
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’ (আরবিআই) দেশটির উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও নিম্ন মুদ্রাস্ফীতির পরিবেশকে একটি ‘গোল্ডিলকস’ মুহূর্ত (সবকিছু অনুকূলে থাকা অবস্থা) হিসেবে অভিহিত করেছিল। কিন্তু সেই মুহূর্ত ক্ষণস্থায়ী বলেই প্রমাণিত হলো। ইরান ও যুক্তরাজ্য-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধ এবং এর ফলে তেলের বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির এই জয়যাত্রায় এক অপ্রত্যাশিত ধাক্কা দিয়েছে।
এর প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে ভারতীয় মুদ্রায়। রুপি রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে এবং গত এক বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ১০ শতাংশ দরপতন হয়েছে। মুদ্রার পতন ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ করায় কিছুটা স্বস্তি মিললেও তা সাময়িক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যুদ্ধ কতদিন চলবে, তার ওপর ভিত্তি করে অনেক বিশেষজ্ঞই ভবিষ্যতে রুপির আরও বড় পতনের পূর্বাভাস দিচ্ছেন।
বৈশ্বিক ইক্যুইটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বার্নস্টেইনের মতে, ২০২৬ সালের বড় একটা সময় ধরে যদি এই যুদ্ধ চলতে থাকে তাহলে তা রুপির জন্য ‘বিপর্যয়কর’ হতে পারে। তখন রুপির মান ডলারের বিপরীতে ১১০-এরও নিচে নেমে যেতে পারে। এমনকি যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।
মুদ্রার ধারাবাহিক দুর্বলতা অর্থনীতির সব খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে ভোক্তাদের জন্য মূল্যবৃদ্ধি, করপোরেট মুনাফা কমে যাওয়া, সরকারের বাজেট ঘাটতি বেড়ে যাওয়া এবং শেয়ারবাজারে মূলধন প্রবাহ কমে যাওয়ার মতো ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিদেশি বিনিয়োগ বেরিয়ে যাওয়ায় বছরের শুরু থেকে ভারতের প্রধান শেয়ারসূচকগুলো এরইমধ্যে প্রায় ১২ শতাংশ কমে গেছে। এতে ‘ওয়েলথ ইফেক্ট’ অর্থাৎ সম্পদের মূল্য বাড়লে বেশি খরচ করার প্রবণতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মূলত ধনীদের ব্যয় বাড়াতে উৎসাহিত করে অর্থনীতির চাকা সচল রাখত।
বৈশ্বিক এই উত্তেজনা দেশটির মুদ্রাস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় তাদের সর্বশেষ মাসিক পর্যালোচনায় জানিয়েছে, আমদানি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে বসবাসকারী এক কোটি ভারতীয়র পাঠানো রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার ফলে অর্থনীতিতে ‘উল্লেখযোগ্য’ প্রভাব পড়তে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ধাক্কাগুলো ‘সরবরাহসংকট এবং বিভিন্ন খাতে চাপের’ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীর হয়ে যাওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
আগে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ঘরে থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। তবে বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসের মতে, উপসাগরীয় সংকটের কারণে এই প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
ভিত্তি বছর পরিবর্তনের কারণে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সাম্প্রতিক সংশোধনের ফলে এমনিতেই কিছুটা কমেছে। এই পরিস্থিতিতে জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ার ভারতের লক্ষ্যমাত্রা আরও পিছিয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে খাদ্যের দাম বাড়তে শুরু করলেও যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম এখনো পাম্পগুলোতে বাড়েনি; সরকার এই ধাক্কা নিজেই সামাল দিচ্ছে। আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নির্বাচনগুলোর আগে ভোক্তাদের সুরক্ষায় পেট্রল ও ডিজেলের ওপর আবগারি শুল্ক কমানো হয়েছে এবং রপ্তানির ওপর ‘উইন্ডফল ট্যাক্স’ বা বাড়তি কর আরোপ করা হয়েছে।
তবে জ্বালানি সংকটের বিষয়টি বহুমুখী।
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ। তবে দেশটির ৬০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ৯০ শতাংশের বেশি এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) আমদানি হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে এই সংকট দিল্লির জন্য মারাত্মক হতে পারে।
কেয়ার এজ রেটিংসের এক নোটে বলা হয়েছে, ভারতের সার আমদানির এক-চতুর্থাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশটির বিশাল কৃষি অর্থনীতি সমস্যায় পড়তে পারে, বিশেষ করে আসন্ন বপন মৌসুমে যখন ‘এল নিনো’ আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের শিলান শাহ ও মার্ক উইলিয়ামস বলেন, ‘ভারতীয় অর্থনীতির জন্য বড় দুশ্চিন্তা হলো চরম ঘাটতি।’
তাঁদের মতে, এই ঘাটতির কারণে ইতোমধ্যে রেস্তোরাঁ ও হোটেলগুলো আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানা, সিরামিক শিল্প এবং শেষকৃত্য সেবার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ভারতের সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রমানিয়ান ‘ইন্ডিয়া টুডে’ টিভি চ্যানেলকে বলেন, এর ফল হতে পারে বিশাল মাত্রার এক ‘স্ট্যাগফ্লেশনারি শক’—যেখানে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে কিন্তু প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়বে।
সুব্রমানিয়ান বলেন, ‘রেস্তোরাঁ বন্ধ হওয়া এবং গৃহস্থালিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের অভাবের মাধ্যমে স্থবিরতার (স্ট্যাগ) অংশটি ইতোমধ্যে অনুভূত হচ্ছে।’
পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। এলপিজি সরবরাহে ঘাটতির ফলে করোনা মহামারীর লকডাউনের স্মৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে মুম্বাইয়ের মতো বড় শহরগুলোতে কাজ করতে আসা অনেক শ্রমিক গ্রামে ফিরতে শুরু করেছেন। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, শ্রমিকের অভাব দেখা দিলে এবং মজুরি বাড়তে শুরু করলে তা অর্থনীতির সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
এই সংকট মোকাবিলায় সরকার ৬২০ কোটি ডলারের একটি ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তহবিল’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে এবং খাদ্য ও সার ভর্তুকিতে অতিরিক্ত ব্যয়ের অনুমোদন চেয়েছে। তবে বার্নস্টেইনের মতে, সড়ক ও রেল অবকাঠামোর বরাদ্দ কাটছাঁট করে এই অর্থ জোগাড় করা হচ্ছে এবং চ্যালেঞ্জের তুলনায় এই তহবিলের পরিমাণ অত্যন্ত ‘সামান্য’।
যুদ্ধ কখন শেষ হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার অপরিবর্তিত রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চ্যালেঞ্জের মাঝেও কিছু আশার আলো দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, রুপির মান কমলে ভারতের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়তে পারে। তা ছাড়া অতীতের সংকটের তুলনায় বর্তমানে দিল্লির হাতে থাকা পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এই সংকট মোকাবিলায় সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করবে।
অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সুব্রমানিয়ান মনে করেন, ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ যেমন সরকারকে বাণিজ্য সংস্কারে বাধ্য করেছিল, বর্তমান পরিস্থিতিও ভারতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। ভারতের জ্বালানি খাতের দুর্বলতা কাটাতে এখন থেকেই তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি মজুত বাড়ানো, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়া।

ইরান সংঘাত দীর্ঘায়িত হতে পারে এই আশঙ্কায় দেশের জ্বালানি খাত ও জ্বালানি সংগ্রহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পুনর্গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে তার আগে স্বল্পমেয়াদে ভোক্তা ও ব্যবসার ওপর এই সংকটের প্রভাব কমানোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।
২৬ মিনিট আগে
দেশের রপ্তানিকারকদের ঋণ দিতে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) নামে একটি বিশেষ তহবিল আছে। এই তহবিলের অর্থের জোগান দেওয়া হয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে। বর্তমানে তহবিলটির আকার ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। এটা বাড়িয়ে ৫ বিলিয়ন ডলার করার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
১২ ঘণ্টা আগে
সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে গতি এখনো সন্তোষজনক নয়। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্যমতে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।
১৩ ঘণ্টা আগে
করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেইন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি)। পাশাপাশি সংগঠনটি নিম্ন আয়ের স্তরের কর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাবও দিয়েছে।
১৬ ঘণ্টা আগে