Ajker Patrika

খুনের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের আসামি ১৭ বছর ভণ্ড কবিরাজ বেশে, অবশেষে আটক

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
খুনের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের আসামি ১৭ বছর ভণ্ড কবিরাজ বেশে, অবশেষে আটক

কবিরাজির নামে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছিলেন হেমায়েত ওরফে জাহিদ কবিরাজ। তিনি প্রচার করতেন, জিনের মাধ্যমে তাঁর চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। একাধিক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর বিষয়ে তদন্তে নামে র‍্যাব। গতকাল বুধবার তাঁকে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে, তিনি আসলে দেড় যুগ আগে এক হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি।

র‍্যাব বলছে, ২০০৫ সালে বাগেরহাটের মানোয়ারা বেগম মনু হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হেমায়েত ওরফে জাহিদ কবিরাজ। গত ১৭ বছর তিনি দেশে ও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পলাতক ছিলেন। তাঁর বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায়। তার বাবা সামসুল হক খানও ছিলেন কবিরাজ। বাবার মাধ্যমেই ১৫ বছর বয়সে এই পেশায় আসেন জাহিদ। 

র‍্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তারের পর জাহিদের আস্তানা থেকে কথিত কবিরাজি চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের ১২৯টি আংটি, তিনটি শঙ্খ, কথিত আলাদিনের চেরাগ, দুটি ক্রেস্ট, ১৫টি কবিরাজি সংক্রান্ত বই, একটি পিতলের পাঞ্জা ও কবিরাজি সংক্রান্ত অন্যান্য সরঞ্জামাদি জব্দ করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জাহিদ মনু হত্যায় জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে। 

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে কারওয়ান বাজার র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক খন্দকার আল মঈন। 

খন্দকার মঈন বলেন, ‘২০০৫ সালের অক্টোবরে বাগেরহাট জেলার সদর এলাকার নারী উদ্যোক্তা মোনোয়ারা বেগম মনুর বস্তাবন্দী মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই হত্যাকাণ্ডে জাহিদসহ পাঁচজনকে আসামি করা হয়। মামলার তদন্ত শেষে সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ২০০৯ সালের জুন মাসে জাহিদ কবিরাজকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।’ 

খন্দকার মঈন জানান, ২০০৫ সালে মনু হত্যার পর থেকেই পলাতক ছিলেন চতুর জাহিদ। সম্প্রতি র‍্যাব জানতে পারে রাজধানীতে কবিরাজি পেশার আড়ালে প্রতারণা করে আসছেন তিনি। পরে জানা যায়, তিনি মনু হত্যার আসামি। 

গ্রেপ্তার হেমায়েত ওরফে জাহিদ কবিরাজকথিত কবিরাজ জাহিদ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র‍্যাবকে জানিয়েছে, তিনি ১৫-১৬ বছর বয়স থেকে কবিরাজি শুরু করেন। কবিরাজির পেশার মাধ্যমে নানাভাবে মানুষের সঙ্গে আর্থিক প্রতারণা করতেন। তবে নারীরাই ছিল তার প্রতারণার মূল লক্ষ্য। 

 ২০০৩ সালে জাহিদ তাঁর স্ত্রী-সন্তানসহ পিরোজপুর থেকে বাগেরহাটে এসে কবিরাজি শুরু করেন। কবিরাজিতে তার অন্যতম সহযোগী ছিলের হত্যা মামলার অপর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সোবহান। ২০০৫ সালে জানুয়ারি মাসে সোবহান ভুক্তভোগী মনুকে মাথাব্যথার রোগকে মানসিক রোগ বলে আখ্যায়িত করে কবিরাজি চিকিৎসার জন্য জাহিদের কাছে আনে। কৌশলে জাহিদ মনুর বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হয়। মনুর স্বামী ঢাকায় চাকরি করতেন। স্বামীর পাঠানো টাকায় মনু কাপড়ের ব্যবসায় উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন। কাপড়ের ব্যবসা করে এবং স্বামীর পাঠানো টাকা মিলে দেড় লাখ টাকা জমান। আর এই টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্যই পরিকল্পনা করতে থাকেন জাহিদ। 

মাথাব্যথার চিকিৎসার নামে ভুক্তভোগী মনুকে নিয়মিত ঘুমের চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেন। একপর্যায়ে জিনের ভয় দেখিয়ে সম্পত্তির দলিল নিরাপত্তার জন্য জাহিদের কাছে জমা রাখতে বলে। সরল বিশ্বাসে তাঁর টাকা পয়সা-সম্পত্তির দলিল জাহিদের কাছে জমা রাখে। এরপর বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে দলিলে টিপসই নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন জাহিদ। এই সময় মনুকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চেষ্টাও করেন তিনি। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে হেমায়েত মনুকে কুপিয়ে এবং শেষ পর্যন্ত গলা কেটে হত্যা নিশ্চিত করে। এরপর রাতে মনুর গলাকাটা মরদেহ বস্তাবন্দী করে হেমায়েতের বাড়ির সামনের খালে পাশের ধান খেতে লুকিয়ে রাখে। 

হত্যাকাণ্ডের পরেই এলাকা ছেড়ে যশোর চলে যান তিনি। সেখান থেকে গ্রেপ্তার এড়াতে দালালের সহযোগিতায় হেঁটে অবৈধভাবে ভারত যায় জাহিদ। ভারতের আজমীর শরীফ মাজারে কবিরাজি পেশায় জড়িয়ে ৩ বছর অবস্থান করেন। ২০০৮ সালে আবারও দেশে ফিরে ঢাকার মিরপুরে বসবাস শুরু করেন। পরিচয় গোপন করে লম্বা চুল ও দাড়িওয়ালা ছবি ব্যবহার করে তাঁর আসল নাম ও স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করে জাহিদুল ইসলাম ছদ্মনাম ব্যবহারে নতুন এনআইডি কার্ড তৈরি করেন। মিরপুরে জাহিদ কবিরাজির মাধ্যমে প্রতারণা শুরু করেন। ভাগ্য পরিবর্তনে তাবিজ, স্বামী-স্ত্রীর কলহ দূরীকরণ তাবিজ, বশীকরণ তাবিজসহ নানাভাবে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে প্রতারণা করতে থাকেন। 

আংটি, শঙ্খ, আলাদিনের চেরাগসহ কথিত কবিরাজির চিকিৎসায় ব্যবহৃত জিনিস জব্দ করে র‍্যাবপ্রতারণার কারণে তিনি জনরোষের মুখে ঠিকানা পরিবর্তন করে কিছুদিন আদাবর, কিছুদিন কেরানীগঞ্জ এবং সব শেষে বিগত ৫ বছর যাবৎ মোহাম্মদপুর বছিলায় বিভিন্ন স্থানে বসবাস করেন। বছিলায় একইভাবে তিনি কবিরাজি ব্যবসা করতে থাকেন। তাবিজ প্রদান, জিনের বাদশার মাধ্যমে মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের কথা বলে নতুনভাবে প্রতারণা করে সাধারণ মানুষের টাকা হাতিয়ে নেন। কথিত জিনের বাদশার মাধ্যমে নারীদের বিভিন্ন শারীরিক, মানসিক, আর্থিক ও পারিবারিক সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে প্রতারণার চালিয়ে আসছিলেন। 

২০১২ সালে দারুস সালাম থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে তাঁর বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে। এছাড়াও ২০১৭ সালে তিনি তাঁর কবিরাজি কাজে ব্যবহৃত কষ্টি পাথরের মূর্তি রাখার দায়ে চোরাকারবারি হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তারের পর দেড় মাস কারাভোগ করেন। 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য তিনি বারবার অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। গত দুই মাসের মধ্যে তিনি পিরোজপুর, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, কেরানীগঞ্জ এবং মিরপুরে অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। তার পরিচয় গোপন রাখার জন্য তিনি মাঝে মাঝেই চুল, দাঁড়ির রং পরিবর্তন, পোশাকের ধরন পরিবর্তন করেছে। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

হাসপাতালে আশ্রয় নেওয়া গৃহবধূকে ধর্ষণ: দুই আনসার সদস্য বরখাস্ত

১০ বছর পর দম্পতির কোলজুড়ে একসঙ্গে পাঁচ সন্তান

হাত-পা ও মুখ বেঁধে বাসায় চুরি, জামায়াত নেতার মৃত্যু

বাহরাইনের বাসায় অনেকগুলো পোস্টাল ব্যালটের ভিডিও ভাইরাল, ইসিকে ব্যবস্থা নিতে বলল বিএনপি

আমরা এক ইঞ্চিও নড়ব না, ভারতে যাব না: বিসিবি সহসভাপতি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত