Ajker Patrika

শৈশবকালীন ক্যানসার: সার্ক অঞ্চলে আক্রান্তদের ৬৯ শতাংশই ভারতে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
শৈশবকালীন ক্যানসার: সার্ক অঞ্চলে আক্রান্তদের ৬৯ শতাংশই ভারতে
ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি

২০২২ সালে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) আট সদস্য দেশে নথিভুক্ত আনুমানিক শৈশবকালীন ক্যানসারের ঘটনার প্রায় ১০ টির মধ্যে সাতটিই ভারতে। অর্থাৎ, প্রায় ৬৯ শতাংশ ক্যানসার আক্রান্ত শিশুই ভারতের। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে দ্যা ল্যানসেট রিজিওনাল হেলথ-সাউথইস্ট এশিয়া জার্নালে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

গবেষণায় আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের গ্লোবোক্যানের (GLOBOCAN) আনুমানিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে শৈশবকালীন ক্যানসারের আক্রান্তের সংখ্যা এবং মৃত্যুহার উভয়ই পর্যালোচনা করা হয়।

গবেষণার ফল দক্ষিণ এশিয়ার শৈশবকালীন ক্যানসারের বোঝার কেন্দ্রে ভারতের বিপুল শিশুসংখ্যাকে তুলে ধরেছে। ২০২২ সালে সার্ক অঞ্চলের আট দেশে আনুমানিক ৩৭ হাজার ৭১৬টি নতুন শৈশবকালীন ক্যানসারের ঘটনা শনাক্ত হয়। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৯৩৯টি ঘটনাই ভারতের, যা মোট ঘটনার ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশ। এরপর রয়েছে পাকিস্তান, যেখানে আনুমানিক ৭ হাজার ৮৪১টি ঘটনা বা মোটের ২০ দশমিক ৮ শতাংশ।

তবে শুধু জনসংখ্যার আকার দিয়ে এই পরিসংখ্যানের পুরো চিত্র বোঝা যায় না। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশগুলোর মধ্যে বয়স-মানসম্মত ক্যানসার আক্রান্তের হার এবং মৃত্যুহারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। এসব পার্থক্য ক্যানসার শনাক্তকরণ, রোগ নিবন্ধন, বিশেষায়িত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতার ভিন্নতার ইঙ্গিত দেয়।

গবেষকদের হিসাবে, ২০২২ সালে সার্কভুক্ত দেশগুলোতে ৩৭ হাজার ৭১৬টি নতুন শৈশবকালীন ক্যানসারের ঘটনা এবং ১৭ হাজার ৬৯৮টি মৃত্যু ঘটেছে। ভারতে এই সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার ৯৩৯টি ঘটনা। এরপর পাকিস্তানে ৭ হাজার ৮৪১টি ঘটনা। তবে এর অর্থ এই নয় যে ক্যানসারে আক্রান্ত ভারতীয় শিশুদের ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশই শনাক্ত হয়েছে বা ক্যানসার রেজিস্ট্রিতে নথিভুক্ত হয়েছে। বরং গ্লোবক্যানের ২০২২ সালের তথ্যভান্ডারে সার্কের আটটি দেশের আনুমানিক মোট শৈশবকালীন ক্যানসারের বোঝার মধ্যে ভারতের অংশ ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশ।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় ক্যানসার নজরদারি ব্যবস্থা এখনো অসম। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (আইএআরসি) জানিয়েছে, তাদের সর্বশেষ ইন্টারন্যাশনাল ইনসিডেন্স অব চাইল্ডহুড ক্যানসারের সংকলনে ৮২টি দেশ ও অঞ্চলের ৩০৮টি উচ্চমানের জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যানসার রেজিস্ট্রির তথ্য রয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ক্যানসার নিবন্ধন আরও উন্নত করার গুরুত্বও সংস্থাটি তুলে ধরেছে।

ভারতও শৈশবকালীন ক্যানসার নজরদারি জোরদার করতে শুরু করেছে। আইএআরসি ২০২৫ সালে জানায়, ভারতে প্রথমবারের মতো একটি নিবেদিত জনসংখ্যাভিত্তিক শৈশবকালীন ক্যানসার রেজিস্ট্রি চালু হয়েছে, যার অবস্থান চেন্নাই। ২০২২-২৩ সালে ওই রেজিস্ট্রিতে প্রতি ১০ লাখ শিশুর মধ্যে ১৩৬টি ক্যানসার আক্রান্তের হার নথিভুক্ত হয়। রেজিস্ট্রি অনুযায়ী, নিবন্ধিত সব রোগীর মধ্যে দুই বছরের বেঁচে থাকার হার ছিল ৬০ শতাংশ এবং যেসব রোগীর ক্ষেত্রে উচ্চ-রেজোলিউশনের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, তাদের মধ্যে এই হার ছিল ৭০ শতাংশ।

কোন শৈশবকালীন ক্যানসার সবচেয়ে বেশি

সার্কের আটটি দেশ মিলিয়ে লিউকেমিয়া বা ব্লাড ক্যানসার ছিল শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ ক্যানসার। দেশভেদে এটি মোট ঘটনার প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। দ্বিতীয় সর্বাধিক সাধারণ ক্যানসারের শ্রেণি ছিল কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের টিউমার, যা মোট ঘটনার প্রায় ১২ শতাংশ।

এই প্রবণতা বৈশ্বিক চিত্রের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ ক্যানসারের মধ্যে লিউকেমিয়া, মস্তিষ্কের টিউমার এবং নিউরোব্লাস্টোমা ও উইলমস টিউমারের মতো কঠিন টিউমারকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। শৈশবকালীন ক্যানসার প্রাপ্তবয়স্কদের অনেক ক্যানসারের তুলনায় ভিন্ন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এর কোনো প্রতিষ্ঠিত জীবনযাপন-সম্পর্কিত কারণ নেই, যা বাবা-মা আগে থেকে প্রতিরোধ করতে পারতেন। একইভাবে, সাধারণ জনগোষ্ঠীর জন্য নিয়মিত স্ক্রিনিং ব্যবস্থাও সাধারণত নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, শৈশবকালীন ক্যানসার সাধারণভাবে প্রতিরোধ করা বা স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে শনাক্ত করা যায় না। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক উপসর্গ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং দ্রুত চিকিৎসা মূল্যায়ন করানো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

দক্ষিণ এশিয়ায় মৃত্যুহারে এত পার্থক্য কেন

গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল মৃত্যু-থেকে-আক্রান্ত হওয়ার অনুপাতের (Mortality-to-Incidence Ratio বা MIR) পার্থক্য। নতুন ক্যানসারের আনুমানিক সংখ্যার তুলনায় কতজন মারা যাচ্ছেন, তা তুলনা করতে এই অনুপাত ব্যবহার করা হয়। সার্কভুক্ত দেশগুলোতে এই হার শ্রীলঙ্কায় দশমিক ৩০ থেকে আফগানিস্তানে দশমিক ৫৭ পর্যন্ত। ক্যানসারের ধরনভেদেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে।

বিশেষ করে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ক্যানসারের ক্ষেত্রে আক্রান্তের সংখ্যার তুলনায় মৃত্যুহার ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গবেষকদের মতে, এই পার্থক্যগুলো শুধু প্রকৃত ক্যানসার বোঝার প্রতিফলন নয়; শিশুদের কার্যকরভাবে শনাক্ত ও চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতাও এতে প্রতিফলিত হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাপী শিশুদের ক্যানসার থেকে বেঁচে থাকার হারের বিশাল বৈষম্যের কথা তুলে ধরছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের ৮০ শতাংশেরও বেশি সুস্থ হয়ে ওঠে। বিপরীতে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অনেক দেশে সুস্থতার হার ৩০ শতাংশের নিচে। দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া, ভুল রোগ নির্ণয়, চিকিৎসার সীমিত সুযোগ, চিকিৎসা মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া, চিকিৎসাজনিত বিষক্রিয়া বা জটিলতা এবং রোগ পুনরায় ফিরে আসা, এসব কারণ খারাপ ফলাফলের পেছনে ভূমিকা রাখে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলও জানিয়েছে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় শিশুদের ক্যানসারে মৃত্যুহার এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এটি পুরো অঞ্চলে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসার সুযোগ এবং ধারাবাহিক চিকিৎসাসেবা উন্নত করার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে।

শৈশবকালীন ক্যানসার কি নিরাময় করা সম্ভব

হ্যাঁ। শৈশবকালীন ক্যানসার মানেই খারাপ পরিণতি নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অনেক ধরনের শৈশবকালীন ক্যানসার নিরাময় করা সম্ভব, যদি শিশুরা সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা পায়। ক্যানসারের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসার মধ্যে কেমোথেরাপি, অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি এবং অন্যান্য বিশেষায়িত চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার মূল চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি পরিস্থিতি নিশ্চিত করা, যেখানে কোনো শিশুর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নির্ভর করবে না সে কোথায় বাস করে, তার পরিবারের চিকিৎসার খরচ বহনের সামর্থ্য কতটা, অথবা সে কত দ্রুত একটি বিশেষায়িত ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে তার ওপর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ফর চাইল্ডহুড ক্যানসারের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের অন্তত ৬০ শতাংশের বেঁচে থাকার হার অর্জন করা।

এই উদ্যোগে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, সহায়ক সেবা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত