Ajker Patrika

Y ক্রোমোজোম হ্রাসে পুরুষ জাতি বিলুপ্তির শঙ্কা কতটা যৌক্তিক, বিজ্ঞান কী বলছে

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক
আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ১৮: ০৬
Y ক্রোমোজোম হ্রাসে পুরুষ জাতি বিলুপ্তির শঙ্কা কতটা যৌক্তিক, বিজ্ঞান কী বলছে
হারিয়ে যাচ্ছে Y ক্রোমোজোম, তবে কি বিলুপ্ত হবে পুরুষ? ছবি: স্পিফি জে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘হারিয়ে যাচ্ছে Y ক্রোমোজোম, তবে কি বিলুপ্ত হবে পুরুষ?’ শীর্ষক একটি ফটোকার্ড ভাইরাল হয়েছে। এই ফটোকার্ডটি নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক বিভ্রান্তি ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

‘বাংলাদেশ শিক্ষা বোর্ড’ নামক একটি ফেসবুক গ্রুপে শেয়ার করা একটি পোস্টে হাজারের বেশি রিয়েকশন, কমেন্ট ও শেয়ার রয়েছে। ব্যবহারকারীদের অনেকেই বিষয়টিকে ধর্মীয় ও সামাজিক নানা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করছেন।

পোস্টটি শেয়ার করে একজন লিখেছেন, ‘নিশ্চয়ই কেয়ামতের কিছু আলামত বা লক্ষণ রয়েছে। তা হলো, পুরুষের সংখ্যা কমে যাবে এবং নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এমনকি ৫০ জন নারীর জন্য মাত্র একজন পুরুষ তত্ত্বাবধায়ক বা পরিচালক হবে।— সহীহ বুখারী, হাদিস নম্বর ৮১; সহীহ মুসলিম।’

প্রচারিত পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একজন লেখেন, ‘সহজ-সরল মানুষ বেশি দিন বাঁচে না।’ আরেকজন মজা করে কমেন্ট করেছেন, ‘তাও তো বগুড়ায় সিঙ্গেল মেয়ে পাই না।’ অন্য একজন লেখেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়।’ আবার একজন ব্যঙ্গ করে কমেন্ট করেন, ‘নাসার গবেষকদের চেয়ে আমাদের বাংলাদেশের চায়ের দোকানের গবেষকেরা অনেক দূর চলে গেছে।’

সামাজিকমাধ্যমে প্রচারিত পোস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট
সামাজিকমাধ্যমে প্রচারিত পোস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট

উল্লেখ্য, ক্রোমোজোম হলো কোষের নিউক্লিয়াসে অবস্থিত সুতার মতো কাঠামো যা প্রোটিন এবং ডিএনএ দিয়ে গঠিত। এটি জীবের সমস্ত বংশগতীয় তথ্য বহন করে এবং পিতা-মাতার বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরিত হতে সাহায্য করে। মানবদেহে সাধারণত ৪৬টি (২৩ জোড়া) ক্রোমোজোম থাকে। এর মধ্যে দেহের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণকারী ২২ জোড়া ক্রোমোজোমকে বলে অটোজোম। আর লিঙ্গ নির্ধারণকারী ১ জোড়া ক্রোমোজোমকে (নারীদের ক্ষেত্রে XX এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে XY) বলে সেক্স ক্রোমোজোম। সে হিসাবে Y ক্রমোজোম কমে যাওয়ার অর্থ হলো ছেলেশিশুর জন্ম কমে যাওয়া এবং কন্যাশিশু জন্মের হার বৃদ্ধি পাওয়া।

আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান

আলোচিত দাবির বিষয়ে বিজ্ঞান সাময়িকী ও গবেষকদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল দাবিটি আংশিক সত্য, তবে বিভ্রান্তিকর। Y ক্রোমোজোম কমে যাওয়ার তথ্যটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হলেও, এর কারণে পুরুষ বা মানবজাতি বিলুপ্ত হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।

Y ক্রোমোজোম হ্রাসের গল্প

বিজ্ঞানীদের মতে, আজ থেকে প্রায় ১৮ কোটি বছর আগে মানুষের শরীরে সেক্স ক্রোমোজোম বা লিঙ্গ নির্ধারক ক্রোমোজোমের বিকাশ ঘটে। এর আগে নারীদের মতো একই ক্রোমোজোম জোড়ায় জোড়ায় ছিল। এগুলোর বৈশিষ্ট্যও ছিল একই।

মানুষের পুরুষ লিঙ্গ নির্ধারণকারী ‘ওয়াই’ (Y) ক্রোমোজোমটি ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে এবং আগামী ৬০ থেকে ৭০ লাখ বছরের মধ্যে এটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। তবে এর ফলে কি পুরুষ জাতি পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে?

বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ১৮ কোটি বছরের স্তন্যপায়ী প্রাণীর বিবর্তনের ইতিহাসে ওয়াই ক্রোমোজোমটি তার আদি জিনের প্রায় ৯৭ শতাংশই হারিয়ে ফেলেছে।

বর্তমানে নারীর শরীরে থাকা ‘এক্স’ (X) ক্রোমোজোমে যেখানে ৯০০ থেকে ১ হাজার ৪০০টি জিন থাকে, সেখানে পুরুষের ‘ওয়াই’ ক্রোমোজোমে জিনের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৫টিতে। এর মধ্যে মাত্র একটি জিন পুরুষ লিঙ্গ নির্ধারণ করে (SRY জিন) এবং বাকি কয়েকটি জিন শুক্রাণু তৈরিতে সাহায্য করে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ক্রোমোজোমের এই ক্ষয় কেবল মানুষের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; ফ্রুট ফ্লাই বা ফলখেকো মাছির মতো অনেক প্রাণী ইতিমধ্যে তাদের ওয়াই ক্রোমোজোম প্রায় সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছে।

কেন সংকুচিত হচ্ছে ওয়াই ক্রোমোজোম

ওয়াই ক্রোমোজোমের এই দ্রুত ক্ষয়ের পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন জিন বিজ্ঞানীরা:

১. উচ্চ মিউটেশনের ঝুঁকি: ওয়াই ক্রোমোজোমটি কেবল পুরুষের অণ্ডকোষে সক্রিয় থাকে। সেখানে প্রতিনিয়ত এবং অত্যন্ত দ্রুত গতিতে শুক্রাণু তৈরির জন্য দ্রুত ও অনবরত কোষ বিভাজনের প্রয়োজন হয় বলে এই ক্রোমোজোমটি অনবরত উচ্চ জিনগত পরিবর্তনের (মিউটেশন) ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

২. স্ব-মেরামতের অক্ষমতা: মানবদেহের অন্য জোড়া ক্রোমোজোমগুলো কোনো ধরনের জিনগত ক্ষতির শিকার হলে নিজেদের মধ্যে ডিএনএ পুনঃসংযোজন (রিকম্বিনেশন) করে তা মেরামত করে নিতে পারে। কিন্তু পুরুষের শরীরে কেবল একটিই ওয়াই ক্রোমোজোম থাকায় এটি কোনো সঙ্গী পায় না। ফলে নিজের ত্রুটিগুলো নিজে মেরামত করতে পারে না এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল জিনগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়।

বিখ্যাত জিন বিজ্ঞানী অধ্যাপক জেনি গ্রেভসের মতে, এই ক্ষয়ের গতি যদি একই রকম থাকে, তবে আগামী ৬০ থেকে ৭০ লাখ বছরের মধ্যে মানুষের শরীর থেকে Y ক্রোমোজোম পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। তবে আশার কথা হলো, ‘নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি নিবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, গত আড়াই কোটি বছর ধরে এই ক্ষয়ের গতি বেশ স্থিতিশীল রয়েছে।

আদি গঠন থেকে Y ক্রোমোজোম হারিয়েছে প্রায় ৯৭ শতাংশ জিন। ছবি: ফ্রিপিক
আদি গঠন থেকে Y ক্রোমোজোম হারিয়েছে প্রায় ৯৭ শতাংশ জিন। ছবি: ফ্রিপিক

Y ক্রোমোজোম ছাড়া পুরুষ?

ওয়াই ক্রোমোজোম বিলুপ্ত হলে মানুষের প্রজনন কীভাবে সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মৌমাছি বা কিছু সরীসৃপ পারলেও মানুষ অপুংজনি বা পার্থেনোজেনেসিস (পুরুষের শুক্রাণু ছাড়াই কেবল ডিম্বাণু থেকে সন্তান জন্ম দেওয়া) পদ্ধতিতে বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। সাধারণভাবে, মানুষের প্রজননের জন্য এমন কিছু জিনের প্রয়োজন হয়, যা কেবল শুক্রাণুর মাধ্যমেই স্থানান্তরিত হতে পারে। ফলে মানবজাতির টিকে থাকার জন্য পুরুষের অস্তিত্ব অপরিহার্য।

তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, Y ক্রোমোজোম চলে গেলেও পুরুষ বিলুপ্ত হবে না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ জাপানের আমামি দ্বীপের এক বিপন্ন প্রজাতির ইঁদুর—আমামি স্পাইনি র‍্যাট।

২০২২ সালের শেষের দিকে বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক জার্নাল PNAS-এ প্রকাশিত জাপানের হোক্কাইদো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসাতো কুরোইওয়ার একটি গবেষণা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। বিজ্ঞানীরা দেখেন, এই ইঁদুরগুলোর শরীর থেকে বিবর্তনের ধারায় Y ক্রোমোজোম এবং পুরুষের বৈশিষ্ট্যবাহী SRY জিন—দুটোই পুরোপুরি গায়েব হয়ে গেছে! পুরুষ ও স্ত্রী উভয় ইঁদুরের ক্রোমোজোম দেখতে হুবহু এক। তাও তারা দিব্যি পুরুষ ও স্ত্রীতে বিভক্ত হয়ে বংশবৃদ্ধি করছে।

জাপানে ইঁদুর নিয়ে গবেষণা। ছবি: স্ক্রিনশট
জাপানে ইঁদুর নিয়ে গবেষণা। ছবি: স্ক্রিনশট

প্রকৃতি কীভাবে বিকল্প ‘সুইচ’ বানাল

বিজ্ঞানীরা এই ইঁদুরের ডিএনএ ম্যাপিং করে এক অবিশ্বাস্য রহস্যের জট খোলেন। তাঁরা দেখেন, Y ক্রোমোজোম হারিয়ে গেলেও পুরুষ ইঁদুরদের শরীরে একটি সাধারণ ক্রোমোজোমের (Autosome) ভেতর নতুন একটি জিনগত পরিবর্তন ঘটেছে। তাদের শরীরের SOX9 নামক একটি জিনের পাশে ডিএনএ-র একটি বাড়তি অংশ তৈরি হয়েছে, যা কেবল পুরুষ ইঁদুরের মধ্যেই আছে।

সাধারণ প্রাণীদের ক্ষেত্রে Y ক্রোমোজোমের কাজ ছিল ওই SOX9 জিনকে সক্রিয় করা। কিন্তু এই ইঁদুরদের ক্ষেত্রে Y ক্রোমোজোম না থাকলেও, সাধারণ ক্রোমোজোমে ঘটে যাওয়া নতুন এই পরিবর্তনটি নিজেই একটি ‘সুইচ’ হিসেবে কাজ করছে এবং কোনো সাহায্য ছাড়াই শুক্রাশয় তৈরি করে পুরুষত্ব টিকিয়ে রাখছে।

মানুষের ভবিষ্যৎ কী?

Y ক্রোমোজোমের এই ক্রমাগত ক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বিবর্তনের দীর্ঘ ধারায় এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আর ইঁদুরের গল্পটি মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য একটি জীবন্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, সুদূর ভবিষ্যতে যদি মানুষের Y ক্রোমোজোম কখনো বিলুপ্ত হয়েও যায়, তারপরও মানবজাতি নতুন কোনো জিনের মাধ্যমে পুরুষ সত্ত্বা টিকিয়ে রাখতে পারবে।

এমনও হতে পারে, পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের মানুষের শরীরে ভিন্ন ভিন্ন নতুন লিঙ্গ-নির্ধারণী জিন তৈরি হবে, যা সুদূর ভবিষ্যতে মানুষকে একাধিক নতুন প্রজাতিতে বিভক্ত করতে পারে।

অর্থাৎ, Y ক্রোমোজোম হারিয়ে বা কমে যাওয়ার দাবিটি সত্য হলেও ‘পুরুষ বিলুপ্ত হয়ে যাবে’— এই দাবিটি সঠিক নয়। এ ছাড়া বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, Y ক্রোমোজোম ছাড়াও প্রকৃতিতে বিকল্প উপায়ে পুরুষত্ব টিকিয়ে রাখার পথ ইতিমধ্যেই তৈরি হতে শুরু করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা [email protected]
Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত