
আসন্ন অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ খাতটিতে এই বড় বরাদ্দ বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ও জনস্বাস্থ্যবিদেরা। সরকার স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অংশ হিসেবে এ বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা বলছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়। কোনো কোনো অর্থবছরে অব্যবহৃত অর্থের পরিমাণ মোট বরাদ্দের ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। ফলে এতটা বাড়তি বরাদ্দের সুফল জনগণের স্বাস্থ্যসেবায় কতটা পৌঁছাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ও শঙ্কা—দুই-ই তৈরি হয়েছে।
১১ জুন জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। আসন্ন অর্থবছরে মোট বাজেটের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ।
অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বরাদ্দের মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য ৪৯ হাজার ৩৮৭ কোটি এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য ১৩ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। পরিচালন ব্যয়ে ২৭ হাজার ৮২৬ কোটি, উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ৩৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় ব্যয় করবে ৬ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা।
সাম্প্রতিককালে স্বাস্থ্য বাজেটে বরাদ্দ বাড়লেও তা পুরোপুরি ব্যবহার করা হচ্ছে না। গত এক দশকের বরাদ্দ ও ব্যয়ের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিবছর বরাদ্দের একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দের কমতির পাশাপাশি অর্থ ব্যবহারের সক্ষমতার ঘাটতিও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিষয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা চালানো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও দক্ষতার অভাবে বরাদ্দের একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থাকায় সংশোধিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ কমে যায়। স্বাস্থ্য খাতে ব্যবস্থাপনার বড় সমস্যা হচ্ছে কেনাকাটা প্রক্রিয়ার দুর্বলতা। কর্মসূচিভিত্তিক, দাতা সংস্থার অর্থায়ন ও সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কেনাকাটার প্রক্রিয়া ভিন্ন হওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। কিছু জটিলতা কমলেও এখনো অনেকাংশে রয়ে গেছে।’
সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতার ঘাটতি এবং কেনাকাটার অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতাও বড় সমস্যা বলে মত দেন ড. রুমানা।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, স্বাস্থ্য সংস্থার কমিশনের প্রতিবেদন এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বছরের পর বছর অব্যবহৃত অর্থ ২০১৯-২০ অর্থবছরে জাতীয় বাজেট থেকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য বরাদ্দের ৭৪ শতাংশ ব্যয় হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে ব্যয় হয় বরাদ্দের ৬৯ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরাদ্দ ৩৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকার মধ্যে ৭ হাজার ১১৬ কোটি টাকা (১৯ দশমিক ৩০ শতাংশ) অব্যবহৃত থাকে।
একইভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ৩৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের ২২ শতাংশ অব্যবহৃত থাকে। সেবার স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বরাদ্দের ২০ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ২৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ ব্যয় করতে পারেনি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অর্থ অব্যবহৃত রয়ে যায় ৩৩ শতাংশ। আর সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকার মধ্যে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ অর্থ অব্যবহৃত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটের ৫ শতাংশ বা তার বেশি বরাদ্দ রাখা হলেও বছর শেষে সংশোধিত বাজেটে তা কমে আসে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটে মোট বাজেটের ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ থাকলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমে ৪ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়ায়। একইভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫ দশমিক ২০ শতাংশ বরাদ্দ থাকলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৩০ শতাংশের বরাদ্দ সংশোধিত বাজেটে কমে ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতে শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না, বরং অর্থ ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। যথাযথ পরিকল্পনা, প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে বরাদ্দের বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়। তাই প্রকল্প গ্রহণ, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অর্থ ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নতি করতে হবে। তা না হলে বাড়তি বরাদ্দের সুফল স্বাস্থ্যসেবায় পৌঁছানো কঠিন হবে।
সরকারের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শক কমিটির সদস্য ও পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল বরাদ্দ করা অর্থ সম্পূর্ণ ব্যয় না করতে পারার কারণ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘বরাদ্দের ১০০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা যাচ্ছে না কেন, সেটি দেখতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে সরকার প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অর্থ বরাদ্দ করছে। কিন্তু বরাদ্দ ব্যবহারের সক্ষমতা, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া বাড়তি অর্থ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।’
আবু জামিল আরও বলেন, বাজেট ঘোষণার পর পরিকল্পনা, অর্থছাড় ও অনুমোদনপ্রক্রিয়ায় সময় চলে যায়। ফলে শেষ দিকে এসে অর্থ ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে শুধু অর্থছাড় ও ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়, কিন্তু প্রকৃত বাস্তবায়নের মান নিশ্চিত হয় না। নতুন হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ বা অবকাঠামো নির্মাণের আগে প্রয়োজনীয়তা এবং সক্ষমতা বিশ্লেষণ জরুরি। শুধু ভবন নির্মাণ বা যন্ত্রপাতি কেনার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন সম্ভব নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বরাদ্দ বাড়লেও অর্থ আগের মতো অব্যবহৃত থাকবে কি না, তা নির্ভর করছে বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর।’
স্বাস্থ্য খাতে যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যবহার না হওয়ার পেছনে তিনটি কারণ উল্লেখ করে অধ্যাপক শাফিউন নাহিন বলেন, ‘প্রথমত, বছরের পর বছর একই ধরনের কর্মসূচি চলে, নতুন কার্যক্রম যুক্ত হয় না। দ্বিতীয়ত, অর্থ ব্যয়ের দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতায় ঘাটতি থাকে। তৃতীয়ত, অর্থছাড়, অনুমোদন, ক্রয় ও ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়ায় জটিলতা রয়েছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত আর্থিক স্বায়ত্তশাসন নেই।’
অধ্যাপক শাফিউন নাহিন আরও বলেন, ‘কিছু খাতে; যেমন ওষুধ কেনার অর্থ প্রায় পুরোপুরি ব্যয় হয়, কিন্তু মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার খাতে অর্থ খরচে সমস্যা হয়। এসব সমস্যার সমাধান না করে শুধু বরাদ্দ বাড়ালে বাড়তি অর্থের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।’
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন অবশ্য জোর দিয়ে বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের ‘একটি টাকাও’ অপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হবে না। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘অতীতে বাজেটের অর্থ ব্যবহৃত না হওয়ার কারণ ছিল পরিকল্পনার ঘাটতি। উদ্দেশ্য ও বিষয়ভিত্তিক পরিকল্পনা ছাড়াই মন্ত্রণালয় পরিচালিত হয়েছে। যেসব কারণে আগে বাজেটে ল্যাপস (কমতি) হয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। আগামী জুলাইয়ের প্রথম দিন থেকেই কাজ শুরু হবে।’

চিকিৎসক সূত্রে জানা গেছে, সুকোমল বড়ুয়া বেশ কিছুদিন ধরে স্পাইন ও হাতের মারাত্মক জটিলতায় ভুগছিলেন। হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এই শিক্ষাবিদের অস্ত্রোপচারের মূল দায়িত্ব দেওয়া হয় অর্থো-সার্জন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড...
৭ ঘণ্টা আগে
দেশের ঔষধ খাতের উন্নয়ন, জাতীয় ঔষধনীতি বাস্তবায়ন এবং অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে ‘জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠন করেছে সরকার। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রীকে সভাপতি করে ২২ সদস্যের এ পরিষদ গঠন করা হয়েছে...
৮ ঘণ্টা আগে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, আজ সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৬০ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৯৬৫ জন। তাদের মধ্যে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৮৪ জন।
১১ ঘণ্টা আগে
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১৩৯ জন ডেঙ্গু রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আজ সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
১২ ঘণ্টা আগে