Ajker Patrika

শ্রমবাজারে দক্ষতার ঘাটতি প্রকট

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ০৭ মে ২০২৬, ১১: ৩১
শ্রমবাজারে দক্ষতার ঘাটতি প্রকট

বৈশ্বিক শ্রমবাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না বাংলাদেশের কর্মশক্তির বড় একটি অংশ। ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সবুজ অর্থনীতির প্রভাবে কাজের ধরন পাল্টে গেলেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ ও সক্ষমতায় বড় ফাঁক রয়ে গেছে। ফলে কর্মমুখী শিক্ষার ঘাটতি এখন সরাসরি দক্ষতা সংকটে রূপ নিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) তাদের ‘আজীবন শিক্ষা ও ভবিষ্যতের দক্ষতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারে জানিয়েছে, দেশের অন্তত ৪৮ শতাংশ কর্মোপযোগী মানুষের নতুন কারিগরি দক্ষতা শেখার জন্য স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তরুণদের ক্ষেত্রে এই চাহিদা আরও তীব্র। বর্তমান শ্রমবাজারে টিকে থাকতে শুধু কারিগরি দক্ষতা নয়, ডিজিটাল সক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতার গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। অথচ দেশে এসব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত নয়। গত মঙ্গলবার সংস্থাটির সদর দপ্তর থেকে বৈশ্বিক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদন বলছে, ১৫-৬৪ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশ গত এক বছরে কোনো কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতেও বৈষম্য স্পষ্ট। মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রাপ্তদের মাত্র এক-চতুর্থাংশ কোনো শেখার কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন। আর মাধ্যমিকের নিচে শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার নেমে এসেছে মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশে।

এই পিছিয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে কয়েকটি কাঠামোগত বাধা। প্রশিক্ষণের উচ্চ ব্যয়, সময়ের সীমাবদ্ধতা, তথ্যের অভাব এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে বিপুলসংখ্যক কর্মী দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে শ্রমবাজারে দক্ষতার চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ সেই গতিতে বাড়ছে না।

তবে কিছু ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে। শিক্ষানবিশ বা ইন্টার্নশিপভিত্তিক কর্মমুখী শিক্ষার ক্ষেত্রে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, এ ধরনের বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা তাদের দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করেছে। এতে বোঝা যায়, কর্মমুখী শিক্ষার বিস্তার ঘটানো গেলে দ্রুত ফল পাওয়া সম্ভব।

আইএলওর মহাপরিচালক গিলবার্ট এফ হোংবো মনে করেন, আজীবন শিক্ষা বর্তমান কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধ। এটি উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, ভালো কাজের সুযোগ তৈরি করে, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে এবং একটি স্থিতিশীল সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে।

তবে বাস্তবতা হলো, দেশে এখনো অধিকাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজের মধ্য দিয়ে বা সহকর্মীদের কাছ থেকে দক্ষতা অর্জন করছেন। এতে দক্ষতার মান সীমিত থাকে এবং তা দীর্ঘ মেয়াদে শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট হয় না। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকেরা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যেখানে আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। এই বৈষম্য আয় ও কর্মসংস্থানের ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

প্রতিবেদনটি সতর্ক করে বলছে, কর্মমুখী শিক্ষার ঘাটতি দূর করা না গেলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। তবে সঠিক নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। এ জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রশিক্ষণে আর্থিক সহায়তা বাড়ানো, ডিজিটাল ও নমনীয় শিক্ষাব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করার সুপারিশ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে শ্রমবাজারভিত্তিক তথ্যব্যবস্থা উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্রভিত্তিক শিক্ষা এবং শিক্ষানবিশ কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আইএলও মনে করছে, সরকার, বেসরকারি খাত ও শ্রমিক সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আজীবন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে দক্ষতা উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে।

যদিও দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং ডিজিটাল প্রশিক্ষণ উদ্যোগ কিছুটা বাড়ছে, তবু টেকসই অগ্রগতির জন্য অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা, নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য প্রশিক্ষণব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নিয়োগ

ভিসা সহজীকরণে ৮ মুসলিম দেশের বৈঠক, সভাপতিত্বে বাংলাদেশ

ইরানি যুদ্ধবিমানগুলোকে আশ্রয় দিয়েছিল পাকিস্তান: প্রতিবেদন

শুভেন্দু অধিকারীর পিএ খুন: অযোধ্যা থেকে গ্রেপ্তার ‘শুটার’ বিজেপি-ঘনিষ্ঠ

বরফ জমাট পানির বোতল দিয়ে স্কুলছাত্রের মাথায় শিক্ষকের আঘাত, মুহূর্তেই জ্ঞান হারাল ছাত্র

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত