Ajker Patrika

ভাঙন রোধে ‘জাদুর ঘাস’ ব্যবহারের উদ্যোগ, এই ঘাসের বৈশিষ্ট্য কী

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১০: ১০
ভাঙন রোধে ‘জাদুর ঘাস’ ব্যবহারের উদ্যোগ, এই ঘাসের বৈশিষ্ট্য কী
নদীর তিরের ভাঙন রোধ করবে বিন্না ঘাস।

সড়ক ও নদীর বাঁধ ভাঙন রোধ এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে ‘বিন্না ঘাস’ (ভেটিভার গ্রাস) ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে বিস্তারিত রূপরেখা তৈরি এবং প্রকল্প চিহ্নিত করতে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক মন্ত্রীর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বিন্না ঘাসের কার্যকারিতা ও সম্ভাবনা নিয়ে একটি সচিত্র প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।

উপ-প্রেস সচিব বলেন, ‘বৈঠকে বিন্না ঘাসের উপকারিতা এবং সড়ক ও বাঁধ সুরক্ষায় এর ব্যবহার নিয়ে সবাই একমত পোষণ করেন। এটি ঠিক কোন কোন প্রকল্পে প্রয়োগ করা সম্ভব, তা পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার জন্য কারিগরি কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি স্পষ্ট গাইডলাইন তৈরির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।’

কী এই ‘বিন্না ঘাস’ এবং কেন এটি ‘জাদুর ঘাস’?

আন্তর্জাতিকভাবে ‘ভেটিভার’ নামে পরিচিত এই বিন্না ঘাস বিশ্বজুড়ে নদীভাঙন রোধ ও পাহাড়ি ধস ঠেকাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ঘাস নিয়ে গবেষণা করছেন বুয়েটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম। গবেষণার সাফল্যের কারণে তিনি এটিকে ‘জাদুর ঘাস’ নামে অভিহিত করেন।

বিজ্ঞানীদের মতে, বিন্না ঘাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর শিকড় বা মূল। এটি অত্যন্ত দ্রুত মাটির গভীরে প্রবেশ করে এবং মাটিকে সুদৃঢ়ভাবে ধরে রাখে।

ড. শরীফুল ইসলামের গবেষণা প্রতিবেদনে এই ঘাসের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে:

ইস্পাতের মতো শক্তি: বিন্না ঘাসের মাত্র ছয়টি শিকড় একত্রে যুক্ত হলে তা একটি সাধারণ ইস্পাতের ছড়ের সমান শক্তিসম্পন্ন হয় (একটি শিকড়ের সহনশক্তি ইস্পাতের ছয় ভাগের এক ভাগ)।

প্রতিকূল পরিবেশেও সহনশীল: প্রচণ্ড ঠান্ডা কিংবা তীব্র খরা—উভয় আবহাওয়াতেই এই ঘাস টিকে থাকতে পারে।

পানি ও লবণাক্ততায় অক্ষত: দীর্ঘ সময় পানির নিচে নিমজ্জিত থাকলেও বিন্না ঘাস পচে না এবং উপকূলীয় অঞ্চলের তীব্র লবণাক্ত পানিতেও এটি স্বাভাবিক থাকে।

গবেষকদের দাবি, কেবল নদীভাঙন বা সড়ক সুরক্ষাই নয়; এই ঘাস ব্যবহার করে নদীর পানি দূষণমুক্ত রাখা, সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষা এবং স্বল্প খরচে পরিবেশবান্ধব বিকল্প আবাসন তৈরি করাও সম্ভব।

বিন্না ঘাসের প্রদর্শনী প্লটে গবেষক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম। ছবি: গবেষক
বিন্না ঘাসের প্রদর্শনী প্লটে গবেষক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম। ছবি: গবেষক

ড. শরীফুল ইসলামের এই উদ্ভাবনী গবেষণা ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেছে এবং বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক জার্নালগুলোতে সমাদৃত হয়েছে।

গতকাল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত যৌথ পর্যালোচনা বৈঠকে মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এবং অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীরা বৈঠকে উপস্থিত থেকে নিজ নিজ খাতের আলোকে বিন্না ঘাস ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশে নদীভাঙন ও অবকাঠামোগত ক্ষতি একটি বড় স্থায়ী সমস্যা। এই বাস্তবতায় সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বিন্না ঘাসের বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত ব্যবহার দেশের টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত