Ajker Patrika

ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক চাপে জিম্মি রাষ্ট্র সংস্কার: টিআইবি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ২২: ১৯
ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক চাপে জিম্মি রাষ্ট্র সংস্কার: টিআইবি

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ ক্ষমতার রাজনীতি এবং আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের মুখে আটকে পড়েছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া সংস্কার উদ্যোগের ধারাবাহিকতা রক্ষা না করে বর্তমান সরকার নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে ঝুঁকেছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলও রাষ্ট্র সংস্কারে কার্যকর ভূমিকা না রেখে দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছিল, তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আজ শুক্রবার এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এসব কথা বলেন। জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পর রাষ্ট্র সংস্কারের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল ও আমলাতন্ত্র জুলাই গণ-অভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা নিতে পারেনি। ক্ষমতার পালাবদল হলেও রাষ্ট্রের আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের চর্চা অব্যাহত রয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে নির্বাচনে জয়ী দলের সংসদ সদস্যরা গণভোটের পক্ষে থাকলেও প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংবিধান সংশোধন ও আইন প্রণয়নের উদ্যোগ এখন ক্ষমতাসীন জোটের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে যেসব অধ্যাদেশ নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বাড়িয়েছে, সেগুলো আইন হিসেবে পাস করা হয়েছে। অন্যদিকে, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক অধ্যাদেশ রহিত বা স্থগিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে টিআইবি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ রহিত করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংশোধন অধ্যাদেশ প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ আইনে পরিণত না করে ২০০৪ সালের আইনে ফিরে যাওয়ায় কমিশনের দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট কাটানোর পথ সংকুচিত হয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়নকেও স্বাধীন ও কার্যকর কমিশন প্রতিষ্ঠার জন-আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি। টিআইবির দাবি, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করে এমন আইন করা হয়েছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী সংস্থাগুলোকে সুরক্ষা দিতে পারে। র‍্যাব বিলুপ্তির পরিবর্তে নতুন নামে সংস্থাটিকে আরও ক্ষমতাশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে টিআইবি।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর একমত থাকলেও এ বিষয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মধ্যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ এবং নিয়মিত হালনাগাদের বিধান নিয়েও মতৈক্য হয়েছিল। তবে বর্তমান সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে সেই অঙ্গীকারের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন তোলেন, কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দুদক ও মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের পরিণতি ভোগ করেও রাজনৈতিক দলগুলো এত অল্প সময়ের মধ্যে সেই অভিজ্ঞতা ভুলে গেল কীভাবে। তাঁর মতে, জুলাই জাতীয় সনদ অতীতের অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন থেকেই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে একচ্ছত্র ক্ষমতা চর্চার প্রবণতা সেই ঐকমত্যকে দুর্বল করছে।

রাষ্ট্র সংস্কারের এই পরিস্থিতির জন্য ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী জোট—উভয়কেই দায়ী করেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, ক্ষমতাসীন দলের একাংশের মধ্যে ‘এবার আমাদের পালা’ মনোভাব থেকে দখল, চাঁদাবাজি ও দলীয়করণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিরোধী জোটও জনস্বার্থে সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার বদলে রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের তৎপরতায় ব্যস্ত।

গণতন্ত্র, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে নজিরবিহীন ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে একই ধরনের সদিচ্ছা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত