Ajker Patrika

স্থাপত্যের বিশ্বসেরা পুরস্কার পেল রংপুরের একটি কারখানা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১: ৩৪
স্থাপত্যের বিশ্বসেরা পুরস্কার পেল রংপুরের একটি কারখানা
রংপুর শহরে অবস্থিত ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গফুটের বেশি আয়তনের ‘গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি’। ছবি: মাড ক্যানভাস

শান্ত পরিবেশ, প্রশস্ত উঠান, পুকুরঘেরা পথ এবং গাছপালায় আচ্ছাদিত নকশার সাততলা ভবন ‘গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি’। এটি বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের রংপুরের একটি কারখানা। সম্প্রতি কারখানাটি নান্দনিক স্থাপত্যের জন্য ‘রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ২০২৬’-এ বিশ্বসেরার পুরস্কার জিতেছে।

রংপুর শহরে অবস্থিত ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গফুটের বেশি আয়তনের এই কারখানাটির নকশায় সবুজের ব্যবহার বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। পুরস্কার প্রদানকারী রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস (রিবা) বলেছে, ল্যান্ডস্কেপ করা বাগান, সবুজ বারান্দা এবং গাছপালায় আচ্ছাদিত দেয়াল কর্মস্থলে সরাসরি প্রকৃতির ছোঁয়া নিয়ে এসেছে।

কারখানাটির নকশা করেছে বাংলাদেশের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান নকশাবিদ আর্কিটেক্টস। প্রতিষ্ঠানটির গঠন ঐতিহ্যবাহী বাঙালি বাড়ির নকশা থেকে অনুপ্রাণিত। এসব বাড়িতে সাধারণত উঠান ও পুকুরের সমন্বয় দেখা যায়।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ সাধারণত দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের পাশাপাশি মানুষের জীবন ও সম্প্রদায়কেন্দ্রিক প্রকল্পকে গুরুত্ব দেয়। এবার প্রায় পাঁচ হাজার কর্মীর কথা মাথায় রেখে কারখানাটির নকশা করায় বিশেষ প্রশংসা পেয়েছেন স্থপতিরা। কর্মীদের অধিকাংশই নারী।

ভবনটির ছাদে রয়েছে কারখানার কর্মীদের বাচ্চাদের যত্ন নেওয়ার কেন্দ্র, কারখানার ভেতরে চিকিৎসাকেন্দ্র এবং বিশ্রামের জন্য ছায়াঘেরা জায়গা। কারখানার প্রবেশপথে রয়েছে নারীর একটি বড় ভাস্কর্য। স্থপতিদের ভাষায়, এটি ‘নারীর ক্ষমতায়নে’র প্রতীক।

রিবার বিচারকেরা গত সেপ্টেম্বরে কারখানাটি পরিদর্শন করেন। সংস্থাটি জানিয়েছে, কর্মীরা কর্মঘণ্টার বাইরেও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কারখানার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করতে পারেন। তাঁদের মতে, প্রকল্পটি কারখানার নকশা ও পরিচালনার একটি বিকল্প মডেল উপস্থাপন করেছে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বস্ত্র উৎপাদনকারী দেশ। তবে দেশের কারখানার কর্মপরিবেশ নিয়ে শ্রম অধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। ২০১৩ সালে রাজধানী ঢাকার কাছে সাভারে রানা প্লাজা ধসে পড়ে। ভবনটিতে কয়েকটি পোশাক কারখানা ছিল। এতে ১ হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।

দুর্ঘটনার আগে ভবনের ফাটল নিয়ে শ্রমিকদের উদ্বেগ উপেক্ষা করে অনেককে কাজে ফিরতে বাধ্য করা হয়েছিল।

কারখানাটির বিশাল প্রবেশপথ। ছবি: ছবি: মাড ক্যানভাস
কারখানাটির বিশাল প্রবেশপথ। ছবি: ছবি: মাড ক্যানভাস

এর বিপরীতে গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির নকশায় কর্মীদের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে রিবা। সংস্থাটির মতে, নকশাটি প্রতিষ্ঠিত সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসকেও চ্যালেঞ্জ করেছে।

জুরি চেয়ারম্যান বিজয় জৈন তাঁর মন্তব্যে কারখানাটির বিশাল প্রবেশপথের কথা উল্লেখ করেন। এই প্রবেশপথ দিয়ে শ্রমিক, ব্যবস্থাপক ও মালিক সবাই প্রবেশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বড় কারখানায় সাধারণত শ্রমিক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা প্রবেশপথ থাকে। গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির বিষয়টিকে তিনি ‘সমতাভিত্তিক অভিন্ন প্রবেশদ্বার’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার পুরস্কার ঘোষণার আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে নকশাবিদ আর্কিটেক্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান স্থপতি বায়েজিদ এম. খন্দকার বলেন, ‘আমরা দেখাতে চেয়েছিলাম, শিল্পপ্রতিষ্ঠানও প্রাণ পেতে পারে, যত্নশীল হতে পারে, মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।’

কারখানার শ্রমিকদের বিশ্রামের জন্য ছায়াঘেরা জায়গা। ছবি: মাড ক্যানভাস
কারখানার শ্রমিকদের বিশ্রামের জন্য ছায়াঘেরা জায়গা। ছবি: মাড ক্যানভাস

স্থপতি বায়েজিদ এম খন্দকার আরও বলেন, ‘কারখানাটিতে কর্মরত মানুষের আপন ঠিকানা হিসেবে স্থাপত্যটিকে গড়ে তোলাই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য। একটি কারখানা এমন কোনো যন্ত্র হওয়া উচিত নয়, যা মানুষের শক্তি শুষে নেয়। এটি একটি জীবন্ত জায়গা হওয়া উচিত, যা সেই শক্তি ফিরিয়ে দেবে।’

পুরস্কারটির তাৎপর্য তুলে ধরেন বায়েজিদ এম খন্দকার বলেন, শ্রমিকেরা সমাজে প্রান্তিক অবস্থানে থাকতে পারেন। তাঁদের আয়ও কম হতে পারে। কিন্তু এই জায়গাটি নিয়ে তাঁদের গর্ববোধ আছে। এখানে তাঁদেরও সমানভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি পরিচালনা করে কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি হাতে তৈরি কার্পেটের পাশাপাশি ডোরম্যাট, বাথম্যাটসহ বিভিন্ন বস্ত্রপণ্য উৎপাদন করে।

রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজের এবারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় বাংলাদেশের দুটি প্রকল্প ছিল। অন্যটি ঢাকার জলবায়ু উপযোগী ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি। বাকি দুটি প্রকল্প ছিল বেলজিয়ামের—১৯৬০-এর দশকের একটি অফিস ভবনের পুনর্নির্মাণ এবং সম্প্রতি সম্প্রসারিত একটি আর্ট ইনস্টিটিউট।

২০১৬ সালে চালু হওয়া রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজকে একক ভবনের জন্য বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্থাপত্য পুরস্কার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত দুই বছর পরপর দেওয়া এই পুরস্কার করোনা মহামারির কারণে একবার নির্ধারিত সময়সূচি থেকে পিছিয়ে যায়। ‘দূরদর্শী, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং নকশার উৎকর্ষ’ প্রদর্শনকারী প্রকল্পকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।

সর্বশেষ ২০২৪ সালে স্পেনের বার্সেলোনার ছয়তলা কাঠের সামাজিক আবাসন প্রকল্প এই পুরস্কার জিতেছিল। এর আগের বিজয়ীদের মধ্যে রয়েছে ব্রাজিলের গ্রামীণ এলাকার একটি স্কুল, পেরুর লিমার একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের বন্যাপ্রবণ প্রত্যন্ত এলাকায় নির্মিত একটি হাসপাতাল।

তথ্যসূত্র: সিএনএন

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত