Ajker Patrika

তাপপ্রবাহের প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাংক: বাংলাদেশসহ দ. এশিয়ার অর্থনীতি ৭ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার শঙ্কা

  • বছরে ৩.১ কোটি কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি
  • ২৮ কোটি নতুন কর্মক্ষম মানুষের সম্ভাবনা হুমকিতে
  • ৫২ কোটি মানুষ অন্তত ১ মাস তীব্র তাপপ্রবাহে ভুগতে পারে
  • তাপপ্রবাহকে উন্নয়ন পরিকল্পনার বিবেচনায় রাখার পরামর্শ
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
তাপপ্রবাহের প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাংক: বাংলাদেশসহ দ. এশিয়ার অর্থনীতি ৭ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার শঙ্কা

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তীব্র তাপপ্রবাহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য নতুন এক কাঠামোগত ঝুঁকি হয়ে উঠছে। এতে কমছে শ্রমিকের কর্মক্ষমতা, ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন, বাড়ছে ব্যবসার ব্যয়, হারাচ্ছে কোটি কোটি কর্মঘণ্টা। বিশ্বব্যাংকের এক নতুন প্রতিবেদনে এসব কথা জানিয়ে বলা হয়েছে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি প্রায় ৭ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।

‘বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ: দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোতে তীব্র তাপপ্রবাহ থেকে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সুরক্ষা’ শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের গবেষণা প্রতিবেদনটি গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা অফিসে প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপপ্রবাহ এখন আর শুধু জলবায়ু বা পরিবেশগত সংকট নয়; এটি ব্যবসা, শিল্প, কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা কমছে, উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন তৈরি হচ্ছে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে শহরগুলোর প্রতিযোগিতার সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপরও চাপ বাড়ছে।

প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমবাজারে নতুন করে প্রায় ২৮ কোটি কর্মক্ষম মানুষ যুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু বাড়তে থাকা তাপমাত্রা সেই জনমিতিক সম্ভাবনাকে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে ফেলছে। যে বয়স শ্রেণির জনশক্তি ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হওয়ার কথা, তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে তাদের উৎপাদনশীলতা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এভাবে বাড়তি তাপের প্রভাবে প্রতিবছর হারিয়ে যেতে পারে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ কর্মসংস্থান।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৭০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৫২ কোটি মানুষ বছরে অন্তত এক মাস বিপজ্জনক মাত্রার তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হতে পারে। এটি বর্তমানের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে নিম্ন আয়ের পরিবার, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, নারী, বয়স্ক এবং শিশুরা। ফলে সামাজিক বৈষম্যের পাশাপাশি অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ আরও বাড়তে পারে।

প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট বলেন, এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র দেশের শহরগুলো। কিন্তু ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা কর্মসংস্থান, জীবিকা ও প্রবৃদ্ধিকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাঁর মতে, তাপ-সহনশীল শহর গড়ে তোলা শুধু মানুষকে শারীরিকভাবে সুরক্ষিত রাখার বিষয় নয়; এটি কর্মসংস্থান রক্ষা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করারও পূর্বশর্ত।

প্রতিবেদনে তাপপ্রবাহকে আর মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে না দেখে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। নগর-পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পনীতি এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ কৌশলে তাপ-সহনশীলতা যুক্ত করার পাশাপাশি তাপ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, হিট অ্যাকশন প্ল্যান শক্তিশালী করা, ঝুঁকিতে থাকা শ্রমিকদের সুরক্ষা, জ্বালানি-সাশ্রয়ী শীতলীকরণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের (এফসিডিও) এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জলবায়ু সহনশীলতা বিষয়ক প্রধান জন ওয়ারবারটন বলেন, দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষের জীবিকা, জনস্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাঁর মতে, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন সংকট, যা মোকাবিলায় সমন্বিত নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অপরিহার্য।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছে ব্রিটিশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত রেজিলিয়েন্ট এশিয়া প্রোগ্রাম এবং বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফ্যাসিলিটি ফর ডিজাস্টার রিডাকশন অ্যান্ড রিকভারি ও সিটি রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম।

বিশ্বব্যাংকের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন শহরে ইতিমধ্যে হিট অ্যাকশন প্ল্যান, নগর সবুজায়ন, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি-সাশ্রয়ী শীতলীকরণ প্রযুক্তি ইতিবাচক ফল দিচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ বড় পরিসরে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ। দ্রুত নগরায়ণের এই সময়ে সরকারগুলোর বর্তমান সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলো ভবিষ্যতেও কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হয়ে থাকবে, নাকি তীব্র তাপপ্রবাহ উন্নয়নের গতিকে মন্থর করে দেবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত