Ajker Patrika

সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে বিবেচনায় নিয়ে বাজেট হয়েছে: অর্থমন্ত্রী

বাসস, ঢাকা  
আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, ২১: ১০
সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে বিবেচনায় নিয়ে বাজেট হয়েছে: অর্থমন্ত্রী
শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু। ছবি: বাসস

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটকে ‘সবার বাজেট’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এই বাজেট কোনো রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা বিশেষ শ্রেণির জন্য নয়; দেশের সব মানুষের প্রয়োজন, সম্ভাবনা ও জীবনমানের উন্নয়নকে সামনে রেখেই এটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

আমির খসরু বলেন, কৃষক, নারী, শিল্পী, থিয়েটারকর্মী, কামার-কুমার, তাঁতি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাসহ সমাজের এমন কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ নেই, যাদের কথা এবারের বাজেটে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট ঘোষণা করে আজ রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশক ধরে দেশে এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, যা মূলত পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর ছিল। কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে, কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষ অর্থনীতির মূলধারার বাইরে থেকে গেছে। এবারের বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে অর্থনীতিকে গণতান্ত্রিক করা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা কোনো দলের জন্য বাজেট করি না, করার ইচ্ছাও নেই। এমন কোনো বাংলাদেশি নেই, যিনি এই বাজেটের আওতার বাইরে থাকবেন। কেউ বেশি সুবিধা পাবেন, কেউ কম পাবেন; কিন্তু প্রত্যেক মানুষের প্রয়োজনকে আমরা বিবেচনায় নিয়েছি।’

অর্থমন্ত্রী জানান, সীমিত সম্পদ ও নানা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সরকার এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট তৈরির চেষ্টা করেছে, যাতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য কমবেশি বরাদ্দ, কর্মসূচি ও রোডম্যাপ থাকে। তাঁর দাবি, এবারের বাজেটে শুধু নীতিমালার ঘোষণা নয়; বরং বাস্তবায়নের পথনকশাও যুক্ত করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণবিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণ পুলিশ, র‍্যাব বা প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে সম্ভব নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সঠিক নীতি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোর মাধ্যমে। তাঁর ভাষ্য, দেশে অনুমোদন, বন্দর ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, ব্যাংকঋণ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা পণ্যের দামে প্রভাব ফেলছে। এসব খাতে সংস্কার আনতে পারলে মূল্যস্ফীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি প্রসঙ্গে আমির খসরু বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে তাঁদের বেতনকাঠামোয় বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। এ সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজেটে কোন খাতে কত চাকরি হবে তার নির্দিষ্ট সংখ্যা না থাকলেও কোন কোন খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তার বিস্তারিত পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষা খাতে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির ভিত্তি গড়ে তোলা হবে। তাঁর মতে, দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারলে দেশ ও বিদেশ দুই জায়গাতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে এবারের বাজেটে দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় বিনিয়োগ করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সামাজিক কর্মসূচিতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য কমানো এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনমান উন্নত করা।

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, এই কর্মসূচিতে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীকে যুক্ত করা হয়নি। নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তারা উপকারভোগীদের তালিকা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, রাষ্ট্রীয় সুবিধা কোনো দলের জন্য নয়; নাগরিকদের জন্য।

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’কে বাজেটের নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হয়েছে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গ্রামীণ কারুশিল্প, তাঁত, শীতলপাটি, সংগীত, চলচ্চিত্র, থিয়েটার এবং অন্যান্য সৃজনশীল খাতকে অর্থনীতির মূলধারায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব খাতে দক্ষতা উন্নয়ন, নকশা সহায়তা, অর্থায়ন ও বাজারসুবিধা বাড়িয়ে আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতাকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা গেলে নতুন কর্মসংস্থান এবং পর্যটনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় তাঁরা এমন একটি ব্যাংকিং খাত পেয়েছেন, যেখানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থ লোপাট হয়েছে। এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রথম কাজ ছিল খাতটিকে স্থিতিশীল করা।

ইসলামী ব্যাংক ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো নানা গুজবের বিষয়ে মোস্তাকুর রহমান বলেন, আমানতকারীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। প্রয়োজনীয় তারল্য সহায়তা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রস্তুত রয়েছে। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) আমানত ফেরত দেওয়ার কার্যক্রমও শিগগির শুরু হবে।

গভর্নর আরও বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সরকারের ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স’ কাজ করছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি দেশে সম্পদ জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ১ জুলাই থেকে ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হবে, যাতে সব ধরনের ডিজিটাল লেনদেন একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে করা যায়। তাঁর মতে, এতে নগদ অর্থের ব্যবহার কমবে এবং ডিজিটাল অর্থনীতি আরও সম্প্রসারিত হবে।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, এবারের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। জমি কেনাবেচার প্রকৃত মূল্য ঘোষণার বিষয়ে যে বিধান রাখা হয়েছে, সেটিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এটি মূলত করদাতাদের হয়রানি কমানোর একটি ব্যবস্থা।

বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়ের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু নীতিমালা ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের ওপরও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিনিয়োগ ও ব্যবসা সহজ করতে যেসব বিধিনিষেধ শিথিল করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন তদারকির জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। পাশাপাশি অভিযোগ গ্রহণ ও তাৎক্ষণিক প্রতিকার নিশ্চিত করতে বিশেষ ওয়েবসাইট চালুরও পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যদি ব্যবসা ক্ষেত্রে সরকার ঘোষিত বিনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ৮০ শতাংশও বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন একপর্যায়ে পৌঁছে যাবে।’

সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এবং অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার উপস্থিত ছিলেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত