির (এনডেমিক) সংজ্ঞাগত শর্তও পূরণ করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহামারি ঘোষণা করা হলে রোগ নিয়ন্ত্রণে সরকারি ব্যবস্থাপনা আরও দ্রুত এবং সমন্বিত হয়। বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। জরুরি ভিত্তিতে ওষুধ, টিকা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ সহজ হয়। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় সময় বেশি লাগে, সেখানে জরুরি পরিস্থিতিতে তা প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন হয়। একই সঙ্গে আপৎকালীন পরিকল্পনা (কন্টিনজেন্সি প্ল্যান) কার্যকর হয়। সংক্রমণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা এবং সব সংস্থাকে একযোগে মাঠে নামানোর লক্ষ্য থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রত্যাশার বাইরে কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে তাকে মহামারি বলা হয়। গত পাঁচ বছরের গড়ের সঙ্গে তুলনা করলে এবারের হামের সংক্রমণ অনেক বেশি। এটি মহামারির পর্যায়ে পড়ে।’

মহামারি ও স্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থার পার্থক্য ব্যাখ্যা করে ডা. বে-নজির আহমেদ আরও বলেন, ‘মহামারি (এনডেমিক) হলো রোগতাত্ত্বিক শ্রেণিবিন্যাস, আর স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হলো ব্যবস্থাপনাগত সিদ্ধান্ত। রোগের বিস্তার, মৃত্যুহার, স্বাস্থ্যসেবার চাপ ও আন্তর্জাতিক ঝুঁকি বিবেচনায় মহামারি নির্ধারিত হয়। এরপর সরকার চাইলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারে।’

ডব্লিউএইচওর সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো সংক্রামক রোগ যখন কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিতভাবে উপস্থিত থাকে, তখন সেটিকে স্থানিক বা নিয়মিত উপস্থিত রোগ (এনডেমিক) বলা হয়। এই অবস্থার বাইরে গিয়ে যখন কোনো দেশে বা অঞ্চলে রোগটি প্রত্যাশিত মাত্রার চেয়ে দ্রুত ও অস্বাভাবিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটি মহামারি (এপিডেমিক) হিসেবে বিবেচিত হয়। আর যখন একই সংক্রামক রোগ একাধিক দেশ বা মহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে জনস্বাস্থ্যসংকট তৈরি করে, তখন সেটিকে অতিমারি (প্যানডেমিক) বলা হয়।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা এবং মহামারি ঘোষণার আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। কোভিড-১৯-এর সময়ও সরকার মহামারি ঘোষণা না করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঘোষণার ওপর নির্ভর করেছিল।’

মহামারি ঘোষণা না করার বিষয়ে মুশতাক হোসেন বলেন, ‘সরকার সাধারণত ভাবমূর্তি ও জনআতঙ্কের আশঙ্কায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবতা অস্বীকার করলে সংকট আড়াল হয় না। সময়মতো মহামারি ঘোষণা ও সমন্বিত ব্যবস্থা নিলে সংক্রমণ ও শিশুমৃত্যু আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যেত।’

দেশে সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ থাকলেও স্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই বলে জানান হাম-রুবেলা নির্মূলবিষয়ক ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটির চেয়ারম্যান ও আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘অথচ এমন ব্যবস্থা থাকলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জরুরি তহবিল ব্যবহার ও সমন্বিত পদক্ষেপ সহজ হতো।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পুলিশি তদন্তে সরকারি প্রাথমিকে নির্বাচিত ১৪ হাজার শিক্ষক

মাদক কারবারিকে ছাড়াতে গিয়ে বিপাকে বিএনপি-জামায়াত নেতারা, সারা রাত থানায় আটকে রাখলেন ওসি

পুলিশ সদস্যদের ওভারটাইম ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের

বিজয়ের শপথ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত স্ত্রী-সন্তানেরা, অভিনেত্রী তৃষাকে নিয়ে জল্পনা

ইসলামিক ফাউন্ডেশনে ৬৫ পদে চাকরি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত