Ajker Patrika
টমাস ডুলির সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্ব

‘ভালো না খেললে দলে জায়গা থাকবে না’

কদিন পর ঘরের মাঠে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। সাফের আগে এই মুহূর্তে দলকে নিয়ে টমাস ডুলি করছেন নানা পরিকল্পনা। গত মঙ্গলবার বিকেলে গুলশানের এক রেস্তোরাঁয় বসে সেসব পরিকল্পনা, তাঁর খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, কদিন আগে সমাপ্ত আসিয়ান কাপের ব্যর্থতা নিয়ে সবিস্তার বললেন বাংলাদেশ কোচ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রানা আব্বাস। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের শেষটি আজ।

রানা আব্বাস, ঢাকা
আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২: ১৭
‘ভালো না খেললে দলে জায়গা থাকবে না’
বাংলাদেশ ফুটবল কোচ টমাস ডুলি। ছবি: বাফুফে

প্রশ্ন: ফিফা আসিয়ান কাপে দল ব্যর্থ হলেও ইতিবাচক দিকও রয়েছে। তিন তরুণ ফুটবলার—ফারহান আলী ওয়াহিদ, শুকি ইতোফুসা ও জিদান ইউসুফ নজর কেড়েছেন। তাঁদের কীভাবে মূল্যায়ন করবেন।

টমাস ডুলি: আমার কাছে সবচেয়ে বড় চমক ছিল জিদান। তাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। মালয়েশিয়ার বিপজ্জনক ফরোয়ার্ডদের সামলাতে মাঝমাঠের কেন্দ্রীয় বা রক্ষণভাগের মাঝের জায়গায় কাকে খেলানো যায়, তা নিয়ে আমি স্টাফ সদস্যদের এবং দলে থাকা স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। সবাই বলেছিল, (শাকিল আহাদ) তপু সবচেয়ে অভিজ্ঞ। কিন্তু সে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রতিটি গোলের সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে সে জড়িত ছিল। প্রতিপক্ষের চাপে সে অনেক ভুল করেছে। তখন বলেছিলাম, এবার জিদানকে খেলাতে হবে। তাকে দেখতে চাই। কারণ, এর চেয়ে বেশি ভুল করার সুযোগ তো দেওয়া যায় না। জিদান দারুণ খেলেছে। ভবিষ্যতের জন্য সে বড় সম্পদ।

দ্বিতীয় খেলোয়াড় ফারহান। আমি জানি, সে একজন ভালো ফিনিশার। কিন্তু মালয়েশিয়ার বিপক্ষে তার কাছ থেকে কিছুই দেখিনি। সত্যি বলতে, আপনি যদি ম্যাচটি মনোযোগ দিয়ে দেখেন এবং ফুটবল সম্পর্কে সামান্য জ্ঞানও থাকে, তাহলে বুঝবেন, সে কিছুই করতে পারেনি। রক্ষণে সাহায্য করেনি, বল ধরে রাখতে পারেনি, নিজের কাছে আসা প্রায় প্রতিটি বল হারিয়েছে। মনে হয়েছে, আমরা ১০ জন নিয়ে খেলছি। ফাহামিদুলও অনেক ভুল করেছে এবং বল হারানোর পর তা পুনরুদ্ধারের জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করেনি। এভাবে খেলা যায় না। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে আমরা কার্যত নয়জন নিয়ে খেলেছি। তবে প্রতিটি ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে কিছু পরিবর্তন করেছি। খেলোয়াড় বদলেছি, কৌশলেও কিছুটা পরিবর্তন এনেছি। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে আমাদের খেলা অনেক ভালো হয়েছে। এর অর্থ, খেলোয়াড়েরা ইতিমধ্যে কিছু বিষয় শিখতে শুরু করেছে।

ফারহানের প্রসঙ্গে বলি, শেষ ম্যাচের আগে অথবা সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচের পর তার সঙ্গে আমার দীর্ঘ কথা হয়েছিল। তাকে বলেছিলাম, হয়তো এই মুহূর্তে টুর্নামেন্টে খেলার জন্য সে পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। কিন্তু যদি খেলতে চায়, তাহলে অনুশীলনে কঠোর পরিশ্রম করে প্রমাণ করতে হবে, সে দলে থাকার যোগ্য।

প্রশ্ন: সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে ফারহানকে একাদশে না রাখায় অনেক সমালোচনা হয়েছে।

ডুলি: কেন? কিসের সমালোচনা? আপনি যদি ম্যাচটি দেখে থাকেন, তাহলে বলুন, ওই ম্যাচে সে কতটা অবদান রেখেছিল। ফুটবল বুঝলে আপনি নিজেই দেখবেন, হয়তো সে কার্যত কোনো অবদানই রাখতে পারেনি।

প্রশ্ন: প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের হয়ে খেলতে ইংল্যান্ড থেকে লম্বা ভ্রমণ করে ভিন্ন পরিবেশে আসা একজন তরুণ খেলোয়াড়কে টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রথম ম্যাচের শুরুর একাদশে খেলানো কি একটু তাড়াতাড়ি হয়ে গিয়েছিল কি না।

ডুলি: সে আমাদের সঙ্গে অনুশীলন করেছে। ম্যাচের মাত্র দু-তিন দিন আগে এসে অনুশীলন না করেই খেলতে নেমেছে, বিষয়টি এমন নয়।

প্রশ্ন: সেটা কি যথেষ্ট ছিল।

ডুলি: হ্যাঁ। আমার মনে হয়, একজন খেলোয়াড়ের যা করার, তা হলো লড়াই করা। কিন্তু সে তো লড়াই করেনি। আমি এই ছেলেকে পছন্দ করি। তাকে বলেছি, দেখো, এই টুর্নামেন্ট হয়তো এই মুহূর্তে তোমার জন্য নয়। সাফ টুর্নামেন্টটাই তোমার টুর্নামেন্ট হতে পারে। কারণ, সে গোল করতে পারে। সাফে আমরা তুলনামূলক আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলব। প্রতিপক্ষের মানও আমাদের কাছাকাছি। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো দলের খেলোয়াড়দের শারীরিক গড়ন দেখুন। তারা আমাদের খেলোয়াড়দের সহজে সরিয়ে দিতে পারে। ম্যাচের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করলে দেখবেন, শুকি বদলি হিসেবে নেমে ভালো খেলেছিল।

সাফের জন্য পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন বাংলাদেশ কোচ টমাস ডুলি। ছবি: বাফুফে
সাফের জন্য পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন বাংলাদেশ কোচ টমাস ডুলি। ছবি: বাফুফে

প্রশ্ন: বাংলাদেশ ফুটবলে ফারহানের চেয়ে আগে আসায় মানিয়ে নেওয়াটা কি কাজে দিয়েছিল শুকির?

ডুলি: আমি ম্যাচ জিততে চাই। এই মুহূর্তে দলের জন্য কে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারবে, আমাকে সেটাই দেখতে হবে। শুকি মাঠে নামার পর যদি দ্বিতীয়ার্ধে আমাদের খেলা প্রথমার্ধের চেয়ে অনেক ভালো হয়, তাহলে কেন হলো? কারণ, তখন আমরা কার্যত ১১ জন নিয়ে খেলছিলাম। ফাহামিদুল ও ফারহানকে তুলে নিয়েছিলাম, দুজন খেলোয়াড়কে মাঠে নামিয়েছিলাম। তারা ভালো খেলেছে, দলও ভালো খেলেছে। সব সময় বলি, কাউকে তুলে নিয়ে অন্য কাউকে নামালে নতুন খেলোয়াড়কে প্রমাণ করতে হবে, সে আগের খেলোয়াড়ের চেয়ে ভালো। তা না হলে তাকে নামানোর প্রয়োজন কী। যদি সে ভালো খেলে, তাহলে পরের ম্যাচে সে প্রথম একাদশে সুযোগ পাবে। তখন আগের খেলোয়াড়কে অনুশীলনে আবার প্রমাণ করতে হবে, সে আরও ভালো। এভাবেই দলে জায়গা পাওয়ার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।

সিঙ্গাপুরের বিপক্ষেও আমরা দ্বিতীয়ার্ধে পরিবর্তন এনেছিলাম। সৌভাগ্যবশত, দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি আমাদের হাতে ছিল। আমরা অনেক বেশি কর্নার পেয়েছিলাম—১১টি। এটা ছিল দারুণ ব্যাপার। সিঙ্গাপুর আমাদের সমমানের প্রতিপক্ষ। এরপর শেষ ম্যাচে ফারহানকে বলেছিলাম, এবার তোমাকে সুযোগ দেব। ওই ম্যাচে তার পারফরম্যান্স দেখে খুবই মুগ্ধ হয়েছি। প্রথম ম্যাচের তুলনায় সে প্রায় ১০ গুণ ভালো খেলেছে। আমাদের কথোপকথন থেকে সে হয়তো কিছু শিখেছিল। তাকে বলেছিলাম, দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছ, তাই লড়াই করতে হবে। আপনি যদি মাঠে হাঁটাহাঁটি করেন, সহজেই বল হারান, তাহলে আপনাকে খেলাতে পারব না। কারণ, আমি ম্যাচ জিততে চাই এবং মাঠে ১১ জন খেলোয়াড় নিয়েই খেলতে চাই। দ্বিতীয়ার্ধে তাকে নামিয়ে তার খেলায় সত্যিই মুগ্ধ হয়েছিলাম। তার কাছ থেকে এটাই চাই। সে আমাদের দলের জন্য বড় সম্পদ হতে পারে; বিশেষ করে সাফে, যেখানে প্রতিপক্ষ আমাদের কাছাকাছি মানের হবে, সেখানে সে ভালো করতে পারে। ম্যাচের পরও তাকে বলেছি, ওই ম্যাচে সে আমাদের দলের সবচেয়ে বড় নায়ক হতে পারত। দ্বিতীয় গোলটি করতে পারলে সেটা সম্ভব ছিল। হামজার একটি সুযোগেও সে সহায়তা করতে পারত। তার একটি শট গোলপোস্টের খুব কাছ দিয়ে বাইরে চলে গিয়েছিল।

দ্বিতীয়ার্ধটা ছিল তার জন্য ভালো একটি সময়। কিন্তু সে একটি ভুলও করেছে, যেটি থেকে গোল হয়েছে। এরপর প্রতিপক্ষের অষ্টম ও নবম গোলও এসেছে। তার মানসিকতা যদি এমন হতো যে ‘আমি এই গোল করতেই চাই’, তাহলে হয়তো ওই ভুল হতো না। ইন্দোনেশিয়ার কোনো খেলোয়াড় কি ওই পরিস্থিতিতে ব্যাকহিল পাস দেওয়ার চেষ্টা করত? না। তারা বলটা সরাসরি জালে পাঠাত। আমাদেরও সেটাই করতে হবে। অযথা কারিকুরি করার প্রয়োজন নেই। সামনে বল আছে, গোল করার সুযোগ আছে—বল জালে পাঠান। কারণ, প্রতিটি গোলই গুরুত্বপূর্ণ। আমি ফারহানের সঙ্গে এ বিষয়েও কথা বলব। সাফে সে যদি গোল করতে পারে, তাহলে পরবর্তী চুক্তিতে তার জন্য আরও উঁচু পর্যায়ের লিগে খেলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সবকিছু নির্ভর করবে, সে কত গোল করে, কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তার ওপর। আর বিপজ্জনক হতে হলে তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আমার বিশ্বাস, আমাদের কথোপকথনে সে বিষয়টি বুঝতে পেরেছে।

প্রশ্ন: শুকির ব্যাপারে কী বলবেন।

ডুলি: বদলি হিসেবে নামার পর সে তুলনামূলক ভালো খেলেছে। তবে তারও অনেক কিছু শেখার বাকি আছে। যেমন তার ক্রসগুলো ঠিকমতো হচ্ছে না। ক্রসের মান আরও ভালো হতে হবে। আরেকটি সমস্যা হলো, সে যথেষ্ট লড়াকু নয়। হামজাকে দেখুন। সে যখন একের পর এক বিপক্ষে লড়াইয়ে যায়, তখন প্রতিপক্ষকে কার্যত শেষ করে দেয়। আমাদের এভাবেই খেলতে হবে। আপনি যদি নরমভাবে খেলেন, চোট পাওয়ার ভয়ে লড়াইয়ে না যান, তাহলে ম্যাচ জিততে পারবেন না। শক্ত হতে হবে, প্রতিটি দ্বৈরথে লড়তে হবে। আমি শুকিকে সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবেও খেলানোর কথা ভাবছি। সে লম্বা, তাই হয়তো ওই জায়গায় ভালো করতে পারে। কিন্তু তাকে এমন জায়গায় যেতে হবে, যেখানে শারীরিক লড়াই হবে। সে যদি সেখানে যেতে না চায়, তাহলে সমস্যা। কৌশলগত দিক থেকেও সে বক্সে ঢোকার সময় ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। ক্রস আসার সময় অনেক ক্ষেত্রে সে আরও ভালো জায়গায় থাকতে পারত। এসবের সঙ্গে ফুটবলীয় জ্ঞানের সম্পর্ক রয়েছে। অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এই জ্ঞান তৈরি হয়। অভিজ্ঞতা না থাকলে ভুলও বেশি হবে। এ কারণেই হামজা কখনো কখনো হতাশ হয়। তার মাথায় একটা পরিকল্পনা থাকে। সে চায়, সতীর্থরা নির্দিষ্ট জায়গায় দৌড়াক, অথবা তাকে পাস দিক। কিন্তু সতীর্থরা সেই দৌড়টা দেয় না কিংবা পাসটাও খেলে না। কারণ, তারা বিষয়গুলো জানে না। হামজা জানে, কারণ, সে উন্নত ফুটবলকাঠামোর মধ্যে বড় হয়েছে এবং খেলেছে। ফলে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সঙ্গে হামজার এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার ফুটবলারদের মধ্যে একটা ব্যবধান রয়েছে। এই ব্যবধান মাঠে স্পষ্ট হয়। এটাকে শুধু হতাশা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। এটা শেখার অংশ। আমাদের এমন দলগুলোর বিপক্ষে লড়তে হবে, যাদের আমরা হারাতে পারি। আমাদের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে থাকা এবং কিছুটা পিছিয়ে থাকা—দুই ধরনের দলের বিপক্ষেই নিজেদের প্রমাণ করতে হবে। দেখাতে হবে, আমরা তাদের চেয়ে ভালো।

আজকের পত্রিকার হেড অব স্পোর্টস রানা আব্বাসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কোচ টমাস ডুলি তুলে ধরেছেন তাঁর পরিকল্পনা ও লক্ষ্যের কথা। ছবি: সারওয়ার সেতু
আজকের পত্রিকার হেড অব স্পোর্টস রানা আব্বাসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কোচ টমাস ডুলি তুলে ধরেছেন তাঁর পরিকল্পনা ও লক্ষ্যের কথা। ছবি: সারওয়ার সেতু

প্রশ্ন: বাংলাদেশের অনেক সমর্থক মনে করেন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বা প্রবাসী ফুটবলাররা নতুন কিছু দিতে পারবেন, বড় শিরোপা এনে দিতে পারবেন। কারণ, বছরের পর বছর স্থানীয় খেলোয়াড়েরা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। এ কারণে বিষয়টি এখন ফেডারেশন, কোচ এবং সমর্থকদের কাছে বেশ সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

ডুলি: এ ধরনের খেলোয়াড় নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে—নাগরিকত্ব পরিবর্তন করে খেলা খেলোয়াড় আর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলার। আমি সব সময় এ ধরনের খেলোয়াড়দের সমর্থন করি। কারণ, আমিও যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেলেছি। জার্মানিতে থাকতাম, জার্মানির নাগরিকত্বও ছিল, কিন্তু জন্মসূত্রে আমি আমেরিকান। আমার যদি দুটি দেশের নাগরিকত্ব থাকে এবং আমি সেই দুই দেশের যেকোনো একটির হয়ে খেলতে না পারি, তাহলে সেটা তো অন্যায় হবে। কিন্তু শুধু নাগরিকত্ব পরিবর্তন করে জাতীয় দলে খেলার বিষয়টি সমর্থন করি না। যেমন মালয়েশিয়ায় ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার কিছু খেলোয়াড় আছে। তাদের সঙ্গে মালয়েশিয়ার কোনো পারিবারিক সম্পর্ক নেই। সেখানে পাঁচ-ছয় বছর খেলার পর তারা জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ পাচ্ছে। আমি এটা পছন্দ করি না। আমার মতে, এটা ভালো পদ্ধতি নয়। তবে বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়নের জন্য দেশের বাইরে ভালো বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করতে হবে। তারা উন্নত ফুটবলকাঠামোর মধ্যে বেড়ে উঠেছে। আমাদের দেশে খেলোয়াড় তৈরির যথাযথ ব্যবস্থা নেই। পেশাদার লিগের ক্লাবগুলোতে এমন একাডেমি নেই, যেখানে খেলোয়াড়েরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে। দু-তিনটি বেসরকারি একাডেমি আছে, যেখানে কেউ কেউ অনেক টাকা বিনিয়োগ করে ফুটবলার তৈরির চেষ্টা করছেন। তবে এত অল্পসংখ্যক খেলোয়াড় দিয়ে তা সম্ভব নয়। আমাদের এমন খেলোয়াড় প্রয়োজন, যারা ছোটবেলা থেকে উন্নত প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যা পাবে। অথচ আমাদের দেশে যথাযথ বয়সভিত্তিক ফুটবল দলসহ প্রকৃত ফুটবল ক্লাবেরই অভাব রয়েছে। কোটি কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে এত অসাধারণ সমর্থক থাকার পরও এই ব্যবস্থা থাকবে না কেন? আমাদের মূল কাজ হলো, এই ভিত্তিটা তৈরি করা।

প্রশ্ন: আমরা স্থানীয় ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের মধ্যে বিভাজন দেখতে চাই না। তবে মাঠের পারফরম্যান্স দেখলে অনেক সময় দুই ধরনের খেলোয়াড়ের মধ্যে পার্থক্য চোখে পড়ে। মাঠের পারফরম্যান্স দেখে সমর্থকদের অনেকে মনে করেন, স্থানীয় খেলোয়াড়েরা হয়তো দলে নিজেদের জায়গা নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। তাঁদের কেউ কেউ স্বার্থপরের মতো খেলেন বলেও অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

ডুলি: আপনি ঠিক জায়গায় হাত দিয়েছেন। আসল সমস্যা হলো ফুটবলীয় জ্ঞানের অভাব। টেলিভিশনে খেলা দেখার সময় সমর্থকেরা ভাবেন, ও কেন ওই খেলোয়াড়কে পাস দিল না? কেন ওই দিকে গেল না? বাইরে থেকে বিষয়গুলো খুব সহজ মনে হয়। কিন্তু মাঠে পরিস্থিতি ভিন্ন। খেলোয়াড়েরা অনেক সময় বল ক্রস করার চেষ্টা করেন, কিন্তু ঠিকমতো করতে পারেন না। কারণ, তারা প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জন করেননি। ফুটবলে কখন এগোতে হবে, কীভাবে এগোতে হবে, কখন বাঁ দিকে বা ডান দিকে যেতে হবে—এসব বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব সময় বলি, মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তিনটি বিষয় দেখতে হবে—বল কোথায়, প্রতিপক্ষ কোথায় এবং আমার সতীর্থরা কোথায়। এই তিনটি বিষয় বুঝতে পারলে আপনি ঠিক করতে পারবেন, এখন কোথায় যাওয়া উচিত। বাংলাদেশে খেলোয়াড় তৈরির ব্যবস্থার অন্যতম সমস্যা হলো, খেলোয়াড়েরা ছোটবেলা থেকে এসব শেখার সুযোগ পায় না। আমি খেলোয়াড়দের একটি বিষয় বোঝানোর চেষ্টা করি। তাদের বলি, শুধু বলের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। চারপাশ দেখতে হবে। ধরুন, আপনি একটি জানালার দিকে তাকিয়ে আছেন। আপনি শুধু সেদিকেই তাকিয়ে থাকলে অন্য জায়গায় কী হচ্ছে, তা বুঝতে পারবেন না। কিন্তু মাথা তুলে চারপাশ দেখলে সবকিছু দেখতে পাবেন। আমাদের অনেক খেলোয়াড়ও এভাবেই খেলে। যেখানে বল, তাদের চোখ সেখানেই। সতীর্থ কোথায় আছে, প্রতিপক্ষ কোথায় আছে, অন্য জায়গায় কী হচ্ছে, এসব তারা দেখে না। আমি একবার এক খেলোয়াড়কে ম্যাচের ভিডিও দেখিয়েছিলাম। একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে তাকে বলেছিলাম, এখানে বল পাওয়ার পর কী করা উচিত? সে বলেছিল, আমি হামজাকে পাস দেব। আমি বললাম, ঠিক আছে। তারপর ভিডিও চালালাম। দেখা গেল, সে বল পাওয়ার পর ঘুরে ড্রিবল করে এগোতে গেল। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় তাকে চাপে ফেলল। পরে সে বলল, আমি তো তাকে দেখতেই পাইনি। বললাম, ঠিক এ কারণেই তুমি সমস্যায় পড়েছ। তুমি চারপাশ না দেখে শুধু বলের দিকে তাকিয়ে ছিলে। এই বিষয়গুলো ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হয়। হামজার মতো দক্ষ খেলোয়াড় বল নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি অন্য জায়গায় কী হচ্ছে, সেটাও দেখতে পারে। ফুটবল হলো পরবর্তী দু-তিন সেকেন্ডে কী ঘটতে পারে, সেটা আগে থেকে বুঝতে পারার খেলা।

টমাস ডুলি। ছবি: বাফুফে
টমাস ডুলি। ছবি: বাফুফে

প্রশ্ন: ফাহিম-সোহেলসহ আরও কয়েকজন স্থানীয় খেলোয়াড়কে ম্যাচের পর ম্যাচ ভুল করতে দেখা গেছে। এরপরও আপনি তাঁদের ওপর যদি আস্থা রাখেন, তখন মানুষ প্রশ্ন করে, কেন আপনি তাঁদের খেলিয়েই যাচ্ছেন?

ডুলি: আমি সেই প্রশ্ন বুঝতে পারি। তবে এর ব্যাখ্যাও আছে। আপনি যদি কোনো দলের সঙ্গে মাত্র কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ কাজ করেন, তাহলে কাউকে পুরোপুরি চিনতে পারবেন না। কে কেমন খেলোয়াড়, তার শক্তি ও দুর্বলতা কী, চাপের মধ্যে সে কীভাবে খেলে—এসব বুঝতে সময় লাগে। খেলোয়াড়দের বলি, সবকিছুই পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করবে। অনুশীলনে ভালো না করলে খেলতে পারবে না। আমাকে দেখাতে হবে, তোমার মধ্যে কী আছে। যেমন সান মারিনোর বিপক্ষে ম্যাচের আগে ক্যাম্পে সোহেল ছিল উল্লেখযোগ্য খেলোয়াড়দের একজন। রক্ষণাত্মক মাঝমাঠে সে দারুণ খেলেছে। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের ট্যাকল করেছে, ভুল করেনি, ভালো পাস দিয়েছে, দুই পায়েই খেলতে পেরেছে। তার পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। কিন্তু আসিয়ান কাপে ফিরে গিয়ে সে যখন খেলল, তখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমার কী হয়েছে? তোমাকে তো কখনো এভাবে খেলতে দেখিনি। অনুশীলনে তুমি ভালো করেছ, আগের ম্যাচেও ভালো খেলেছ। এখন সামান্য একটা পাসও ঠিকমতো দিতে পারছ না কেন? এটা খুবই খারাপ ব্যাপার। এমন পারফরম্যান্স হলে ২০ মিনিটের মধ্যেই তাকে তুলে নেওয়া উচিত ছিল। তবে আশা করি, সে আবার নিজের ছন্দ ফিরে পাবে। আরেকটি বিষয় বলি। ওই সময় দলের কেউ অধিনায়ক হতে চাইছিল না। কেউই দায়িত্ব নিতে চাইছিল না। সোহেল এক রাতে আমার কাছে এসে বলেছিল, কোচ, শুনেছি, কেউ অধিনায়ক হতে চাইছে না। আমি দায়িত্বটা নিচ্ছি। এই দায়িত্ব বহন করব। এটা তার সম্পর্কে ইতিবাচক কিছু বলে। সে দায়িত্ব নিতে চেয়েছিল। তবে তাকে এ-ও জিজ্ঞেস করেছি, মানুষ তোমাকে এত অপছন্দ করে কেন। তোমাকে এত ঘৃণা করে কেন। সম্ভবত অধিনায়ক হওয়ার পর তার ওপর চাপ বেড়েছে। চারপাশ থেকে নেতিবাচক মন্তব্য আসায় সে আরও ভালো করার চাপ অনুভব করছে। খেলোয়াড়েরা তো রোবট নয়, যন্ত্রও নয়। তাদেরও মানসিক চাপ থাকে। তাই মনে হয়, সমর্থকদের উচিত দলকে সমর্থন করা। তারা যেমন জিততে চায়, আমরাও জিততে চাই। ফেডারেশনের কেউ এসে আমাকে বলে না, টম, অমুক খেলোয়াড়কে খেলাতে হবে। এখানে কোনো সিন্ডিকেট কাজ করে না। আমি খেলোয়াড়দের বলি, খেলতে চাইলে অনুশীলনে নিজেকে প্রমাণ করো। যদি অনুশীলনে কাউকে ঠিকমতো কাজ করতে না দেখি, তাহলে তাকে খেলানোর প্রশ্নই আসে না।

প্রশ্ন: তার মানে, বলছেন, দল সাজানোর ক্ষেত্রে আপনার শতভাগ স্বাধীনতা রয়েছে? কেউ আপনার সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে না?

ডুলি: অবশ্যই। আমি কোচ। কেউ কি সেখানে বসে দাবা খেলতে খেলতে আমাকে বলে দেবে, আগামীকাল কাকে খেলাতে হবে? সে তো অনুশীলনে আসে না। ফেডারেশনের কেউ যদি এসে বলে, এই খেলোয়াড়কে খেলাতে হবে, তাহলে জিজ্ঞেস করব, কেন? সে তো জানে না, খেলোয়াড়টি অনুশীলনে কেমন করছে। কিন্তু আমাকে জানতে হবে। অবশ্য আমি খেলোয়াড়দের খুব অল্প সময় ধরে পাচ্ছি। যেমন তপুকে (জুনিয়র) নিয়ে সবাই বলেছিল, ওই পজিশনে তাকে খেলানো উচিত। সে সবচেয়ে অভিজ্ঞ। তখন খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফের পরামর্শ শুনেছি। তারা তাকে ভালোভাবে চেনে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আমাদের দলের সবচেয়ে দুর্বল খেলোয়াড়দের একজন ছিল। আমি তাকে পছন্দ করি, কিন্তু বিষয়টা পারফরম্যান্সের। আমি একজন খেলোয়াড়কে বলতে পারি, তুমি খুব খারাপ খেলেছ। তখন তাকে বুঝতে হবে, তার পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। খেলোয়াড়দের মাঝেমধ্যে চাপ অনুভব করাও প্রয়োজন। তাদের বুঝতে হবে, ভালো খেলতে না পারলে দলে জায়গা থাকবে না। আমি ম্যাচ জিততে চাই। ফেডারেশন থেকে কেউ এসে যদি বলে, টম, এই খেলোয়াড়কে খেলাতে হবে, তাহলে আমি বলব, তাকে খেলিয়ে যদি ম্যাচ না জিতি, তাহলে তো আপনারাই আমাকে বরখাস্ত করবেন। আমি ম্যাচ জিততে চাই। কিন্তু খেলোয়াড়দের বুঝতে সময় লাগে। একসঙ্গে বসে কফি খেলেই ফুটবল সম্পর্কে জ্ঞান তৈরি হয়ে যায় না। ব্যাপারটা এত সহজ নয়। হয়তো ২০, ৩০ বা ৫০ বছর পর ইলন মাস্ক এমন কিছু আবিষ্কার করবেন, যা দিয়ে মানুষের মস্তিষ্কে এই জ্ঞান ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে! কিন্তু এখনো সেটা সম্ভব নয়।

প্রশ্ন: অন্য বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করতে পারি?

ডুলি: ক্রিকেট নিয়ে নয় প্লিজ (হাসি)।

প্রশ্ন: আপনি কি ক্রিকেট পছন্দ করেন না?

ডুলি: না, ক্রিকেট সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই! জার্মানিতে ক্রিকেট নেই। যুক্তরাষ্ট্রে আমি যেখানে ছিলাম, সেখানেও ক্রিকেট ছিল না। তাই ক্রিকেট সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। আপনার প্রশ্নটা কী?

প্রশ্ন: এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কোন বিষয়টি আপনার সবচেয়ে ভালো লেগেছে?

ডুলি: আসলে অনেক ভালো মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। আমি যে হোটেলগুলোতে থেকেছি, সেখানকার মানুষ, রাস্তায় দেখা হওয়া মানুষ-অনেকেই এগিয়ে এসে কথা বলেছেন, ছবি তুলেছেন। সবাই খুব আন্তরিক। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ আমাদের এমনভাবে ঘৃণা করে, যেন আমরা তাদের শত্রু (হাসি)!

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত

‘ভালো না খেললে দলে জায়গা থাকবে না’